
‘আমার সঙ্গে এমন কিছু হলে হয়তো আমার অস্তিত্বও থাকবে না।’ কর্মস্থলের ঝুঁকি নিয়ে পরিবারের সদস্যদের কাছে এমন আশঙ্কার কথা প্রায়ই বলতেন তাসনিম রিফায়াত। চাকরি নিয়েও ভয়ের কথা জানিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু সেই আশঙ্কাই যেন শেষ পর্যন্ত সত্যি হলো। চট্টগ্রামের হাটহাজারী ফিল্ড ফায়ারিং রেঞ্জে ট্যাংক থেকে গোলাবর্ষণের সময় দুর্ঘটনায় প্রাণ গেল বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর এই সদস্যের।
বুধবার দুপুরে মৃত্যুর খবর তার রাজশাহীর পবা উপজেলার দামকুড়া ইউনিয়নের বিন্দারামপুর গ্রামের বাড়িতে পৌঁছালে নেমে আসে শোকের ছায়া। কান্নায় ভেঙে পড়েন পরিবারের সদস্য ও স্বজনরা। একমাত্র উপার্জনক্ষম ছেলেকে হারিয়ে বাবা আসাদুল হক যেন বাকরুদ্ধ। বাড়ির উঠানে স্বজনদের আহাজারি আর প্রতিবেশীদের ভিড়ে ভারী হয়ে ওঠে পরিবেশ।
তাসনিম রিফায়াত তিন ভাই ও এক বোনের মধ্যে মেজ। প্রায় ১২ বছর ধরে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে কর্মরত ছিলেন তিনি। তার রয়েছে আড়াই বছর বয়সী একটি কন্যাসন্তান। বাবার মৃত্যুর অর্থ বোঝার বয়সও হয়নি ছোট্ট মেয়েটির। অথচ বাবাকে হারিয়ে এখন তাকেই বড় হতে হবে বাবার স্মৃতি বুকে নিয়ে।
ছেলের মৃত্যুর খবর পাওয়ার পর বাবা আসাদুল হক বলেন, ‘আমার তিন ছেলে ও এক মেয়ে। এখন আর চাওয়ার কিছু নেই, ছেলের জন্য সবার কাছে শুধু দোয়া চাই।’
পরিবারের সদস্যরা জানান, তাসনিম কর্মস্থলের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে পরিবারের সঙ্গে নিয়মিত কথা বলতেন। ভিডিওকলের মাধ্যমে কর্মস্থলের পরিবেশও দেখাতেন। বিশেষ করে ফায়ারিং অনুশীলনের ঝুঁকি নিয়ে তার মধ্যে উদ্বেগ ছিল।
তাসনিমের ছোট ভাই শামসাদ আহমেদ বলেন, এর আগেও একই ট্যাংকে একই ধরনের দুর্ঘটনায় দুজন নিহত হয়েছিলেন বলে তাসনিম জানিয়েছিলেন। ঘটনার আগের দিনও ওই ট্যাংকে ফায়ারিং করেছিলেন তিনি। পরদিন সেখানে বিস্ফোরণে দুজন নিহত হন বলে পরিবারকে জানিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু আগের ঘটনাটি গোপন রাখা হয়েছিল বলেও জানিয়েছিলেন তাসনিম।
শামসাদ বলেন, এসব ঘটনায় তার ভাইয়ের মধ্যে সবসময় ভয় কাজ করত। চাকরি নিয়েও তিনি ভীত ছিলেন এবং একাধিকবার চাকরি করতে না চাওয়ার কথা জানিয়েছিলেন। পরিবারের সদস্যদের তিনি প্রায়ই নিজের আশঙ্কার কথা বলতেন।
প্রায় এক যুগের সেনাজীবনে নানা দায়িত্ব পালন করা তাসনিমের জীবনের শেষ অধ্যায়টি লেখা হলো একটি ফিল্ড ফায়ারিং রেঞ্জে। পরিবারের কাছে এখন সবচেয়ে বড় অপেক্ষা—কখন ফিরবে তাদের প্রিয় মানুষটির মরদেহ।
পরিবার সূত্রে জানা গেছে, বুধবার রাত ৯টায় চট্টগ্রাম সেনানিবাসে তাসনিম রিফায়াতের প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এরপর মরদেহ ঢাকায় নেওয়া হয়। প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা শেষে আজ সকাল ৯টার দিকে মরদেহ গ্রামের বাড়িতে পৌঁছানোর কথা ছিল। কিন্তু কাগজপত্রের জটিলতায় দেরি হয়। দুপুর ১টায় হেলিকপ্টারে করে রাজশাহীতে নিজ বাড়িতে পৌঁছে মরদেহ। সেখানে জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হবে।
এর আগে বুধবার আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) জানায়, চট্টগ্রামের হাটহাজারী ফিল্ড ফায়ারিং রেঞ্জে ফিল্ড ফায়ারিং অনুশীলনের সময় একটি ট্যাংক থেকে গোলাবর্ষণের সময় আকস্মিক দুর্ঘটনায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর দুই সদস্য নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় একজন কর্মকর্তা গুরুতর আহত হয়েছেন।

