উত্তরা প্রতিদিন
ঢাকা

ইসির ‘নিরপেক্ষতা’ নিয়ে চিন্তিত এনসিপি; ভোট নিয়ে নতুন সংশয়

উত্তরা প্রতিদিন উত্তরা ডেস্ক ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৬:২০ অপরাহ্ণ
ইসির ‘নিরপেক্ষতা’ নিয়ে চিন্তিত এনসিপি; ভোট নিয়ে নতুন সংশয়

স্থানীয় সরকার নির্বাচনের সময়সূচি ঘোষণা নিয়ে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) সঙ্গে সরকারের সমন্বয়হীনতার বিষয়টি সামনে আসায় ইসির নিরপেক্ষতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)।

 

ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনের সম্ভাব্য সময়সূচি নিয়ে সরকার ও ইসির বক্তব্যে বৈপরীত্য দেখা দেওয়ায় নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা, নিরপেক্ষতা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষ করে স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের ক্ষেত্রে কমিশন কতটা স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারছে, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে এনসিপি।

তে না পারলে তাতে দলীয় প্রভাব বিস্তারের আশঙ্কা থেকে যায়, যা অবাধ ও সুষ্ঠু ভোটগ্রহণে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। একাধিক নেতা জানান, কমিশনের বর্তমান ভূমিকা নিয়ে দলটির নীতিনির্ধারকরা চরম চিন্তিত। 

 

এ বিষয়ে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষার ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘নির্বাচন কমিশনের ওপর সরকারের মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীর প্রকাশ্যে হস্তক্ষেপ দেখে আমরা গভীরভাবে চিন্তিত। নির্বাচন কমিশন কতটা নিরপেক্ষ থাকতে পারবে, সেটাই এখন বড় প্রশ্ন।’

 

তিনি আরও বলেন, ‘আমরা বিভিন্ন ইস্যুতে ধারাবাহিকভাবে কর্মসূচি পালন করছি। শুক্রবারও সংসদ ভবনের সামনে কর্মসূচি ছিল এবং শনিবার ১১টি দলের অংশগ্রহণে লংমার্চ হয়েছে। সামনে আমাদের সাংগঠনিক কর্মসূচি আরও বাড়বে। নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা বজায় রাখার দাবিতে আমাদের আন্দোলন অব্যাহত থাকবে।’

 

জানা গেছে, দেশের ৪৫৮০টি ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন সাতটি ধাপে সম্পন্ন করার প্রাথমিক সিদ্ধান্ত নিয়েছিল নির্বাচন কমিশন। সম্প্রতি এক ব্রিফিংয়ে নির্বাচন কমিশনার আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ জানান, আগামী ১২ নভেম্বর প্রথম ধাপের ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। এরপর দ্বিতীয় ধাপ ১৩ ডিসেম্বর, তৃতীয় ধাপ ৩০ ডিসেম্বর, চতুর্থ ধাপ আগামী বছরের ১৭ জানুয়ারি, পঞ্চম ধাপ ৪ ফেব্রুয়ারি, ষষ্ঠ ধাপ ২২ এপ্রিল এবং সপ্তম বা শেষ ধাপের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে ২৭ মে। ইউপি নির্বাচন শেষ করে পর্যায়ক্রমে পৌরসভা, উপজেলা পরিষদ, জেলা পরিষদ ও সিটি করপোরেশন নির্বাচন আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে ইসির, যা শেষ করতে প্রায় এক বছর সময় লাগবে।

 

তবে, নির্বাচন কমিশনারের এই ঘোষণার পরপরই প্রতিক্রিয়া জানান স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম। তিনি দাবি করেন, ইউপি নির্বাচনের তারিখ ঘোষণার বিষয়ে সরকার বা স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় কিছুই জানে না। এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে সরকারের কোনো চিঠি চালাচালি বা আলোচনা হয়নি। অন্য কোনো মাধ্যমেও আলোচনা হয়নি।

 

প্রতিমন্ত্রী আরও উল্লেখ করেন, সাংবিধানিক ক্ষমতাবলে নির্বাচন কমিশন স্বাধীন হলেও স্থানীয় সরকার নির্বাচনের ক্ষেত্রে প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী সরকারের সঙ্গে আলোচনার পরই তারিখ ঘোষণা করা হয়। কারণ বাজেট, প্রস্তুতি সভা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি পর্যালোচনার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় জড়িত থাকে। কিন্তু এবার সেরকম কোনো আলোচনা হয়নি। সরকার এ ব্যাপারে কিছুই জানে না।

 

প্রতিমন্ত্রীর এমন বক্তব্যের পরই নির্বাচনের সময় নির্ধারণ নিয়ে সরকার ও ইসির অভ্যন্তরীণ সমন্বয়হীনতা প্রকাশ্যে চলে আসে। তবে, প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্যের কিছু সময় পর ইসি সচিবালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব আখতার আহমেদ বিষয়টি স্পষ্ট করার চেষ্টা করেন। তিনি সাংবাদিকদের জানান, ইউপি নির্বাচনের জন্য ঘোষিত সময়সূচিটি একেবারেই প্রাথমিক ও সম্ভাব্য ছিল। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলোর সঙ্গে আলোচনা করেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

 

অন্যদিকে, সচিবালয়ে সরকারের কার্যক্রম সম্পর্কিত এক সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান বলেন, সংবিধানে জাতীয় ও রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের জন্য ইসি স্বাধীন হলেও স্থানীয় সরকার নির্বাচনের ক্ষেত্রে সরকারের সঙ্গে সমন্বয় করে সিদ্ধান্ত নেওয়া আবশ্যক। এখানে সরকারের মতামত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং উভয় পক্ষ মিলে সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করবে।

 

নির্বাচন কমিশন সাত ধাপের যে টাইমলাইন দিয়েছিল, তাতে সবাই একটি ইতিবাচক বার্তা পেয়েছিল যে সরকার হয়তো দ্রুত নির্বাচন দিতে চায়। কিন্তু এরপরই মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্যে স্পষ্ট হলো যে ইসির সঙ্গে সরকারের আলোচনা হয়নি। এখান থেকেই বড় ধরনের দ্বিধা ও অনিশ্চয়তার সৃষ্টি হয়েছে।

তবে, স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্য প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ইসি সচিব আখতার আহমেদ বলেন, ‘উনি (প্রতিমন্ত্রী) যা বলেছেন, তা শিরোধার্য। এ বিষয়ে পাল্টা কোনো মন্তব্য করার ধৃষ্টতা আমি দেখাব না— নো কমেন্টস।’

ইসি সচিবের এই মন্তব্যের পর তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে এনসিপি। দলটির আন্তর্জাতিক সেলের ইনচার্জ আলাউদ্দীন মোহাম্মদ ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘নির্বাচন কমিশন সাত ধাপের যে টাইমলাইন দিয়েছিল, তাতে সবাই একটি ইতিবাচক বার্তা পেয়েছিল যে সরকার হয়তো দ্রুত নির্বাচন দিতে চায়। কিন্তু এরপরই মন্ত্রী (স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী) ও প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্যে স্পষ্ট হলো যে ইসির সঙ্গে সরকারের আলোচনা হয়নি। এখান থেকেই বড় ধরনের দ্বিধা ও অনিশ্চয়তার সৃষ্টি হয়েছে। মূল বিষয় হলো, ভোট কবে হবে সেজন্য সরকারি প্রক্রিয়া থাকলেও, নির্বাচন পরিচালনার প্রক্রিয়ায় সরকারের হস্তক্ষেপ থাকা অনুচিত।’

এক বিজ্ঞপ্তিতে এনসিপি জানিয়েছে, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে নির্বাচন কমিশনের স্বাধীন ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ায় সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে গভীর শঙ্কা তৈরি হয়েছে, যা একটি অবাধ নির্বাচনের ন্যূনতম নিশ্চয়তাও নষ্ট করে।

বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, নির্বাচন কমিশনারের ঘোষিত সময়সূচির পর প্রতিমন্ত্রীর ‘কিছু না জানার’ দাবি এবং তার পরিপ্রেক্ষিতে ইসি সচিবের ‘প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্য শিরোধার্য’ বলে মন্তব্য করা কমিশনের স্বায়ত্তশাসিত অস্তিত্বকে মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন করেছে। সরকারের প্রভাব ও চাপের মুখে কমিশন ঘনঘন বক্তব্য পাল্টাচ্ছে বলে অভিযোগ করে দলটি।

 

এনসিপি নেতাদের দাবি, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করার পরিবর্তে সরকার দলীয়করণের নীতি গ্রহণ করেছে। নির্বাচন কমিশনকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখে নির্বাচন পরিচালনার চেষ্টা অগণতান্ত্রিক মানসিকতারই বহিঃপ্রকাশ।

এনসিপি নেতা আলাউদ্দীন মোহাম্মদ ঢাকা পোস্টকে আরও বলেন, ‘নির্বাচন কমিশন যেভাবে সরকারের কাছে নতিস্বীকার করছে, তাতে মনে হচ্ছে নির্বাচন পরিচালনার ক্ষেত্রেও তারা সরকারের আজ্ঞাবহ হয়ে কাজ করবে। এতে কমিশনের বিশ্বাসযোগ্যতা শূন্যে গিয়ে ঠেকবে। আমরা মনে করি, বর্তমান পরিস্থিতি সামাল দিতে নির্বাচন কমিশনকে ঢেলে সাজানো এবং পূর্ণ স্বাধীনতা দেওয়া জরুরি। প্রয়োজনে আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে সেনাবাহিনী মোতায়েন করে হলেও ভোটের উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করতে হবে।’

 

তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘অতীতে ফ্যাসিবাদের আমলে যেভাবে নির্বাচন পরিচালনা করা হয়েছিল, ইসি যদি এখনও সেই পথ ধরে, তবে বিদ্যমান সংকট কাটবে না, বরং আরও ঘনীভূত হবে। এটি দেশের জন্য তো বটেই, সরকারের জন্যও ভালো কিছু বয়ে আনবে না।’

 

 

এদিকে, গত ১৭ সেপ্টেম্বর রাজধানীর নির্বাচন ভবনে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও দপ্তরের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠকে বসে ইসি। আগামী ১২ নভেম্বর থেকে সাত ধাপে ইউপি নির্বাচন শুরু করার প্রাথমিক পরিকল্পনা থাকলেও এই বৈঠকে ভোটের চূড়ান্ত তারিখ নির্ধারণ করা সম্ভব হয়নি।

এইচএসসি পরীক্ষা, পবিত্র রমজান মাস এবং নির্বাচনের সামগ্রিক প্রস্তুতি সমন্বয় করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে আরও কিছুদিন সময় লাগবে বলে জানিয়েছে ইসি। বৈঠক শেষে নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ সাংবাদিকদের বলেন, আগামী বছরের ৬ জুন এইচএসসি পরীক্ষা শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। আজকের সভায় সবাই একমত হয়েছেন যে, পরীক্ষার আগেই নির্বাচনপ্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে। তবে ভোট কবে শুরু হবে, তা এখনও চূড়ান্ত হয়নি।

 

 

আগের ঘোষিত সম্ভাব্য সময়সূচি থেকে ইসি পিছিয়ে যাচ্ছে কি না— এমন প্রশ্নের জবাবে মো. সানাউল্লাহ বলেন, ‘মোটেও না। আগের সময়সূচিটি কেবল প্রাক-প্রস্তুতির ভিত্তিতে তৈরি করা হয়েছিল এবং তখনই বলা হয়েছিল যে ১৭ সেপ্টেম্বরের বৈঠকের পর এটি চূড়ান্ত করা হবে। আমরা পূর্বনির্ধারিত অবস্থান থেকে সামান্যতম সরে আসিনি।’

‘আজকের বৈঠকে প্রাপ্ত উপাত্ত বিশ্লেষণ করেই দ্রুততম সময়ে সময়সূচি চূড়ান্ত করা হবে’— জানান তিনি।

 

 

উত্তরা /এএম 

Read more — রাজনীতি
Home