উত্তরা প্রতিদিন
ঢাকা

নতুন নতুন জাত উদ্ভাবনে স্ট্রবেরি চাষে রাবি গবেষকের অভাবনীয় সাফল্য

বিঘা প্রতি আয় ১০-১২ লাখ টাকা
উত্তরা প্রতিদিন আমজাদ হোসেন শিমুল ১৩ মার্চ ২০২৬, ০২:৪৭ পূর্বাহ্ণ
নতুন নতুন জাত উদ্ভাবনে স্ট্রবেরি চাষে রাবি গবেষকের অভাবনীয় সাফল্য
গাছ থেকে স্ট্রবেরি সংগ্রহের পর বাজারজাত করা হচ্ছে -উত্তরা প্রতিদিন

বাংলাদেশে স্ট্রবেরি চাষ এখন আর নতুন বিষয় নয়। দীর্ঘ গবেষণা ও অভিযোজন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বিদেশি এই ফলকে দেশের কৃষির লাভজনক ফসলে রূপান্তর করেছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদ বিজ্ঞানী ও গবেষকরা অধ্যাপক ড. এম. মনজুর হোসেন। তার উদ্ভাবিত নতুন জাত ‘ফ্রিডম–২৪’ ইতোমধ্যে কৃষকদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। অধিক ফলন, বড় আকার এবং বেশি মিষ্টতার কারণে এই জাত থেকে প্রতি বিঘা জমিতে প্রায় চার টন পর্যন্ত ফলন পাওয়া সম্ভব। এতে এক বিঘা জমিতে স্ট্রবেরি চাষে ২-৩ লাখ টাকা খরচ করে ১০-১২ লাখ টাকা আয় করা যায়। ফলে বিঘা প্রতি কৃষকের লাভ হচ্ছে অন্তত ৮-৯ টাকা।

বাংলাদেশে স্ট্রবেরি গবেষণা ও চাষের পথিকৃৎ হিসেবে পরিচিত রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক ড. এম মনজুর হোসেন বলেন, জাপানে পিএইচডি করার সময় তিনি প্রথম স্ট্রবেরি নিয়ে গভীরভাবে আগ্রহী হন। সেখানকার একটি গবেষণাগারে স্ট্রবেরি নিয়ে গবেষণা দেখে তিনি দেশে ফিরে এই ফল নিয়ে কাজ শুরু করার সিদ্ধান্ত নেন। পিএইচডি শেষে জাপান থেকে তিনটি স্ট্রবেরির জাত দেশে নিয়ে এসে পরীক্ষামূলকভাবে চাষ শুরু করেন। তবে শুরুতে সেগুলো বাংলাদেশের আবহাওয়ার সঙ্গে খাপ খাওয়াতে পারেনি।

পরবর্তীতে জাপান, ফ্লোরিডা ও ক্যালিফোর্নিয়া থেকে মোট ৩২টি স্ট্রবেরির জাত সংগ্রহ করে তার নেতৃত্বে একদল গবেষক দীর্ঘ গবেষণা চালান। বাংলাদেশের শীতকাল তুলনামূলক ছোট এবং দিনের দৈর্ঘ্য কম হওয়ায় বিদেশি জাতগুলোর সঙ্গে পরিবেশগত অভিযোজন করাই ছিল সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি প্রয়োগের মাধ্যমে ২০০৭ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রথম ‘রাবি–১’, ‘রাবি–২’ ও ‘রাবি–৩’ নামে তিনটি জাত উদ্ভাবন করা হয়। এর মধ্যে ‘রাবি–৩’ ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায় এবং দেশের বিভিন্ন এলাকায় স্ট্রবেরি চাষ ছড়িয়ে পড়ে।

তবে আগের জাতগুলোর কিছু সীমাবদ্ধতা ছিল। যেমন ‘রাবি-৩’ দেখতে সুন্দর হলেও ফল নরম হওয়ায় দূরবর্তী বাজারে পাঠাতে সমস্যা হতো। আবার আমেরিকার ‘ফেস্টিভাল’ জাতটি ভালো ফলন দিলেও মৌসুমের শেষে ফল ছোট হয়ে যেত এবং রোগের আক্রমণ বেশি হতো। এসব সীমাবদ্ধতা দূর করতেই নতুন গবেষণা শুরু হয়।

দেশে স্ট্রবেরি চাষের জনক ড. এম. মনজুর হোসেন জানান, জাপানের একটি জাতের সঙ্গে ‘ফেস্টিভাল’ জাতের সংকরায়নের মাধ্যমে দীর্ঘ প্রায় এক দশকের গবেষণার ফল হিসেবে ‘ফ্রিডম-২৪’ (২৪’র জুলাই আন্দোলনের নামানুসারে) উদ্ভাবন করা হয়েছে। স্ট্রবেরির ফুলে থাকা পুরুষ অংশ অপসারণ করে হাতে পলিনেশন করার মাধ্যমে এই সংকরায়ন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়। পরে বীজ সংগ্রহ করে বিশেষ পদ্ধতিতে চারা উৎপাদন করা হয়।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ড. এম. মনজুর হোসেনের গবেষণা সহকারী এবং আকাফুজি অ্যাগ্রো টেকনোলজির জেনারেল ম্যানেজার ড. সেলিম আহমেদ বলেন, নতুন এই জাত আকারে বড়, ফলন বেশি এবং মিষ্টতার পরিমাণও বেশি। একটি স্ট্রবেরির ওজন সর্বোচ্চ প্রায় ১৩০ গ্রাম পর্যন্ত হতে পারে। বর্তমানে দেশে স্ট্রবেরির প্রায় ২২টি জাত রয়েছে। এর মধ্যে ‘রাবি-১’, ‘রাবি-২’, ‘রাবি-৩’, ‘ফেস্টিভাল’, ‘উইন্টার ডন’সহ বেশ কয়েকটি জাত কৃষকদের মধ্যে জনপ্রিয়। তবে ‘ফ্রিডম-২৪’ খুব দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।

স্ট্রবেরি চাষে টিস্যু কালচার প্রযুক্তির গুরুত্ব তুলে ধরে এই গবেষক আরো বলেন, একটি টিস্যু কালচার গাছ থেকে প্রায় পাঁচ হাজার পর্যন্ত চারা উৎপাদন করা সম্ভব। এছাড়া স্ট্রবেরি গাছ থেকে ‘রানার’ বের হয়ে মাটিতে নতুন গাছ তৈরি করে, যেখান থেকে কৃষকেরা সহজেই চারা সংগ্রহ করতে পারেন।

স্ট্রবেরি চাষের জন্য অক্টোবরের মাঝামাঝি থেকে নভেম্বরের মাঝামাঝি সময়কে সবচেয়ে উপযোগী বলে জানান গবেষকরা। সাধারণত ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহ থেকে ফল ধরা শুরু হয় এবং জানুয়ারিতে পূর্ণ উৎপাদনে যায়। এই সময় বাজারে স্ট্রবেরির দাম কেজিপ্রতি প্রায় ১৮০০ থেকে ২০০০ টাকা পর্যন্ত থাকে। তবে বর্তমানে ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকা কেজি দরে জমি থেকেই স্ট্রবেরি বিক্রি হচ্ছে। যা ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরবরাহ করা হয়। 

সঠিক সার ব্যবস্থাপনার ওপর গুরুত্ব দিয়ে ড. মনজুর হোসেন বলেন, স্ট্রবেরি গাছে অতিরিক্ত নাইট্রোজেন সার যেমন ইউরিয়া বা ডিএপি ব্যবহার করলে রোগের ঝুঁকি বাড়ে। তাই জৈব সার, খোল, টিএসপি, এমওপি, জিপসাম ও সালফার পরিমিতভাবে ব্যবহার করতে হবে। পাশাপাশি মালচিং পদ্ধতি ব্যবহার করলে ফল মাটির সংস্পর্শে আসে না এবং রোগবালাইও কম হয়।

রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, চলতি মৌসুমে রাজশাহী জেলার ৬টি উপজেলায় মোট ২৩.৯ হেক্টর জমিতে স্ট্রবেরি চাষ হয়েছে। এর মধ্যে চারঘাট উপজেলাতেই চাষ হয়েছে ১৫ হেক্টর জমিতে। এছাড়া জেলার পবায় ৫ হেক্টর, তানোরে ০.৫ হেক্টর, বাগমারায় ২ হেক্টর, পুঠিয়ায় ১ হেক্টর ও গোদাগাড়ী উপজেলায় ০.৪ হেক্টর জমিতে স্ট্রবেরির চাষ হয়েছে। 

স্ট্রবেরি চাষে সফল চারঘাটের উদ্যোক্তা মো. শাহীন বলেন, ‘রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের প্রফেসর ড. এম. মনজুর হোসেন স্যারের মাধ্যমে ২০০৮ সালে মাত্র ১০ কাঠা জমিতে স্ট্রবেরি চাষ শুরু করি। জমি বর্গা নিয়ে ২০ বিঘা জমিতে স্ট্রবেরি চাষ করছিলাম। তবে এবছর ৬বিঘা জমিতে স্ট্রবি চাষ করেছি। মূলত জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহ থেকে এপ্রিল মাঝামাঝি পর্যন্ত স্ট্রবেরির ফলন পাওয়া যায়। এটি এমন একটি ফল যা রাতের বেলায় কম তাপমাত্রায় পাকে। প্রত্যেকদিন সকালে জমি থেকে স্ট্রবেরি তুলতে হয়। আমিও জানুয়ারি থেকে স্ট্রবেরি তোলা শুরু করেছি। ৬ বিঘা জমিতে প্রতিদিন গড়ে ৪৫০-৪৮০ কেজি স্ট্রবেরি নামানো সম্ভব হয়।’

চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার কালুপুর গ্রামের স্ট্রবেরি চাষি নজিবুর রহমান হাজি বলেন, ‘রাবি গবেষক ড. মনজুর স্যারের মাধ্যমে ২০০৮ সালে চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জের কালুপুরে স্ট্রবেরির চাষ শুরু করি। বর্তমানে এই অঞ্চলে শত শত বিঘা জমিতে স্ট্রবেরির চাষ হচ্ছে। স্যার গবেষণা করে স্ট্রবেরির নতুন নতুন জাত উদ্ভাবন করছেন। স্যারের থেকেই স্ট্রবেরির চারা সংগ্রহ করে এই অঞ্চলে স্ট্রবেরি চাষে চাষিরা ব্যাপক সফলতা পেয়েছে। 

রাবির উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের গবেষক ড. এম. মনজুর হোসেন বলেন, “আমি পরীক্ষামূলকভাবে দেড় বিঘা জমিতে আমার নতুন উদ্ভাবিত উন্নত জাতের ‘এফ-২৪’ স্ট্রবেরি চাষ করেছি। এতে ফলন অনেক ভালো হয়েছে এবং এই স্ট্রবেরি খেতেও অনেক সুমিষ্ট। বাণিজ্যিকভাবে এই নতুন জাতটি কৃষকরা চাষ শুরু করতে পারলে তারা অনেক বেশি লাভবান হবে বলে আশা করছি।”

রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক (উদ্যান) পাপিয়া রহমান মৌরী বলেন, ‘স্ট্রবেরি একটি হটিকালচারাল জাতীয় ক্রপ। অধিক লাভজনক হওয়ায় রাজশাহীসহ সারাদেশে এর চাষ দিন দিন জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। আমরা আশা করছি, নতুন নতুন জাত উদ্ভাবনের মধ্য দিয়ে স্ট্রবেরি চাষ কৃষিতে ব্যাপক বিপ্লব সৃষ্টি করবে।’

 

 

ইএফ/

Read more — উত্তরাঞ্চল
Home