উত্তরা প্রতিদিন
ঢাকা

রাজশাহীর সিল্কপাড়ায় ৬০ কোটি টাকার ব্যবসার সম্ভাবনা

উত্তরা প্রতিবেদক ১৪ মার্চ ২০২৬, ০২:১০ পূর্বাহ্ণ
রাজশাহীর সিল্কপাড়ায় ৬০ কোটি টাকার ব্যবসার সম্ভাবনা
নগরীর একটি সিল্কের দোকানে ক্রেতাদের উপচেপড় ভিড়-আসাদুজ্জামান আসাদ

ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে আবারও প্রাণ ফিরে পাচ্ছে রাজশাহীর ঐতিহ্যবাহী সিল্ক পল্লি। রমজান শুরু হওয়ার পর থেকেই শহরের বিভিন্ন সিল্ক শোরুমে বাড়তে শুরু করেছে ক্রেতাদের আনাগোনা। রুচিশীল ক্রেতাদের উপস্থিতিতে জমে উঠছে কেনাকাটা। 

ব্যবসায়ীরা বলছেন, সবকিছু অনুকূলে থাকলে এবারের ঈদে রাজশাহীর বাজারে অন্তত ৬০ কোটি টাকার সিল্ক পণ্য বিক্রি হতে পারে। ঈদ মানেই নতুন পোশাক, আর রাজশাহীর মানুষের কাছে সেই নতুন পোশাকের তালিকায় বিশেষ জায়গা দখল করে আছে সিল্ক। দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য আর আভিজাত্যের কারণে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের ক্রেতাদের কাছেও রাজশাহীর সিল্কের আলাদা কদর রয়েছে।

রমজানের শুরু থেকেই শহরের বিভিন্ন সিল্ক শোরুমে বাড়তে শুরু করেছে ক্রেতাদের আনাগোনা। ঈদ যত ঘনিয়ে আসছে, ততই বাড়ছে কেনাকাটার ব্যস্ততা। তবে অন্যান্য বিপণিবিতানের মতো তীব্র ভিড় বা ঠেলাঠেলি নেই এখানে। বরং স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ পরিবেশে সময় নিয়ে পছন্দের পোশাক বেছে নিচ্ছেন ক্রেতারা।

সরেজমিনে রাজশাহী শহরের বিভিন্ন সিল্ক শোরুম ঘুরে দেখা গেছে, শাড়ি, থ্রি-পিস, পাঞ্জাবি ও শিশুদের পোশাকসহ নানা ধরনের সিল্ক পণ্য কিনছেন ক্রেতারা। কেউ নিজের জন্য, কেউ আবার পরিবারের সদস্যদের জন্য কিংবা ঈদের উপহার হিসেবে সিল্কের পোশাক বেছে নিচ্ছেন।

প্রতি উৎসব মৌসুমেই নারীদের বড় একটি অংশের আগ্রহ থাকে সিল্কের শাড়ি ও থ্রি-পিসের প্রতি। সূক্ষ্ম কাজ, নকশা এবং কাপড়ের আরামদায়ক বৈশিষ্ট্যের কারণে এসব পোশাকের চাহিদা বেশি।

ক্রেতা শারমিন আক্তার বলেন, ‘প্রতিবছরই ঈদের কেনাকাটার একটি বড় অংশ রাজশাহীর সিল্ক থেকে করি। এখানকার কাপড়ের মান খুবই ভালো এবং ডিজাইনেও আলাদা এক ধরনের ঐতিহ্য ও আভিজাত্য থাকে। বিশেষ করে সিল্কের শাড়িগুলো আমার খুব পছন্দ। ঈদ উপলক্ষে নিজের জন্য এবং পরিবারের সদস্যদের জন্য কয়েকটি শাড়ি কিনেছি।’

মো. রাকিব হাসান নামের আরেক ক্রেতা বলেন, ‘রাজশাহীর সিল্ক শোরুমগুলোতে ভিড় তুলনামূলক কম থাকায় স্বাচ্ছন্দ্যে কেনাকাটা করা যায়। কাপড়ের মান ভালো হওয়ায় দাম একটু বেশি হলেও কিনতে আপত্তি নেই। ঈদকে সামনে রেখে পরিবারের সবার জন্য পাঞ্জাবি, থ্রি-পিস এবং বাচ্চাদের পোশাক কিনলাম।’

ব্যাংককর্মী নুসরাত জাহান বলেন, ‘রাজশাহীর সিল্কের দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য রয়েছে। সেই আস্থা থেকেই এখানে কেনাকাটা করতে আসা। এখানকার কাপড় টেকসই এবং পরলে খুব আরাম লাগে। ঈদে আত্মীয়-স্বজনদের উপহার দেওয়ার জন্যও সিল্ক পণ্য কিনেছি।’

ঈদের বাজারকে ঘিরে বেশ আগে থেকেই প্রস্তুতি শুরু করেছেন সিল্ক ব্যবসায়ীরা। ক্রেতাদের রুচি ও চাহিদা বিবেচনায় নতুন ডিজাইন ও আধুনিক নকশার পণ্য তৈরি করা হয়েছে।

রাজশাহী সিল্ক ফ্যাক্টরির স্বত্বাধিকারী খুরশিদা খুশি বলেন, ‘ঈদকে সামনে রেখে আমরা অনেক আগে থেকেই উৎপাদন কার্যক্রম জোরদার করেছি। ক্রেতাদের চাহিদা অনুযায়ী বিভিন্ন ডিজাইনের পণ্য প্রস্তুত করা হয়েছে। বিশেষ করে এবার মোসলিনের কাজ বেশি করা হয়েছে।’

তিনি জানান, তাদের শোরুমে মোসলিন শাড়ির দাম তিন হাজার থেকে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত। শিশুদের পোশাক ৫০০ থেকে ১০ হাজার টাকা এবং থ্রি-পিস দুই হাজার থেকে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত রাখা হয়েছে।

ঊষা সিল্কের মহাব্যবস্থাপক জহুরুল ইসলাম বলেন, ‘সিল্কের পণ্যের বিক্রি সারা বছরই থাকে, তবে ঈদের সময় চাহিদা অনেক বেড়ে যায়। এবার গরমের কথা বিবেচনা করে আমরা মোসলিনের ওপর বেশি কাজ করেছি। ক্রেতাদের আনাগোনাও ভালো। সবচেয়ে বেশি বিক্রি হচ্ছে শাড়ি, পাঞ্জাবি ও থ্রি-পিস।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমরা এমনভাবে দাম নির্ধারণ করেছি যাতে সব ধরনের ক্রেতাই সিল্ক পণ্য কিনতে পারেন।’

সপুরা সিল্কের পরিচালক সাজ্জাদ আলী সুমন বলেন, ‘এবারের প্রস্তুতি ছিল একটু ভিন্ন ধরনের। জুলাই আন্দোলনের পর নির্বাচন হয়েছে, এরপর এখন ঈদের বাজার। রাজনৈতিক পরিস্থিতি কিছুটা স্থিতিশীল হওয়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যেও কেনাকাটার আগ্রহ দেখা যাচ্ছে।’

তিনি জানান, তাদের প্রতিষ্ঠান সিল্ক ও নন-সিল্ক—দুই ধরনের পোশাকই তৈরি করে। তাদের শোরুমে শাড়ির দাম ৩২০০ টাকা থেকে শুরু করে ৬০ হাজার টাকা পর্যন্ত। থ্রি-পিস ৪০০০ থেকে ২৫ হাজার টাকা এবং পাঞ্জাবি ৩০০০ থেকে ১২ হাজার টাকা পর্যন্ত রাখা হয়েছে।

তবে সিল্ক পণ্যের দাম আগের তুলনায় কিছুটা বেড়েছে বলেও জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। এর প্রধান কারণ কাঁচামালের দাম বৃদ্ধি এবং স্থানীয়ভাবে পর্যাপ্ত সিল্ক উৎপাদন না হওয়া।

রাজশাহী রেশম শিল্প মালিক সমিতির সভাপতি লিয়াকত আলী বলেন, “ঈদের দিন যত ঘনিয়ে আসবে, ততই বিক্রি বাড়বে। সব মিলিয়ে এবারের ঈদে রাজশাহীর বাজারে অন্তত ৬০ কোটি টাকার সিল্ক পণ্য বিক্রি হতে পারে বলে আমরা আশা করছি।”

একসময় দেশের রেশম শিল্পের কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত ছিল রাজশাহী। নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও সেই ঐতিহ্য ধরে রেখেছেন এখানকার কারিগর ও উদ্যোক্তারা। আর ঈদের মতো বড় উৎসব এলেই সেই ঐতিহ্যের প্রতি নতুন করে আগ্রহ দেখান ক্রেতারা।

 

 

 

ইএফ/ 

 

Read more — উত্তরাঞ্চল
Home