
মানুষের ভাব প্রকাশ ও পারস্পরিক যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম কথোপকথন। আমাদের সমাজ অনেকটাই কথার ওপর নির্ভরশীল। মানুষের সঙ্গে যোগাযোগের অন্যতম প্রধান মাধ্যম হলো কথা। জীবনের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই আমরা এর ব্যবহার করি। কিন্তু অসতর্কভাবে বলা কথা কখনো কখনো এমন ক্ষত তৈরি করতে পারে, যা পরে আর সহজে মুছে ফেলা যায় না। তাই কথা বলার ক্ষেত্রে সংযম, ভদ্রতা ও সত্যবাদিতার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে ইসলাম। মহানবী (সা.) ভালো কথা বলতে বলেছেন অথবা নীরব থাকতে বলেছেন।
এক হাদিসে মহানবী (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি আল্লাহ ও শেষ দিবসের প্রতি বিশ্বাস রাখে, সে যেন ভালো কথা বলে অথবা নীরব থাকে। (বুখারি)
এই হাদিস মানুষের সামগ্রিক আচরণ এবং বিশেষ করে কথাবার্তার আদব নিয়ে গভীরভাবে ভাবার সুযোগ করে দেয়।
ছোটবেলায় আমরা অনেকে বলতে শুনেছি, ভালো কিছু বলতে না পারলে চুপ থাকাই ভালো। ভাবনা চিন্তা ছাড়া কথা বলার কারণে বড়দের কাছ থেকে বকুনিও শুনতে হয়েছে অনেককে।
মুখ থেকে বেরিয়ে যাওয়া কথাকে বন্দুক থেকে ছুটে যাওয়া গুলির সঙ্গে তুলনা করা হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লেখা কিংবা আবেগের মুহূর্তে প্রকাশ করা কথার ক্ষেত্রেও বিষয়টি প্রযোজ্য। একবার মুখ থেকে কথা বেরিয়ে গেলে তা এমন ক্ষতি করতে পারে, যা পরে আর ফিরিয়ে নেওয়া সম্ভব হয় না।
কথোপকথনে মহানবী (সা.)-এর শিক্ষা
আমরা সবাই এমন কাউকে চিনি, যিনি সময়-অসময়ে কথা বলে ফেলেন, ভুল কিছু বলে পরিস্থিতিকে অস্বস্তিকর করে তোলেন কিংবা অন্যদের অনুপযুক্ত প্রশ্ন করেন। এমন কেউ কেউ আবার অন্যদের কথা বলার সুযোগও দেন না। উদ্দেশ্য খারাপ না হলেও এ ধরনের আচরণ অনেক সময় আশপাশের মানুষকে বিরক্ত করে।
কথোপকথনের সময় কয়েকটি বিষয় মেনে চললে ভুল বোঝাবুঝি ও অন্যের মনে কষ্ট দেওয়া এড়ানো সম্ভব।
কথার জন্য জবাবদিহি
আমাদের মনে রাখতে হবে, আমাদের বলা কথার জন্য একদিন জবাবদিহি করতে হবে। আমরা লিখিত, মৌখিক কিংবা অন্য কোনোভাবে যে কথাই প্রকাশ করি না কেন, তার দায়িত্ব আমাদের নিজেদের। ভুল কথা বলে ফেললে তার জন্য ক্ষমা চাওয়া উচিত।
কিছু মানুষের স্বাভাবিকভাবেই কথা বলার আকর্ষণীয় ক্ষমতা বেশি থাকে। তবে সুন্দরভাবে কথা বলা এমন একটি দক্ষতা, যা চর্চার মাধ্যমে সবাই আয়ত্ত করতে পারে।
হয়তো সবাই খুব বাকপটু হয়ে উঠতে পারবে না। কিন্তু এমনভাবে কথা বলা শেখা সম্ভব, যাতে একজন ভালো বন্ধু বা সম্মানিত অতিথি হিসেবে অন্যরা আমাদের মূল্য দেয়। বিভিন্ন সামাজিক আয়োজনে এটি আমাদের আলাদা করে তুলতে পারে, অন্যদের মুগ্ধ করতে পারে এবং নতুন বন্ধুত্ব তৈরির সুযোগও করে দিতে পারে।
বয়স্কদের সম্মান
মুসলিম হিসেবে আমাদের শেখানো হয়েছে, কারও সঙ্গে অমার্জিত আচরণ করা উচিত নয়। বিশেষ করে বয়স্ক মানুষদের উপেক্ষা করা, তাদের সঙ্গে অসম্মানজনকভাবে কথা বলা কিংবা তাদের প্রতি সৌজন্য না দেখানো অত্যন্ত দুঃখজনক।
বয়সে বড় মানুষের জীবনে অনেক অভিজ্ঞতা থাকে। তাদের কথা শোনা ও অভিজ্ঞতা থেকে শেখার সুযোগ আমাদের রয়েছে। বয়স্ক ও সবার সঙ্গে ভদ্রতা ও সৌজন্য দেখানো আমাদের চরিত্রের পরিচয় দেয়। আর যারা আমাদের চেয়ে অনেক বেশি সময় ধরে পৃথিবীতে আছেন, তাদের উপেক্ষা করা আমাদেরই অসৌজন্যের প্রকাশ।
উচ্চস্বরে কথা নয়
কথার ধরণ একটি সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারে, আবার সেটি নষ্টও করতে পারে। তাই কথা বলার সময় কণ্ঠের স্বর ও শব্দের মাত্রা—দুটির প্রতিই খেয়াল রাখা প্রয়োজন। অপ্রয়োজনীয়ভাবে উচ্চস্বরে কথা বলা অন্যকে বিরক্ত বা কষ্ট দিতে পারে। এর ফলে যোগাযোগে সমস্যা তৈরি হয় এবং পরবর্তী আলোচনার চেষ্টাও ব্যর্থ হতে পারে।
কোরআনে বলা হয়েছে, তুমি চলাফেরায় মধ্যপন্থা অবলম্বন কর এবং তোমার কণ্ঠস্বর নিচু কর। নিশ্চয়ই সব শব্দের মধ্যে গাধার শব্দই সবচেয়ে অপ্রীতিকর। (সুরা লুকমান, আয়াত :১৯)
কথা বলার আগে ভাবুন
কথা বলার আগে চিন্তা করা অনেকের জন্য কঠিন। বিশেষ করে নিজেকে সঠিক প্রমাণ করার চেষ্টা করলে আমরা অনেক সময় না ভেবেই কথা বলে ফেলি।
একজন মুসলিমের কথাবার্তার গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো, কেউ খারাপ কথা বললেও তার জবাবে খারাপ কথা না বলা। যারা কটু কথা বলে, তাদের সঙ্গে এমন অপ্রয়োজনীয় কথোপকথনে জড়ানো উচিত নয়, যা শেষ পর্যন্ত কোনো ফল বয়ে আনে না।
কোরআনে বলা হয়েছে, আর যখন অজ্ঞরা তাদের সম্বোধন করে, তখন তারা শান্তির কথা বলে জবাব দেয়। (সুরা আল-ফুরকান, আয়াত :৬৩)
তাই কোনো কথা বলার আগে নিজেকে প্রশ্ন করা উচিত—আমি যা বলতে যাচ্ছি, তা কি উপকারী, উৎসাহব্যঞ্জক, প্রয়োজনীয় কিংবা সদয়? কোনো কথা বলার সামর্থ্য আছে বলেই যে তা বলা উচিত, এমন নয়।
রাগের সময় নীরবতা
আমাদের জীবনে এমন কিছু মানুষ থাকেন, যাদের আচরণ আমাদের প্রচণ্ড বিরক্ত করে। তাদের অন্যায়, অকৃতজ্ঞতা কিংবা অসৌজন্যমূলক আচরণ নিয়ে আমরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা ভাবতে পারি। কিন্তু ওই ব্যক্তির ওপর রাগ করা কোনো সমস্যার সমাধান না। মনে রাখতে হবে, কখনো কখনো নীরবতাই সবচেয়ে প্রয়োজনীয় কথা হয়ে ওঠে।
সত্যবাদী হোন
কখনো কোনো বক্তব্যের সত্যতা নিশ্চিত করতে আমরা আল্লাহর নাম বা তার কোনো গুণের নামে শপথ করি। তবে এটিকে অভ্যাসে পরিণত করা উচিত নয়। আল্লাহর নাম অসতর্কভাবে ব্যবহার করা উচিত নয়। তার নামে শপথ করা অত্যন্ত গুরুতর বিষয়।
ইসলাম সত্যবাদিতার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে এবং মিথ্যাকে নিষিদ্ধ করেছে। আল্লাহ একজন মুসলিমকে সত্যবাদী হওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। কোরআনে বলা হয়েছে, হে মুমিনগণ, আল্লাহকে ভয় করো এবং সত্যবাদীদের সঙ্গে থাকো। (সুরা আত-তাওবা, আয়াত :১১৯)
মহানবী (সা.) বলেছেন, সত্যবাদিতা মানুষকে নেকির দিকে নিয়ে যায়, আর নেকি জান্নাতের দিকে নিয়ে যায়। একজন মানুষ সত্য বলতে বলতে আল্লাহর কাছে সত্যবাদী হিসেবে লিপিবদ্ধ হয়। আর মিথ্যা মানুষকে পাপাচার ও অসৎকর্মের দিকে নিয়ে যায়, আর পাপাচার জাহান্নামের দিকে নিয়ে যায়। একজন মানুষ মিথ্যা বলতে বলতে আল্লাহর কাছে মিথ্যাবাদী হিসেবে লিপিবদ্ধ হয়। (বুখারি)
জিহ্বাকে সংযত রাখুন
বাস্তবে সবসময় ভদ্র ও শ্রদ্ধাশীলভাবে কথা বলা সহজ নয়। এটি আমাদের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। তাই রাগের সময় কথা বলার প্রবণতা নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। প্রয়োজনে জিহ্বাকে সংযত রাখতে হবে। অনেক সময় কিছু না বলার মধ্যেও বড় কল্যাণ রয়েছে।
একটি চিন্তা থেকে জন্ম নেয় একটি কথা। একটি কথা পরিণত হয় কাজে। একটি কাজ ধীরে ধীরে অভ্যাসে পরিণত হয়। শেষ পর্যন্ত এসবই নির্ধারণ করে অন্যরা আমাদের কীভাবে দেখে ও মূল্যায়ন করে। তাই মনে রাখা উচিত, রাগের মুহূর্তে একবার ধৈর্য ধরতে পারলে পরবর্তী সময়ে শত মুহূর্তের অনুশোচনা থেকে বেঁচে যাওয়া সম্ভব।
উত্তরা/এএইচ

