
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি প্রশমনে কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার হওয়ায় সরবরাহ বিঘ্নের আশঙ্কা কিছুটা কমেছে। এতে দুই সপ্তাহ পর সোমবার আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৩ শতাংশের বেশি কমে ১১০ ডলারের নিচে নেমেছে।
ট্রেডিং ইকোনমিকসের তথ্য অনুযায়ী, সোমবার শুরুতেই ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি আগের দিনের ১১২.৩২ ডলার থেকে কমে ১১১.৫০ ডলারে লেনদেন শুরু হয়। পরে কিছুটা বেড়ে ধারাবাহিকভাবে নামতে থাকে এবং বিকেল সাড়ে ৫টায় সর্বনিম্ন ১০৮.২০ ডলারে লেনদেন হয়। গত ৩১ অক্টোবর ব্রেন্ট ক্রুড ব্যারেলপ্রতি সর্বোচ্চ ১১৪.২২ ডলারে লেনদেন হয়। সে হিসাবে তেলের দাম কমেছে ৫.২৭ শতাংশ।
অপরদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট ক্রুডের (ডব্লিউটিআই) দাম লেনদেনের শুরুতেই ব্যারেলপ্রতি আগের দিনের ১০২.৯২ ডলার থেকে কিছুটা বেড়ে ১০৩.২৫ ডলারে লেনদেন শুরু হয়। সময়ের ব্যবধানে তা ধারাবাহিকভাবে নামতে থাকে এবং বিকেল সাড়ে ৫টায় সর্বনিম্ন ৯৯.১০ ডলারে লেনদেন হয়। গত ৩১ অক্টোবর ডব্লিউটিআই ক্রুড ব্যারেলপ্রতি সর্বোচ্চ ১০৪.৯২ ডলারে লেনদেন হয়। সে হিসাবে তেলের দাম কমেছে ৫.৫৪ শতাংশ।
এর আগে গত ১৯ অক্টোবর ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ১১০ ডলারের ওপরে উঠে যায়। এরপর থেকে ধারাবাহিকভাবে বাড়তে থাকে। গত ২৩ অক্টোবর চার বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ ১১৭ দশমিক ২০ ডলারে উঠে যায়।
এরপরও মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এবং হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল নিয়ে উদ্বেগের কারণে তেলের বাজারে অস্থিরতা ছিল। তবে নতুন করে আলোচনার উদ্যোগ এবং বড় ধরনের সামরিক উত্তেজনা না বাড়ায় বাজারে দামের চাপ কিছুটা কমেছে।
বার্তা সংস্থা রয়টার্স বলছে, ইরান ও কাতারের কর্মকর্তারা টানা তৃতীয় দিনের মতো আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছেন। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সরাসরি আলোচনা পুনরায় শুরু এবং যুদ্ধের অবসানে সমঝোতার পথ তৈরির লক্ষ্যে এ কূটনৈতিক তৎপরতায় মধ্যপ্রাচ্যে জ্বালানি সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা সাময়িকভাবে কমেছে।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, গত মাসের শেষ দিকে টানা দরবৃদ্ধির পর তেলের বাজারে কারিগরি সংশোধনও হয়েছে।
কেসিএম ট্রেডের প্রধান বাজার বিশ্লেষক টিম ওয়াটারারের ভাষ্য অনুযায়ী, কূটনৈতিক অগ্রগতির আশা এবং সপ্তাহান্তে বড় ধরনের সামরিক উত্তেজনা না ঘটায় তেলের দামে তাৎক্ষণিক চাপ কমেছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ইরানকে ঘিরে উত্তেজনা বাড়লে ব্রেন্টের দাম আবার ১২০ ডলারের দিকে যেতে পারে।
এদিকে, সম্প্রতি তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোর জোট ওপেক প্লাসের বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ডিসেম্বর মাসের জন্য বিদ্যমান উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা অপরিবর্তিত রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা অপরিবর্তিত থাকলেও বাজারে কূটনৈতিক অগ্রগতির প্রত্যাশা এবং সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতির সম্ভাবনা দামের ওপর প্রভাব ফেলছে।
তবে তেলের বাজারে ঝুঁকি পুরোপুরি কাটেনি। হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ এখনো রয়েছে। এই নৌপথে কোনো বড় ধরনের হামলা বা অবরোধ হলে বিশ্ববাজারে তেল সরবরাহে নতুন সংকট তৈরি হতে পারে। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ইরানকে ঘিরে ওয়াশিংটনের অবস্থান কী হয়, সেটিও বাজারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামরিক শক্তি ব্যবহারের পরিবর্তে ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘাতের একটি কূটনৈতিক সমাধান চান। তিনি এখনো চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত নেননি। তবে তিনি অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলেছেন, যদি সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার প্রয়োজন হয়, তবে তা কার্যকর করার সক্ষমতা যুক্তরাষ্ট্রের রয়েছে এবং সফল হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় সবকিছুই তাদের হাতে আছে।
তবে আল জাজিরার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কাতারের মধ্যস্থতায় দুই দিন আলোচনার পর ইরানি কর্তৃপক্ষ ইঙ্গিত দিয়েছে, দাবিগুলো কার্যকরভাবে পূরণ করা হলে এখনো একটি সমঝোতায় পৌঁছানো সম্ভব।
এর আগে এমন খবর পাওয়া গিয়েছিল যে, মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান উভয় পক্ষই আরও সামরিক হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল এবং দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
গত শনিবার ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মুজতবা খামেনি দেশটির সশস্ত্র বাহিনীকে নির্দেশ দিয়েছেন, তারা যেন যেকোনো ধরনের বা পর্যায়ের হুমকির মোকাবিলায় তাৎক্ষণিক, কার্যকর এবং ভৌগোলিক সীমাবদ্ধতাহীন জবাব দেয়।
আবার মধ্যপ্রাচ্য ও ইউক্রেন সংঘাত নিয়ে উদ্বেগ নিকট ভবিষ্যতে অব্যাহত থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। পিভিএম অয়েল অ্যাসোসিয়েটসের বিশ্লেষক তামাস ভার্গা বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে জাহাজ ও তেল শোধনাগারে এবং ইউক্রেনে বেসামরিক নাগরিকদের ওপর হামলা অব্যাহত রয়েছে। এসব ঘটনা অদূর ভবিষ্যতে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা নিয়ে আশাবাদী হওয়ার মতো কোনো পরিস্থিতি তৈরি করছে না। তবুও আশা তো সব সময়ই থাকে।
উত্তরা/ এ এম

