
বিশ্বের প্রত্যেক মুমিন-মুসলিমের কাছে পবিত্র স্থান হিসেবে পরিচিত মক্কা নগরী। বায়তুল্লাহ বা পবিত্র কাবার কারণে এই নগরীর প্রতি মুসলিমদের বিশেষ সম্মান ও ভক্তি রয়েছে। মক্কার প্রতি মানুষের অন্তরের বিশেষ আকষর্ণের আরেকটি কারণ এই ভূমিতে আল্লাহর রাসুল (সা.) জন্মগ্রহণ করেছেন।
মক্কায় অবস্থিত পবিত্র মসজিদুল হারাম পৃথিবীর সর্বপ্রথম নির্মিত মসজিদ। আবু জর গিফারি (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি জিজ্ঞেস করলাম, হে আল্লাহর রাসূল! পৃথিবীতে সর্বপ্রথম কোন মসজিদটি নির্মাণ করা হয়েছে? তিনি বললেন, ‘মসজিদে হারাম। আমি জিজ্ঞেস করলাম, এরপর কোনটি? তিনি বললেন, মসজিদে আকসা। (বুখারি)।
ইসলামী ধারণা অনুয়ায়ী হজরত আদম (আ.)-এর সৃষ্টির ২ হাজার বছর আগে পৃথিবীর প্রথম ঘর কাবা নির্মাণ করা হয়। আল্লাহর নির্দেশে কাবাঘরের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন ফেরেশতারা। আদম (আ.) পৃথিবীতে আসার পর আল্লাহ তায়ালার হুকুমে আবার কাবাগৃহ নির্মাণ করেন এবং কাবাকেন্দ্রিক বিভিন্ন ইবাদত-বন্দেগির নির্দেশ পান।
হজরত নূহ (আ.)-এর যুগে মহাপ্লাবনে এ ঘর নিশ্চিহ্ন হয়ে গেলে আল্লাহ তায়ালার নির্দেশে কাবাঘর পুনর্নির্মাণ করেন হজরত ইবরাহিম (আ.) ও তার ছেলে হজরত ইসমাইল (আ.)।
বিজ্ঞাপন
ইতিহাসে হামলা, মহামারি, দখল ও বিভিন্ন ঘটনাপ্রবাহের মধ্য দিয়ে গিয়েছে মুসলিম বিশ্বের কাছে পবিত্র নগরী হিসেবে পরিচিত মক্কা নগরী ও কাবা শরীফ।
ইসলাম আগমনের আগেও মানুষ মক্কায় গিয়ে কাবা তাওয়াফ করতো এবং কাবার সামনে ইবাদত করতো। মক্কার কাবার সম্মান ও মর্যাদার বিষয়টি চক্ষুশূল হয়ে উঠে ইয়েমেনের গভর্নর আবরাহা বিন সবাহর কাছে। খ্রিস্টীয় ৫৭০ সালে আবরাহা তৎকালীন ইয়েমেনের রাজধানী সানায় একটি বিশাল গির্জা নির্মাণ করছিলেন। মক্কার কাবার বিপরীতে এই নতুন গির্জাকে তীর্থযাত্রার নতুন কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন তিনি।
কিন্তু তিনি বুঝতে পারেন, কাবা ইতোমধ্যেই ইবাদতের কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। আল্লাহর একত্ববাদে বিশ্বাসীদের কেউ আবরাহার তৈরি উপাসনালয়ের প্রতি আকৃষ্ট হয়নি। একত্ববাদে বিশ্বাসীদের প্রতি মনে পুষে রাখা ক্ষোভ থেকে পবিত্র মক্কা ধ্বংসের জন্য আবরাহা বড় ধরনের সামরিক অভিযান পরিচালনা করেন।
৫৭০ খ্রিস্টাব্দে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জন্মের এক বছর আগে, আবরাহা হিজাজের দিকে অভিযান শুরু করেন। কথিত আছে, তার বিশাল সেনাবাহিনীর সঙ্গে একটি হাতিও ছিল। সেনাবাহিনী পবিত্র কাবার কাছাকাছি পৌঁছালে হাতিটি আর সামনে এগোয়নি।
আবরাহার বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার মতো সক্ষমতা ও প্রস্তুতি ছিল না মক্কার বাসিন্দাদের। তাই তারা পাহাড়ে আশ্রয় নেন। যুদ্ধের আশঙ্কায় ওই বছর মানুষ মক্কায় হজ করতে পারেনি।
আবরাহার বাহিনী অবরোধ ধরে রাখতে পারেনি। তাদের ওপর ঐশী শক্তির আঘাত আসে এবং শেষ পর্যন্ত তার বাহিনী ধ্বংস হয়ে যায়। এর মাধ্যমে মক্কায় অবরোধের অবসান ঘটে।
কারমাতিদের হাতে হাজিদের হত্যাকাণ্ড
৯৩০ খ্রিস্টাব্দের আগে থেকেই মক্কা ও হজযাত্রীদের চলাচলের পথগুলোতে ধারাবাহিকভাবে হামলা চালাতে শুরু করে শিয়া কারমাতি রাষ্ট্র। এরপর থেকে প্রতি বছর মক্কায় হজ করতে আসা মানুষের সংখ্যা কমতে থাকে। জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তার অভাবের কারণে ৯৩০ সালে হজ পালন থেকে বিরত থাকার ফতোয়া দেন আলেমরা। কারমাতিরা ১০ বছরেরও বেশি সময় হজ বন্ধ করে রেখেছিল বলে অনেক ইতিহাসবিদের মত।
একই বছর কারমাতিদের নেতা আবু তাহির আল-জান্নাবি মক্কায় হামলা চালিয়ে হাজার হাজার হাজিকে হত্যা করেন। ইতিহাসবিদদের কারো কারো মতে, নিহতের সংখ্যা ৩০ হাজার।
হামলার নেতৃত্ব দেওয়া আবু তাহির আল-জান্নাবি শুধু মক্কায় হামলা চালিয়ে নামাজ বন্ধ করেননি, ইসলামের অত্যন্ত পবিত্র নিদর্শনগুলোরও অবমাননা করেছিলেন। কাবার কাছে অবস্থিত পবিত্র জমজম কূপও অপবিত্র করেন। নিহত হাজিদের লাশ সেখানে নিক্ষেপ করেন।
মক্কা ছেড়ে যাওয়ার আগে তারা কাবা শরীফের দরজা এবং হাজরে আসওয়াদ বা কালো পাথর লুট করে নিয়ে যায়। চুরি করে নিয়ে যাওয়া এই দুটি বস্তু ২০ বছর কারমাতিদের নিয়ন্ত্রণে ছিল।
৯৫২ সালে আব্বাসীয়রা ১ লাখ ২০ হাজার দিনার দিয়ে এগুলো ফিরিয়ে আনে।
১৯ শতকে কলেরার প্রাদুর্ভাব
উনিশ শতকে কয়েক দফা প্লেগ, কলেরা ও মেনিনজাইটিসসহ বিভিন্ন রোগের প্রাদুর্ভাব ঘটে। এই ভয়াবহ রোগগুলোর প্রাদুর্ভাবের কারণে হজ ও ওমরাহ স্থগিত করা হয়।
১৮১৪ সালে হিজাজ অঞ্চলে প্লেগ মহামারি ছড়িয়ে পড়লে প্রায় ৮ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়। ওই বছর হজ পালনের অনুমতি দেওয়া হয়নি। ১৮৩৭ সালের হজ মৌসুমে আবার একটি মহামারি ছড়িয়ে পড়ে, যা ১৮৯২ সাল পর্যন্ত স্থায়ী হয়। এই দীর্ঘ সময়ের মধ্যে ১৮৪৬ ও ১৮৬৫ সালে মহামারী ভয়াবহ আকার ধারণ করে। ওই পরিস্থিতিতে তৎকালীন কনস্টান্টিনোপলে, বর্তমান ইস্তাম্বুলে একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। হজযাত্রীদের যাত্রাপথে রোগের বিস্তার ঠেকাতে সিনাই ও হিজাজের মতো এলাকায় কোয়ারেন্টাইন বন্দর স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
এই সময়ে প্রাণঘাতী ওই মহামারিতে প্রতিদিন প্রায় এক হাজার মানুষ মারা যেতেন। আক্রান্তদের দেখাশোনার জন্য মিসর থেকে চিকিৎসকদের পাঠানো হয়। তারা মক্কার পথে কোয়ারেন্টাইন কেন্দ্র স্থাপন করেন।
ইতিহাসবিদদের মতে, ১৮৩০ থেকে ১৯৩০ সালের মধ্যে মক্কায় অন্তত ২৭ বার কলেরা মহামারির প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়।
১৯৭৯ সালে মসজিদুল হারাম দখল
১৯৭৯ সালের নভেম্বর ও ডিসেম্বর মাসে সৌদি আরবের একটি সশস্ত্র গোষ্ঠী ৪০০ থেকে ৫০০ সদস্য নিয়ে মসজিদুল হারাম দখল করে। এর ফলে অন্তত দুই সপ্তাহ বন্ধ রাখতে হয় পবিত্র এই মসজিদ।
১৯৭৯ সালের ২০ নভেম্বর সকালে ফজরের নামাজের সময় সৌদি সেনাবাহিনীর সাবেক সদস্য জুহাইমান ইবনে
তিনি মূলত সৌদি রাজপরিবারের শাসনব্যবস্থার সমালোচক ছিলেন এবং তিনি যে ইসলামকে মূলধারার প্রাথমিক রূপ বলে মনে করতেন, সেখানে ফিরে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন।
তিনি সৌদি শাসনব্যবস্থা বাতিল, পশ্চিমা পরাশক্তিগুলোর সঙ্গে সৌদি আরবের সম্পর্ক ছিন্ন, পশ্চিমা দেশগুলোর কাছে তেল বিক্রি বন্ধ এবং বিদেশি সামরিক ঘাঁটি বন্ধসহ কয়েকটি রাজনৈতিক দাবি জানান।
সৌদি আরবের উচ্চ উলামা পরিষদ একটি ফতোয়া জারি করে। এতে সৌদি সরকারকে সশস্ত্র অভিযান চালিয়ে নগরী থেকে বিদ্রোহীদের উৎখাতের অনুমতি দেওয়া হয়।
এই অভিযান প্রায় ১৫ দিন ধরে চলে এবং শেষ পর্যন্ত ফ্রান্সের একটি বিশেষজ্ঞ দলের সহায়তায় এর অবসান ঘটে। এ সময় দুই সপ্তাহ কাবা শরীফ বন্ধ ছিল। শেষ পর্যন্ত সৌদি বাহিনী মসজিদুল হারাম পুনর্দখল করলে অবরোধের অবসান ঘটে।
দুই সপ্তাহের এই অবরুদ্ধ পরিস্থিতির শেষে সংঘর্ষে সৌদি আরবের ১২৭ সেনা, জুহাইমানের ১১৭ সমর্থক এবং ২৬ বেসামরিক নাগরিক নিহত হন। পরে জুহাইমান ও তার ৬২ অনুসারীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।
ইবোলা প্রাদুর্ভাব, ২০১৪
২০১০-এর দশকের শুরুর দিকে ইবোলা প্রাদুর্ভাব চরম আকার ধারণ করলে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ভাইরাসটির কেন্দ্রস্থল পশ্চিম আফ্রিকার কয়েকটি দেশের নাগরিকদের ভিসা দেওয়া স্থগিত করে। ২০১৪ সালে সৌদি আরব গিনি, লাইবেরিয়া ও সিয়েরা লিওনের নাগরিকদের জন্য সাময়িকভাবে ওমরাহ ও হজের ভিসা দেওয়া বন্ধ করে।
২০১৪ সালে ইবোলার বিস্তার ঠেকাতে হজযাত্রীরা হজ শেষে দেশে ফেরার সময় মিসরও বিমানবন্দরগুলোতে সতর্কতা ও নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করে। পশ্চিম আফ্রিকায় হাজারো মানুষের প্রাণ নেওয়া রোগটির বিস্তার ঠেকাতে বিমানবন্দরে নতুন করে চিকিৎসা পরীক্ষা চালু করা হয়।
ওই প্রাদুর্ভাবে ১১ হাজারের বেশি মানুষ মারা যান।
উত্তরা /এএম

