
চট্টগ্রামের হাটহাজারীতে ফায়ারিং অনুশীলনের সময় মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় নিহত বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সদস্য (গানার) তাসনিম রিফাতের দাফন সম্পন্ন হয়েছে। আজ বৃহস্পতিবার দুপুরে রাজশাহীর পবা উপজেলার দামকুড়া ইউনিয়নের বিন্দারামপুর গ্রামের পারিবারিক কবরস্থানে সামরিক ও সামাজিক মর্যাদায় তাকে দাফন করা হয়।
এর আগে, সকালে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একটি বিশেষ হেলিকপ্টারে তাসনিম রিফাতের মরদেহ রাজশাহী সেনানিবাসে আনা হয়। পরে সেখান থেকে সড়কপথে মরদেহ নেওয়া হয় তার গ্রামের বাড়ি বিন্দারামপুরে। মরদেহ বাড়িতে পৌঁছালে স্বজন ও গ্রামবাসীর মধ্যে নেমে আসে শোকের ছায়া। কান্নায় ভেঙে পড়েন পরিবারের সদস্যরা। শেষবারের মতো প্রিয় মানুষটিকে দেখতে বাড়িতে ছুটে আসেন আশপাশের গ্রামের মানুষও।
বাদ যোহর সেনাবাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে তাসনিম রিফাতের জানাজার নামাজ অনুষ্ঠিত হয়। এতে পরিবারের সদস্য, স্বজন ও হাজারো গ্রামবাসী অংশ নেন। জানাজা শেষে সামরিক মর্যাদায় পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।
মৃত্যুকালে তাসনিম রিফাতের বয়স হয়েছিল ২৮ বছর। তিন ভাই ও এক বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন মেজ। প্রায় ১২ বছর ধরে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে কর্মরত ছিলেন। মৃত্যুকালে স্ত্রী ও আড়াই বছর বয়সী একটি কন্যাসন্তান রেখে গেছেন তিনি।
তিন বছর আগে ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে মা মারা যান। এবার কর্মক্ষম ছেলেকে হারিয়ে নির্বাক হয়ে পড়েছেন বাবা আসাদুল ইসলাম। ছেলের শোকে ভেঙে পড়া বাবা বলেন, ‘আমার তিন ছেলে ও এক মেয়ে। এখন আর চাওয়ার কিছু নেই, ছেলের জন্য সবার কাছে শুধু দোয়া চাই।’
পরিবারের সদস্যরা জানান, কর্মস্থলের ঝুঁকি নিয়ে তাসনিম রিফাত প্রায়ই তাদের সঙ্গে কথা বলতেন। ফায়ারিং অনুশীলন নিয়েও তার মধ্যে উদ্বেগ ছিল। পরিবারের কাছে নিজের আশঙ্কার কথা জানিয়ে তিনি বলতেন, ‘আমার সঙ্গে এমন কিছু হলে হয়তো আমার অস্তিত্বও থাকবে না।’
তাসনিমের ছোট ভাই শামসাদ আহমেদ বলেন, এর আগেও একই ট্যাংকে একই ধরনের দুর্ঘটনায় দুজন নিহত হওয়ার কথা তার ভাই জানিয়েছিলেন। দুর্ঘটনার আগের দিনও তাসনিম ওই ট্যাংকে ফায়ারিং করেছিলেন। পরদিন সেখানে বিস্ফোরণে দুজন নিহত হন বলে তিনি পরিবারকে জানিয়েছিলেন। আগের ঘটনাটি গোপন রাখা হয়েছিল বলেও তাসনিম জানিয়েছিলেন বলে দাবি করেন শামসাদ।
তিনি বলেন, এসব ঘটনায় তার ভাইয়ের মধ্যে সবসময় ভয় কাজ করত। এমনকি চাকরি নিয়েও তিনি ভীত ছিলেন এবং একাধিকবার চাকরি করতে না চাওয়ার কথা পরিবারের সদস্যদের জানিয়েছিলেন।
জানা যায়, বুধবার দুপুরে চট্টগ্রামের হাটহাজারী ফিল্ড ফায়ারিং রেঞ্জে ট্যাংক ফায়ারিং অনুশীলনের সময় আকস্মিক দুর্ঘটনায় তাসনিম রিফাতসহ দুই সেনাসদস্য নিহত হন। এ ঘটনায় একজন কর্মকর্তা গুরুতর আহত হয়েছেন বলে আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) জানিয়েছে।
দুর্ঘটনার খবর পাওয়ার পর থেকেই বিন্দারামপুরের বাড়িটিতে চলে শোকের মাতম। একমাত্র উপার্জনক্ষম ছেলেকে হারিয়ে বাবা নির্বাক, স্বামীকে হারিয়ে স্ত্রী শোকাহত আর আড়াই বছরের ছোট্ট মেয়েটি হারিয়েছে তার বাবাকে। শেষ পর্যন্ত বৃহস্পতিবার দুপুরে মরদেহ বাড়িতে পৌঁছালেও প্রিয় মানুষটি আর জীবিত হয়ে ফিরলেন না।
প্রায় এক যুগের সেনাজীবনের পর তাসনিম রিফাতের শেষ ঠিকানা এখন বিন্দারামপুরের পারিবারিক কবরস্থান। স্বজনদের কান্না আর গ্রামবাসীর ভালোবাসায় সেখানেই শেষ বিদায় জানানো হলো দেশের জন্য দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে প্রাণ হারানো এই সেনাসদস্যকে।

