উত্তরা প্রতিদিন
ঢাকা

পদ্মার পাড়ে ইতিহাসের সাক্ষী তালাইমারী শহীদ মিনার

উত্তরা প্রতিদিন উত্তরা প্রতিবেদক ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৪:৫৩ পূর্বাহ্ণ
পদ্মার পাড়ে ইতিহাসের সাক্ষী তালাইমারী শহীদ মিনার
তালাইমারী শহীদ মিনার -উত্তরা প্রতিদিন

রাজশাহী নগরীর তালাইমারী এলাকায় পদ্মা নদীর তীর সংলগ্নে অবস্থিত তালাইমারী শহীদ মিনার স্থানীয়দের কাছে এক ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক প্রতীক হিসেবে পরিচিত। পদ্মার মনোরম পরিবেশে দাঁড়িয়ে থাকা এই শহীদ মিনারটি কেবল একটি স্থাপনা নয়, বরং মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি, ত্যাগ ও স্থানীয় ঐতিহ্যের বহিঃপ্রকাশ।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, আনুমানিক ১৯৯৪ থেকে ১৯৯৫ সালের মধ্যে শহীদ মিনারটি স্থায়ীভাবে নির্মাণ করা হয়। তবে এর সূচনা আরও আগে। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় পদ্মার পার সংলগ্ন এলাকায় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীরা একটি ক্যাম্প স্থাপন করে। স্থানীয়দের অভিযোগ, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় পাক হানাদার বাহিনী এখানে গুলি চালানোর অনুশীলন করতো। তারা বিভিন্ন এলাকা থেকে নীরিহ মানুষদের ধওে এনে হত্যা করে নদীতে ভাসিয়ে দিতো। সেই বিভীষিকাময় স্মৃতিকে ধারণ করেই এলাকাবাসী পদ্মার পাড়ে একটি স্থায়ী শহীদ মিনার নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেন। স্বাধীনতার পর প্রথমদিকে ব্যক্তি মালিকানাধীন একটি স্থানে অস্থায়ীভাবে শহীদ মিনার নির্মাণ করে ১৬ ডিসেম্বর ও ২১ ফেব্রুয়ারি শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো হতো। পরবর্তীতে সেটি স্থানান্তর করে পদ্মা নদীর পাড় সংলগ্ন বর্তমান উন্মুক্ত স্থানে স্থাপন করা হয়।

স্থানীয়রা জানান, শহীদ মিনার নির্মাণের উদ্যোক্তাদের মধ্যে স্থানীয় বাসিন্দা আশরাফ, বাঙালি, আইয়ুব, সাক্তারসহ আরও অনেকে ছিলেন। তবে সবার নাম এখন আর জানা যায় না। স্থানীয় বাসিন্দা মোঃ ইসলাম শাহ্ জানান, ১৯৯১ সালে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর এবং মিজানুর রহমান মিনু সিটি করপোরেশনের মেয়র সিলেকশন হওয়ার পর এলাকাবাসী স্থায়ী শহীদ মিনার নির্মাণের দাবি জানান। পরে তিনটি নকশা উপস্থাপন করা হলে স্থানীয়রা বর্তমান নকশাটি বাছাই করেন এবং সেই অনুযায়ী স্থায়ী শহীদ মিনার নির্মাণ করা হয়। শহীদ মিনারের পাশে মোট ৬৪ জনের নাম তালিকাভুক্ত রয়েছে বলে স্থানীয়রা জানান।

এদিকে প্রতি বছর ২১ ফেব্রুয়ারি মহান শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস এবং ১৬ ডিসেম্বর মহান বিজয় দিবসে শহীদ মিনারটি বিশেষভাবে প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে ফুল দিয়ে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো হয়। ১৬ ডিসেম্বর উপলক্ষে শহীদ মিনার সংলগ্ন মাঠে স্থানীয়রা খেলাধুলার আয়োজনও করেন।

স্থানীয়দের মতে, পদ্মার পাড়ে অবস্থিত হওয়ায় বছরজুড়েই এখানে মানুষের উপস্থিতি দেখা যায়। বিকেল থেকে রাত পর্যন্ত অনেকেই পরিবার-পরিজন ও বন্ধুদের নিয়ে সময় কাটাতে আসেন। দূর-দূরান্ত থেকেও দর্শনার্থীরা শহীদ মিনার পরিদর্শনে আসেন। মনোমুগ্ধকর পরিবেশের কারণে এখানে এলে এক ধরনের মানসিক প্রশান্তি পাওয়া যায়। বিকেলে শহীদ মিনার সংলগ্ন মাঠে অস্থায়ী খাবারের দোকান বসে। ভাজাপোড়া ও বিভিন্ন ধরনের খাবার বিক্রি হয় এসব দোকানে। এছাড়া বিভিন্ন সময়ে এখানে মেলাও বসে, যেখানে খেলনা ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দোকান দেখা যায়।

স্থানীয় তরুণ আবুল বাসার শুভ জানান, ছোটবেলা থেকেই তিনি শহীদ মিনার সংলগ্ন মাঠে খেলাধুলা করে বড় হয়েছেন। একুশে ফেব্রুয়ারি উপলক্ষে শহীদ মিনারে ফুল দিতে আসার স্মৃতি এখনো তার মনে গেঁথে আছে। তার মতে, শহীদ মিনার ও এর মাঠ শুধু একটি ঐতিহাসিক স্থান নয় এটি স্থানীয়দের বেড়ে ওঠা ও ঐতিহ্যের অংশ।

স্থানীয় খেলোয়াড় মাহবুব হাসান অভি বলেন, মাঠটি তাদের দৈনন্দিন খেলাধুলার অন্যতম প্রধান স্থান। প্রতিদিন বিকেলে তারা এখানে ফুটবল ও ক্রিকেট খেলতে আসেন। এই মাঠেই তাদের বন্ধুত্ব, স্মৃতি ও বেড়ে ওঠা জড়িয়ে আছে।

রাজশাহী সিটি করপোরেশনের ২৫, ২৭ ও ২৮ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক সংরক্ষিত মহিলা কাউন্সিলর মোসাঃ নুরুন্নাহার বেগম বলেন, ছোটবেলা থেকে এই শহীদ মিনার দেখে আসছি। একুশে ফেব্রুয়ারি ও ১৬ ডিসেম্বর রাত ১২টায় ফুল দিতে আসতো। কাউন্সিলর হওয়ার পর শহীদ মিনার কেন্দ্রিক বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান আয়োজনের উদ্যোগ নিয়েছি। 

পদ্মার পাড়ে দাঁড়িয়ে থাকা তালাইমারী শহীদ মিনার আজও স্মরণ করিয়ে দেয় মুক্তিযুদ্ধের আত্মত্যাগ, ভাষা আন্দোলনের চেতনা এবং স্থানীয় মানুষের ঐক্য ও আবেগের ইতিহাস।

 

 

 

ইএফ/ 

Read more — উত্তরাঞ্চল
Home