উত্তরা প্রতিদিন
ঢাকা

নতুন শহীদ মিনারে ভাষাপ্রেম নয়, চলছে ভালোবাসার মহড়া

উত্তরা প্রতিদিন ইবতিদা ফেরদৌস ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১২:৩১ পূর্বাহ্ণ
নতুন শহীদ মিনারে ভাষাপ্রেম নয়, চলছে ভালোবাসার মহড়া
নতুন শহীদ মিনারের সামনে গল্পে মেতেছে প্রেমিক প্রেমিকারা - উত্তরা প্রতিদিন

 

আলো ঝলমল শহীদ মিনারের নিচের কোণায় বসে নিবিড় আলোচনায় মগ্ন এক তরুণ-তরুণী। পাশে রাখা চিপসের প্যাকেট আর পানির বোতল। ৫২-র ভাষা শহীদদের স্মরণে নির্মিত এই পবিত্র বেদিতেই চলছে তাদের ব্যক্তিগত খুনসুটি। সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে এগিয়ে যেতেই যুবকটি কিছুটা বিব্রত হয়ে তড়িঘড়ি করে প্রেমিকার হাত ধরে উঠে চলে যান। যাওয়ার সময় বিরক্তির সুরে বললেন, একটু শান্তিতে বসারও উপায় নেই!

সরেজমিনে দেখা যায়, বিকেল গড়াতেই আলোকঝলমল শহীদ মিনার চত্বরে বাড়তে থাকে নানা বয়সী মানুষের ভিড়। যাদের অধিকাংশেরই উদ্দেশ্য ছবি তোলা, টিকটক ভিডিও বানানো কিংবা নিভৃতে সময় কাটানো। ৭ কোটি ৮০ লাখ টাকারও বেশি ব্যয়ে নির্মিত এই চোখধাঁধানো স্থাপনার সৌন্দর্য উপভোগ করতে আসছেন অনেকেই। তবে তাদের অনেকের কর্মকাণ্ডেই নেই শহীদদের প্রতি সেই কাঙ্ক্ষিত শ্রদ্ধাবোধ।

রাজশাহীর নবনির্মিত কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের বর্তমান চিত্র এটিই। শহীদ মিনারের স্তম্ভগুলোর ছায়ায় আর কোণায় এখন শ্রদ্ধা নয়, বরং বসে থাকতে দেখা যায় অসংখ্য যুগলকে। বিশেষ করে বিকেল থেকে রাত পর্যন্ত প্রেমিক-প্রেমিকাদের অবাধ বিচরণে এটি হয়ে উঠেছে একটি বিনোদন কেন্দ্র। শহীদ মিনারের ভাবগাম্ভীর্যকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে সেখানে রাতভর চলছে ব্যক্তিগত খোশগল্প আর আড্ডা।

কিছুক্ষণ পর কথা হয় নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অন্য এক যুবকের সাথে। কেন শহীদ মিনারকে আড্ডার জায়গা হিসেবে বেছে নিলেন-এমন প্রশ্নে তার সোজাসাপ্টা উত্তর, "ভাই, রাজশাহীতে ঘোরার মতো জায়গার বড় অভাব। এটা নতুন হয়েছে, দেখতেও খুব সুন্দর আর আলোকসজ্জাও দারুণ। তাই গার্লফ্রেন্ডকে নিয়ে একটু ঘুরতে এসেছি। এখানে বসে সময় কাটাতে বেশ ভালো লাগছে।" 

শহীদ মিনারের পবিত্রতা বা জুতা পায়ে বেদিতে ওঠা নিয়ে তাদের মধ্যে কোনো অনুশোচনা বা বিন্দুমাত্র সচেতনতা লক্ষ্য করা যায়নি। তাদের কাছে এটি যেন কেবলই একটি আধুনিক 'ওপেন এয়ার পার্ক'।

শহীদ মিনারের মূল বেদিতে শুধু যে যুগলরাই ভিড় করছেন তা নয়, একদল কিশোরকে দেখা গেল উচ্চশব্দে গান বাজিয়ে টিকটক ভিডিও তৈরি করতে। কেউ কেউ আবার পাদুকা পরেই উঠে পড়ছেন বেদির ওপর, পোজ দিচ্ছেন ছবির জন্য। 

শহীদ মিনারে আসা শিক্ষার্থী রাশিদুল ইসলাম আক্ষেপ করে বলেন, শহীদ মিনার এখন শহীদদের স্মরণ করার চাইতে বেশি আনন্দ বিনোদনের কেন্দ্র হয়ে উঠেছে। সকলে এখানে ফুর্তি করতে আসে, যেন এটি কোনো পার্ক বা থিম পার্ক।

শহীদ মিনারের এমন বিনোদনমুখী ব্যবহার দেখে হতাশ স্থানীয় প্রবীণ নাগরিকরা। দর্শনার্থী আশরাফ উদ্দিন বলেন, বর্তমান যুগে মানুষের শহীদদের প্রতি ভালোবাসা বা টান নেই বললেই চলে। শহীদ মিনারটা সুন্দর হয়েছে বলে তারা সবাই এখানে ফুর্তি করার জন্য আসছে। সত্যিকারের অন্তরের থেকে শহীদদের স্মরণ করার মানসিকতা খুব কম মানুষের মধ্যেই দেখা যাচ্ছে।

উল্লেখ্য, জেলা পরিষদের জায়গায় নির্মিত এই স্থাপনাটি ঢাকার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের আদলে পাঁচটি স্তম্ভ এবং পেছনে লাল বৃত্তাকার প্রতীকের সমন্বয়ে তৈরি। গত ২০২৩ সালে এর কাজ শুরু হয় এবং এ বছর একুশের প্রথম প্রহরে ভূমিমন্ত্রী মিজানুর রহমান (মিনু)-সহ প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে এটি উদ্বোধন করা হয়। ৭৪ বছরের অপেক্ষার পর পাওয়া এই গৌরবোজ্জ্বল স্থাপনাটি রাজশাহীর জন্য একটি বড় অর্জন হলেও এর ব্যবহারের ধরন নিয়ে প্রশ্ন উঠছে জনমনে।

 

ইএফ/

Read more — উত্তরাঞ্চল
Home