
বগুড়ায় প্রতিষ্ঠিত দেশের প্রথম সিরামিক ইন্ডাস্ট্রিজ তাজমা স্থায়ীভাবে বন্ধ করে দিয়েছে কর্তৃপক্ষ। নানা প্রতিকূলতার মুখে এর আগেও বেশ কয়েকবার বন্ধ করা হয় এ কারখানাটি। শহরের কলোনি এলাকায় সাড়ে ১১ বিঘা জমির ওপর কারখানাটি প্রায় ৬৭ বছর আগে ১৯৫৯ সালে উৎপাদন শুরু করে কাপ, পিরিচ, প্লেটের পাশাপাশি খেলনাসহ নানা ধরনের সিরামিক সামগ্রী। মাত্র ৬০ হাজার টাকা পুঁজি নিয়ে ‘তাজমা সিরামিক ইন্ডাস্ট্রিজ’ চালু করেন ব্যবসায়ী আবদুল জোব্বার।
প্রতিষ্ঠানটির বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শরিফুজ্জামান এসব তথ্য দিয়ে জানায় তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের বগুড়ায় এ সিরামিক ইন্ডাস্ট্রিজ প্রতিষ্ঠায় কারিগরি সহায়তা দেয় জাপান। ইংল্যান্ডের একটি প্রতিষ্ঠান ‘গুড লাইফ নেইল’ স্পেনে অনুষ্ঠিত অলিম্পিকের লোগো দিয়ে বেশ কিছু সিরামিক সামগ্রী তৈরি করে নেয় ১৯৯২ সালে। প্রতিদিন সাড়ে ৪ মেট্রিক টন সিরামিক সামগ্রী তৈরি করা হতো এ সিরামিক কারখানায়। পণ্য যেতে বন্দরনগরী চট্টগ্রাম ও রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায়।
মো. শরিফুজ্জামান জানান, চট্টগ্রাম থেকে রেলপথে ফার্নেশ ওয়েল বগুড়ায় এনে এ কারখানাটি চালু রাখা হয় প্রতিষ্ঠার প্রায় ২০ বছর। পন্যের মান উন্নত করার পাশাপাশি গ্যাসভিত্তিক করতে তাজমা সিরামিক ইন্ডাস্ট্রিজ ১৯৮১ সালে ঢাকা বা তার আশপাশের এলাকায় স্থানান্তরের উদ্যোগ নেয় কর্তৃপক্ষ। মরহুম রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান জানতে পেরে নিজে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলাপ করে কারখানাটি বগুড়ায় রাখতে বলেন। আর প্রতিষ্ঠানের ওপর আর্থিক চাপ কমাতে ১২ টাকা লিটারের ফার্নেস ওয়েলে ভতুর্কি দেন সাড়ে ৬টাকা।
উত্তরাঞ্চলে প্রাকৃতিক গ্যাস আসার পর ২০০৯ সালে গ্যাসসংযোগ পায় তাজমা সিরামিক তখন পণ্যের মান যেমন ভালো হতে শুরু করে তেমনি জ্বালানি খাতে ব্যয় কমে। ২০২৩ সালে ১৩ টাকার গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি করার পর রাতারাতি জ্বালানি ব্যয় বাড়ে প্রায় ২০ লাখ টাকা। এ অবস্থায় প্রায় দেড় বছর আগে অস্থায়ীভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয় কারখানাটি।
নতুনভাবে এ কারখানাটি চালু করতে কী প্রয়োজন এ প্রশ্নের জবাবে ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শরিফুজ্জামান বলেন, ‘প্রথমেই স্থানান্তরিত করতে হবে কারখানাটি তারপর প্রয়োজন নিরবচ্ছিন গ্যাস আর সঙ্গে চলতি মূলধন। আর নতুন যন্ত্রপাতি দিয়ে উৎপাদনে যাওয়া সম্ভব হলে পণ্যের মান যেমন ভালো হবে তেমন প্রতিযোগিতায় টিকতে তেমন কষ্ট হবে না কারণ বগুড়ায় শ্রমিকের মজুরি তুলনামূলক কম।’
মো. শরিফুজ্জামান জানান, প্রতিষ্ঠার পর বেশ কয়েক বছর তাজমান সিরামিক ইন্ডাস্ট্রিজ চলেছে ফার্নেস ওয়েলের ওপর আর তখন প্রতিদিন লাগত ৭ হাজার ৫শ লিটার ফার্নেস ওয়েল আর এ জন্য প্রতিদিন ব্যয় হতো প্রায় ৪৮ হাজার ৭৫৯ টাকা অর্থ্যাৎ মাসে জ্বালানিতে ব্যয় হতো প্রায় সাড়ে ১৪ লাখ টাকা। গ্যাস সংযোগ নেওয়ার পর এ খাতে ব্যয় কিছুটা বেড়ে ১৯ লাখ টাকা হয় কিন্তু তাতে তেমন ক্ষতি হতো না কারণ গ্যাসে পোড়া পণ্যের মান ভালো হওয়ায় চাহিদা ছিল বাজারে। কিন্তু ২০২৩ সালে গ্যাসর দাম বৃদ্ধি হওয়ায় জালানি খাতে ব্যয় ২০ লাখ টাকা বৃদ্ধি পেয়ে প্রতি মাসে ৪০ লাখ টাকা হলে আর্থিক সংকটে পড়ে তাজমা সিরামিক ইন্ডাস্ট্রিজ আর এ সংকটের মুখে দেড় বছর আগে সাময়িকভাবে বন্ধ করা হয় কারখানাটি। কয়েক দিন আগে তাজমা সিরামিক ইন্ডাস্ট্রিজ স্থায়ীভাবে বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নেয় কর্তৃপক্ষ।
তাজমা সিরামিক ইন্ডাস্ট্রিজে একসময় বিভিন্ন শাখায় কাজ করতেন অন্তত ২৫০ নারী-পুরুষ। তাদের একজন সেফালী খাতুন। প্রায় ১০ বছর আগে এ কারখানায় কাজ শুরু করেন তিনি। স্বামীর দৃষ্টিশক্তি স্বাভাবিক নয়, তাই সংসারের পুরো দায়িত্ব এখন তার ওপর। বন্ধ কারখানায় মাঝে মাঝে আসেন তিনি। পরিষ্কার-পরিছন্নতার কিছু কাজ করেন সেফালী খাতুন। কেমন আছেন এ প্রশ্নের জবাবে সেফালী খাতুন বলেন, ‘এক ছেলে আর ৪ মেয়ে সঙ্গে আমরা দুজন বন্ধ কারখানার খণ্ডকালীন একজন নারী শ্রমিক হিসেবে আর কেমন থাকব বুঝতেই পারছেন।’ তার বিষণ্নতাই বলে দেয় আর্থিক কষ্টে আছেন সেফালী খাতুন। কথা বলতে গিয়ে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েন সেফালী খাতুন। চোখের কোণে জমে লোনা পানি। একসময় চোখ মুছতে হয় তাকে।
মো. আমিনুল ইসলাম, টেকনিক্যাল শাখায় কাজ করছেন ১৯ বছর। তিনিও মাঝে মাঝে আসনে কারখানায়। কেন আসতে হয় কারখানায় এ প্রশ্নের জবাবে আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘মেশিনপত্রগুলো অলস পড়ে আছে। যত্ন না নিলে নষ্ট হয়ে যাবে। তাই আসতে হয়। অলস পড়ে থাকা মেশিনগুলো পরিষ্কার করতে হয়।’
কারখানাটি বন্ধ হয়ে যাওয়ার নানা ধরনের সমস্যার কথা জানাতে গিয়ে মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘যখন মিলটি চালু ছিল তখন ব্যক্তিগত ও পারিবারিক সমস্যাগুলো কর্তৃপক্ষকে জানালে সমাধান হতো। কিন্তু এখন নিজেদের কোনো সমস্যার কথা বলতে লজ্জা লাগে। কারণ তারাই তো সমস্যায় আছেন।’
ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শরিফুজ্জামান বলেন, ‘কারখানাটি নতুনভাবে চালু করা সম্ভব হলে জনবল একই থাকবে কিন্তু আগে দক্ষ জনবলের যে সংকট ছিল তা আর না থাকায় কারখানাটি চালু রাখা সহজ হবে।’

