উত্তরা প্রতিদিন
ঢাকা

১৭ কোটি টাকার ওষুধ বিনামূল্যে এনে প্রশংসায় ভাসছেন ইন্টার্ন চিকিৎসক

উত্তরা প্রতিবেদক ৩০ আগস্ট ২০২৫, ০১:০১ অপরাহ্ণ
১৭ কোটি টাকার ওষুধ বিনামূল্যে এনে প্রশংসায় ভাসছেন ইন্টার্ন চিকিৎসক

অবহেলা নয়, সময়ই যেন ছিল সবচেয়ে বড় বাধা। স্ট্রোক বা হার্ট অ্যাটাকে আক্রান্ত রোগী হাসপাতালে পৌঁছার আগেই পার হয়ে যায় চিকিৎসার ‘সুবর্ণ সময়সীমা’। ব্যয়বহুল থ্রোম্বোলাইটিক ইনজেকশন ‘অ্যাল্টেপ্লেস’ সবার নাগালের বাইরে। তাই প্রাণে বাঁচলেও পঙ্গুত্ব ছিল অনিবার্য বাস্তবতা। এবার সেই বাস্তবতায় পরিবর্তনের ইঙ্গিত। কারণ, রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে এসেছে প্রায় ১৭ কোটি টাকা মূল্যের আড়াই হাজার ভায়াল অ্যাল্টেপ্লেস। এতে অন্তত ৫০০ রোগী এবার বিনামূল্যে এই ওষুধটি পাবেন। আর এই যুগান্তকারী উদ্যোগের নায়ক- রাজশাহী মেডিকেল কলেজের (রামেক) ইন্টার্ন চিকিৎসক শীর্ষ শ্রেয়ান।

জানা যায়, প্রথমবারের মতো দেশের কোনো সরকারি হাসপাতালে এমন বিপুল পরিমাণ দামী ওষুধ একজন ইন্টার্ন চিকিৎসকের ব্যক্তিগত উদ্যোগ ও আন্তর্জাতিক সংস্থার সহায়তায় এসেছে। চিকিৎসক হওয়ার আগেই ‘চিকিৎসকত্বের’ এমন অনন্য নজির গড়ে প্রশংসায় ভাসছেন শীর্ষ শ্রেয়ান। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শুধু চিকিৎসা নয়, নেতৃত্ব, দূরদর্শিতা ও মানবিক দায়িত্ববোধেরও অনুকরণীয় উদাহরণ হয়ে উঠেছেন শীর্ষ। তার এই সাহসী ও ফলপ্রসূ উদ্যোগ দেখিয়ে দিয়েছে—সৎ চেষ্টা ও সদিচ্ছা থাকলে জীবন বাঁচানো অসম্ভব নয়। আর এমন সহানুভূতির পথ ধরে এগিয়ে গেলে একদিন হয়তো বদলে যাবে গোটা ব্যবস্থাটাই।

শীর্ষ শ্রেয়ান রামেকের ৬১তম ব্যাচের শিক্ষার্থী। তার শিক্ষাবর্ষ ২০১৯-২০। তার গ্রামের বাড়ি ময়মনসিংহে। বাবা জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক। তাই তার বেড়ে ওঠা সাভারে। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে এমবিবিএস শেষ করে বর্তমানে ইন্টার্নশিপ করছেন। শিক্ষাজীবনের শেষভাগেই তিনি যুক্ত হন ওয়ার্ল্ড স্ট্রোক অর্গানাইজেশনের একটি আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রকল্পে। সেখান থেকেই বিশ্ব দরবারে তার পথচলার শুরু। তিনি বিশ্বখ্যাত সংগঠন ওয়ার্ল্ড স্ট্রোক অর্গানাইজেশন, ডিরেক্ট রিলিফ এবং এঞ্জেল ইনিসিয়েটিভের সঙ্গে যোগাযোগ ও সমন্বয়ের মাধ্যমে প্রায় ১৭ কোটি টাকা মূল্যের আড়াই হাজার ভায়াল অ্যাল্টেপ্লেস ওষুধ এনেছেন।

গবেষণা সহকারী হিসেবে কাজ করার সময় শীর্ষ একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা তুলে ধরেন—মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ (স্ট্রোক) বা হৃদযন্ত্র বিকল (হার্ট অ্যাটাক) হলে রোগীদের জীবন ও পঙ্গুত্ব থেকে রক্ষায় দ্রুত একটি ইনজেকশন দিতে হয়। দেশের বাজারে এর দাম এক লাখ টাকা। হতদরিদ্র কিংবা মধ্যবিত্ত পরিবারের কেউ তাৎক্ষণিক এটি কিনতে পারেন না। রোগী বাঁচলেও অনেক ক্ষেত্রে পঙ্গুত্ব মেনে নিতে হয়। কিন্তু সরকারের পক্ষে বিনামূল্যে এ ওষুধ সরবরাহ করা সম্ভব না। তখন অস্ট্রেলিয়ার ডিরেক্ট রিলিফ নামের প্রতিষ্ঠানটিতে এই ওষুধটি ছিল প্রায় ৫ হাজার ভায়াল। রিলিফের পরিচালক গর্ডন উইলিয়ামকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের রোগীদের পরিস্থিতির কথা জানানো হয়। কিছু ইনজেকশন দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়। তখন সংস্থাটির এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের পরিচালক গর্ডন উইলকক সরাসরি শীর্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে দুই হাজার ৫০০ ইনজেকশন বিনামূল্যে দিতে সম্মত হন।

জানতে চাইলে শীর্ষ শ্রেয়ান জানান, ‘রাজশাহী মেডিকেল কলেজের পঞ্চম বর্ষে পড়ার সময় আমি ওয়ার্ল্ড স্ট্রোক অর্গানাইজেশনের 'ফিউচার স্ট্রোক লিডারস কোহর্ট-২'–এর অধীনে ‘গ্লোবাল কাভারেজ অব টেলি-স্ট্রোক সার্ভিস’ শীর্ষক একটি গবেষণা প্রকল্পে যুক্ত হই। সেখানে আমি একজন আন্ডারগ্র্যাজুয়েট রিসার্চ অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে কাজ করি। আমার সঙ্গে ছিলেন হাইডেলবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের এক মেডিকেল শিক্ষার্থীও। আমাদের যৌথ গবেষণাপত্রটি ‘ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল অব স্ট্রোক’-এ প্রকাশিত হয় এবং ২০২৪ সালের অক্টোবরে ওয়ার্ল্ড স্ট্রোক একাডেমি থেকে ‘বেস্ট পেপার’ হিসেবে স্বীকৃতি পায়। এই প্রেক্ষাপটেই অস্ট্রেলিয়াভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংস্থা ডিরেক্ট রিলিফের এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলের পরিচালক গর্ডন উইলকক আমার সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তিনি জানতে চান, রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে অ্যাল্টেপ্লেস ওষুধের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে কি না। আমি তখন দেশের প্রেক্ষাপট তুলে ধরি—যেখানে অধিকাংশ স্ট্রোক বা হার্ট অ্যাটাকের রোগী ব্যয়বহুল এই ইনজেকশন কিনতে না পেরে হয় মারা যান, নয়তো পঙ্গুত্ববরণ করেন। সরকারের পক্ষ থেকে বিনামূল্যে এই ওষুধ সরবরাহ সম্ভব নয়। এ পরিস্থিতি জানার পর ডিরেক্ট রিলিফের কাছে থাকা প্রায় পাঁচ হাজার ভায়ালের মধ্য থেকে গর্ডন উইলকক ২,৫০০ ভায়াল আমাদের জন্য দেওয়ার সম্মতি জানান। এরপর আমি বিষয়টি রাজশাহী মেডিকেল কলেজের মেডিসিন বিভাগের অধ্যাপক ডা. আজিজুল হক আজাদ স্যারের সঙ্গে শেয়ার করি। তার সহায়তায় পরে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে ডিরেক্ট রিলিফের আনুষ্ঠানিক চুক্তি সম্পন্ন হয়।'

তিনি আরও বলেন, ‘এখন হাসপাতালে ওষুধ আছে, সুযোগও আছে। কিন্তু রোগীরা যদি দেরি করে আসেন, তাহলে আর কাজে লাগবে না। কেউ যদি দেখেন শরীরের এক পাশ অবশ হয়ে গেছে, মুখ বেঁকে গেছে, কথা জড়িয়ে যাচ্ছে, তাহলে দেরি না করে দ্রুত হাসপাতালে আসুন। সময়ই এখানে সবচেয়ে বড় জীবনরক্ষাকারী।’

রাজশাহী মেডিকেল কলেজের মেডিসিন বিভাগের অধ্যাপক ডা. আজিজুল হক আজাদ বলেন, “এই উদ্যোগের প্রাথমিক যোগাযোগ করেছে ইন্টার্ন চিকিৎসক শীর্ষ শ্রেয়ান। এরপর আমি ও পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এফ এম শামীম আহাম্মদ মিলে পুরো প্রক্রিয়াটি বাস্তবায়ন করি। নেদারল্যান্ডস থেকে আনা অ্যাল্টেপ্লেস ইনজেকশন ভারতীয় বিকল্পের তুলনায় উন্নত এবং দামি। এর বাজারমূল্য প্রায় ১৭ কোটি টাকা।”

তিনি আরও বলেন, “স্ট্রোকের রোগীদের জন্য মূলত এই ওষুধ হলেও, দেশের বাস্তবতায় বেশিরভাগ রোগী সময়মতো হাসপাতালে আসতে পারেন না। তাই আমরা দাতা সংস্থাকে অনুরোধ করি, যেন এটি হৃদ্‌রোগীদের ক্ষেত্রেও ব্যবহার করা যায়। তারা সম্মতি দেয়। প্রতি রোগীর জন্য পাঁচ ভায়াল লাগে, যার বাজারমূল্য প্রায় এক লাখ টাকা। এখন এসব বিনামূল্যে দেওয়া যাবে।”

ডা. আজিজুল জানান, “প্রায় ৫০০ রোগীর চিকিৎসা সম্ভব হবে এ ওষুধ দিয়ে। মেয়াদ আছে ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত। কিডনি ও সিওপিডিসহ আরও কিছু ওষুধ আনার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।”

রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এফ এম শামীম আহাম্মদ বলেন, “এই বিপুল পরিমাণ ওষুধ পাওয়া রামেক হাসপাতালের জন্য এক বড় প্রাপ্তি। প্রায় ১৭ কোটি টাকার অ্যাল্টেপ্লেস ইনজেকশন আমাদের হাতে এসেছে, যা সম্ভব হয়েছে ইন্টার্ন চিকিৎসক শীর্ষ শ্রেয়ানের উদ্যোগ ও অধ্যাপক ডা. আজিজুল হক আজাদের সহযোগিতায়।”

তিনি আরও বলেন, “স্ট্রোকের ক্ষেত্রে এই ওষুধ সাড়ে চার ঘণ্টার মধ্যে এবং হৃদ্‌রোগে ১২ ঘণ্টার মধ্যে প্রয়োগ করতে হয়। অত্যন্ত কার্যকর ও ব্যয়বহুল এই ওষুধটি বুধবার আমরা ৭০টি ভায়াল ওয়ার্ডে সরবরাহ করেছি। অতীতে বিভিন্ন সহায়তা এলেও এত বড় পরিমাণে ওষুধ এই প্রথম রাজশাহীতে এসেছে। শুধু তাই নয়, এই বিপুল পরিমাণ ওষুধ আনতে শুল্ক, পরিবহন ও সংরক্ষণ—সব দায়ভারই নিয়েছে ডিরেক্ট রিলিফ। ফলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কোনও অতিরিক্ত ব্যয় হয়নি।”

রামেকের হৃদরোগ বিভাগের ইনচার্জ ডা. আবির জানান, “প্রথম দিনই ৭০টি ভায়াল ব্যবহার করা হয়েছে। ওষুধ মজুত আছে। এখন আর কাউকে দামী এই ইনজেকশন কিনে আনতে হবে না।”

ইন্টার্ন চিকিৎসক শীর্ষ শ্রেয়ানের প্রশংসা করে রামেক অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. ফয়সাল আলম বলেন, “আমরা বহুবার শিক্ষক পর্যায়ে আন্তর্জাতিক সহায়তা পেয়েছি। কিন্তু শিক্ষার্থী পর্যায়ে এটা অভাবনীয়। শীর্ষ আমাদের গর্ব। তার উদ্যোগ ভবিষ্যৎ চিকিৎসকদের অনুপ্রাণিত করবে।”

উল্লেখ্য, আনুষ্ঠানিক চুক্তির পর নেদারল্যান্ডস থেকে গত ২০ আগস্ট বোহরিঙ্গার কোম্পানির এসব ওষুধ ঢাকায় পৌঁছায়। গত সোমবার ফ্রোজেন ভ্যানে করে এসব ওষুধ বুঝে নেয় রাজশাহী মেডিকেল কলেজ কর্তৃপক্ষ। এর মধ্যে আছে অ্যাল্টেপ্লেস নামের যুগান্তকারী থ্রম্বোলাইটিক ওষুধ, যা স্ট্রোক ও মায়োকার্ডিয়াল ইনফার্কশনের (হৃৎপেশির অক্সিজেনের অভাবজনিত টিস্যুর মৃত্যু) মতো প্রাণঘাতী অবস্থার চিকিৎসায় ব্যবহার করা হয়।

Read more — উত্তরাঞ্চল
Home