উত্তরা প্রতিদিন
ঢাকা

স্বাধীনতার ৫৪ বছরে প্রথম মন্ত্রীহীন পাবনা

উত্তরা প্রতিদিন পাবনা প্রতিবেদক ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৫:০৬ পূর্বাহ্ণ
স্বাধীনতার ৫৪ বছরে প্রথম মন্ত্রীহীন পাবনা
সংগৃহীত

১৮২৮ সালে প্রতিষ্ঠিত দেশের অন্যতম প্রাচীন জেলা পাবনা। দীর্ঘ প্রায় দুই শতাব্দীর ইতিহাসে নানা চড়াই-উৎরাই পেরোলেও স্বাধীনতার পর থেকে কোনো সরকার আমলেই মন্ত্রিত্ব বঞ্চিত হয়নি এই জেলা। তবে এবারই প্রথম এই জেলার কোনো প্রতিনিধি ছাড়াই গঠিত হয়েছে নতুন মন্ত্রিসভা। ৫৪ বছরের এই ঐতিহ্য ভেঙে যাওয়ায় পাবনার আপামর জনসাধারণের মাঝে নেমে এসেছে হতাশা। বিশেষ করে পাবনা সদর আসন থেকে ‘চ্যালেঞ্জিং বিজয়ী’ শ্রমিক নেতা শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাসকে ঘিরে যে আশার আলো দেখেছিল জেলাবাসী, মন্ত্রিসভায় তার নাম না থাকায় সেই প্রত্যাশা এখন ফিকে হয়ে গেছে।

জানা গেছে, ১৯৭২ সাল থেকে বিগত সরকার (২০২৪) পর্যন্ত প্রতিটি মেয়াদেই পাবনা থেকে গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রী দায়িত্ব পালন করেছেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সরকারে ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী (স্বরাষ্ট্র ও অর্থমন্ত্রী), জিয়াউর রহমানের সরকারে মির্জা আবদুল হালিম (নৌ-পরিবহন প্রতিমন্ত্রী), এরশাদ সরকারের আমলে এ কে খন্দকার (পরিকল্পনামন্ত্রী) ও মেজর (অব.) মনজুর কাদের (ত্রাণ ও পুনর্বাসন প্রতিমন্ত্রী) দায়িত্ব পালন করেন।

১৯৯১ সালে ওজি খান (সংস্থাপন প্রতিমন্ত্রী), ১৯৯৬ সালে অধ্যাপক আবু সাঈদ (তথ্য প্রতিমন্ত্রী), ২০০১ সালে মতিউর রহমান নিজামী (কৃষি ও শিল্পমন্ত্রী), ২০০৯ সালে পুনরায় এ কে খন্দকার এবং শামসুল হক টুকু (স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ও পরে ডেপুটি স্পিকার) এবং ২০১৪ সালে শামসুর রহমান শরীফ ডিলু (ভূমিমন্ত্রী) দায়িত্ব পালন করে জেলার প্রতিনিধিত্ব করেছেন। কিন্তু এবারই প্রথম সেই ধারায় ছেদ পড়ল। দীর্ঘ ৩০ বছর পর বিএনপি পাবনা সদর আসন পুনরুদ্ধার করেছে। দলমত নির্বিশেষে সাধারণ মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাসের বিজয়ের পর পাবনাবাসী তাকে পূর্ণ মন্ত্রী হিসেবে দেখার প্রহর গুনছিলেন।

পাবনা নাগরিক কমিটির কো-চেয়ারম্যান ও সাবেক পৌর মেয়র জহুরুল ইসলাম বিশু বলেন, ‘শিমুল বিশ্বাসকে মন্ত্রী বানালে পাবনার মানুষকে যথাযথ সম্মান দেওয়া হতো। প্রাচীন এই জেলাটি দীর্ঘদিন ধরে উন্নয়নবঞ্চিত।’ সাধারণ সম্পাদক বাশার খান জুয়েল জানান, জোটের রাজনীতির কারণে অতীতে যোগ্য প্রার্থীকে ভোট দিতে না পারলেও এবার মানুষ শিমুল বিশ্বাসের ওপর আস্থা রেখেছে। 

পাবনা এডওয়ার্ড কলেজের অধ্যাপক রুহুল আমিন মনে করেন, ‘শিমুল বিশ্বাসের মানবিকবোধ ও ব্যক্তিত্বের কারণে সব মহলে তার গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। তিনি মন্ত্রী হওয়ার যোগ্য ছিলেন।’ 

পাবনা মোটর মালিক গ্রুপের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আবুল হোসেন রেয়ন মনে করেন, ‘পরিবহন খাত থেকে শুরু করে আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে তার বিচক্ষণতা প্রশ্নাতীত। তাকে মন্ত্রী করলে অবহেলিত পাবনার উন্নয়ন ত্বরান্বিত হতো।’

১৮২৮ সালে জেলা হিসেবে মর্যাদা পাওয়া পাবনায় মানসিক হাসপাতাল ও বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থাকলেও জেলার অবকাঠামো, স্বাস্থ্য ও শিক্ষাসেবা খাত যেন বার্ধক্যে ভুগছে। পাবনা জেনারেল হাসপাতাল ও বিশেষায়িত মানসিক হাসপাতাল জনবল সংকটে ধুঁকছে। রাস্তাঘাটের বেহাল দশা আর কর্মসংস্থানের অভাবে ২৮ লাখ মানুষের এই জেলাটি উন্নয়নের দৌড়ে অনেকটা পিছিয়ে। স্থানীয়দের মতে, একজন শক্তিশালী মন্ত্রীর অভাবেই পাবনা আজও আধুনিক সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত।

মন্ত্রিসভায় স্থান না পাওয়া এবং জেলাবাসীর প্রত্যাশা নিয়ে নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাস বলেন, ‘আমি পদ-পদবির প্রত্যাশায় রাজনীতি করি না। পাবনার মানুষ যে আস্থা নিয়ে আমাকে বিজয়ী করেছেন, আমৃত্যু সেই আস্থার মর্যাদা রক্ষা করে যাব। আমি মানুষের সেবাতেই নিয়োজিত থাকতে চাই।’

এদিকে পাবনা-৩ আসন থেকে কৃষক দলের কেন্দ্রীয় সভাপতি কৃষিবিদ হাসান জাফির তুহিন এবং পাবনা-৪ এলাকা থেকে বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা হাবিবুর রহমান হাবিবকে ঘিরে স্থানীয় ভোটারদের মধ্যে প্রত্যাশা ছিল। কিন্তু দলীয় বিদ্রোহী প্রার্থীর কাছে তারা পরাজিত হওয়ায় সেই সম্ভাবনা শুরুতেই ভেস্তে যায়। ফলে এই দুই আসনের মানুষের মাঝেও হতাশা বিরাজ করছে।

পাবনা-১ (সাঁথিয়া) আসনের জামায়াতের প্রার্থী ব্যারিস্টার নাজিবুর রহমান মোমেন দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে ১ লাখ ২৮ হাজার ৪৬৭ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি প্রার্থী ভিপি শামসুর রহমান পেয়েছেন ১ লাখ ৩ হাজার ৬৬৩ ভোট। পাবনা-২ (সুজানগর-বেড়া) আসনের বিএনপির এ কে এম সেলিম রেজা হাবিব ধানের শীষ প্রতীকে ২ লাখ ১৩ হাজার ৯৫০ ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতের কে এম হেসাব উদ্দিন পেয়েছেন ৩৭ হাজার ৯১৬ ভোট। পাবনা-৩ (চাটমোহর-ভাঙ্গুড়া-ফরিদপুর) আসনে জামায়াতের আলী আছগার ১ লাখ ৪৭ হাজার ৪৭৫ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী কৃষক দল সভাপতি হাসান জাফির তুহিন ধানের শীষ প্রতীকে পেয়েছেন ১ লাখ ৪৪ হাজার ২০৬ ভোট। পাবনা-৪ (ঈশ্বরদী-আটঘরিয়া) আসনে জামায়াতের অধ্যাপক আবু তালেব মণ্ডল ১ লাখ ৩৭ হাজার ৭৭৫ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির হাবিবুর রহমান পেয়েছেন ১ লাখ ৩৪ হাজার ২৩ ভোট।

 

 

ইএফ/ 

Read more — উত্তরাঞ্চল
Home