
ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় পুলিশ লাইন্সে উচ্চশব্দে গান বাজানোকে কেন্দ্র করে শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশের চড়াও হওয়ার ঘটনা সংসদে ভুলভাবে উপস্থাপনের অভিযোগ তুলে হাসনাত আবদুল্লাহর তীব্র সমালোচনা করেছেন মুফতি রহমতুল্লাহ কাসেমী।
শুক্রবার (২৮ আগস্ট) ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিজয়নগর উপজেলার জামিয়া রশিদিয়া ছতরপুর মাদরাসার অধ্যক্ষ মুফতি রহমতুল্লাহ কাসেমী তার ফেসবুক স্ট্যাটাসে হাসনাত আবদুল্লাহর ওপর ক্ষোভ ঝাড়েন।
ফেসবুক পোস্টে তিনি লেখেন, ‘ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় পুলিশ লাইনে কনসার্টে লাউডস্পিকারে গান বাজানো হলো। পুলিশ লাইনের সাথেই হেফাজতের মহাসচিব আল্লামা সাজিদুর রহমান হাফি. প্রতিষ্ঠিত জামিয়া দারুল আরকামের ছাত্রদের পড়ায় ব্যাঘাত হচ্ছিল। অভিযোগ করলে এসপি সাহেব লাউডস্পিকার বন্ধ করতে নির্দেশ দেন। লাউডস্পিকার বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং ছাত্ররা তাদের ক্যাম্পাসে ফিরে আসে।’
‘কিছুক্ষণ পর এসপি সাহেব ডিআইজি সাহেবকে এগিয়ে দিতে গেলে কিছু উগ্র পুলিশ সদস্য আবার জোর আওয়াজে গান বাজনা চালাতে থাকে। তখন ছাত্ররা ক্ষিপ্ত হয়ে আবার বাধা দিতে গেলে কিছু পুলিশ ছাত্রদের ওপর চড়াও হয় এবং তাদের বেধড়ক পিটিয়ে আহত করে। পরবর্তীতে এসপি সাহেব এসে পরিস্থিতি শান্ত করে এবং মাদ্রাসায় উপস্থিত হয়ে ক্ষমা চান ও এবং অপরাধী পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণসহ ছাত্রদের সকল দাবি মেনে নেন।’
রহমতুল্লাহ কাসেমী আরও লেখেন, ‘বিষয়টি নিষ্পত্তি হয় যায়। অথচ হাসনাত আবদুল্লাহ আজ সংসদে সে বিষয়টি উপস্থাপন করে ছাত্রদের অভিযুক্ত করে বক্তব্য দেন। ছাত্র আন্দোলন থেকে উঠে আসা এ তরুণ তাদের সহযোদ্ধা ছাত্রদের বিরুদ্ধে নির্লজ্জ অভিযোগ করতে দেখে পুরো জাতি বিস্মিত ও হতবাক। আগে দেখতাম বিরোধীদল সবসময় মাজলুমের পক্ষে অবস্থান নেয়। এ প্রথম দেখলাম বিরোধী দলের এমপি মাজলুমদের অভিযুক্ত করতে!’
‘সিনেমা, গান বাজনার পক্ষ নিতে গিয়ে মাদ্রাসার ছাত্র এবং আলেমদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে শাহবাগী সাজার জন্য জুলাই বিপ্লবে মাদ্রাসার ছাত্ররা তোমাদের সাথে মাঠে নামেননি। জুলাই বিপ্লবের চেতনার সাথে গাদ্দারি করে পার পাবে না। মনে রাখবে, ম্যাচ ফিক্সিং এর অপরাধে বহু ক্যাপ্টেন চিরতরে নিষিদ্ধ হতে পারে।’
মুফতি লেখেন, ‘এই পচা মালগুলো মস্তিষ্কে এবং কালচারালি এখনো আওয়ামী স্বৈরাচারকেই রিপ্রেজেন্ট করে শুধু খোলস পাল্টিয়ে মানুষকে ধোকা দিচ্ছে সময় আসলে আবার ঠিকই আওয়ামী লীগ হয়ে যাবে চান্দু তোমরা আবার বাউনবাইরা আহো।’
সংসদে কী বলেছিলেন হাসনাত আব্দুল্লাহ?
গত বৃহস্পতিবার (২৭ আগন্ট) জাতীয় সংসদে প্রশ্নোত্তর পর্বে এনসিপির সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় প্রতিমাসে গড়ে হত্যাকাণ্ড হয়েছে ২৬০টি আর বর্তমান সরকারের সময় হত্যা হয়েছে ৩১১টি। সে সময় ৬ মাসে খুন হয়েছে ১ হাজার ৭৮০ জন আর বর্তমান সরকারের সময় ৬ মাসে খুন হয়েছে ১ হাজার ৭৮৯ জন।
তিনি আরও বলেন, নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে বিগত সরকারের ৬ মাসে ১ হাজার ৯০টি আর বর্তমান সরকারের সময় ঘটেছে ১১ হাজার ১৬৫টি। বিগত সরকারের সময় ৬ মাসে গণপিটুনিতে নিহত হয় ১৬৬ জন আর বর্তমান সরকারের ৬ মাসে গণপিটুনিতে নিহত হয় ১২০ জন। পুলিশের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে ২৭৫টি যেখানে এই সরকারের সময় ঘটে ৩১৭টি।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার প্রসঙ্গ টেনে হাসনাত বলেন, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় কনসার্ট বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে, নৌকাবাইচ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। যেখানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছিলেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া একটি কালচারাল জেলা সেখানে গান-বাজনা, সিনেমা বন্ধের মতোই।
সবশেষ হাসনাত বলেন, এই ৬ মাস বর্তমান সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ল অ্যান্ড অর্ডার রিস্টোর করতে পেরেছেন কি না বা তিনি এই ৬ মাসে আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে কোনো ভূমিকা রাখতে পেরেছেন কি না বা এই ৬ মাসে ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছেন কি না।
হাসনাতের এই প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘এটা প্রশ্ন, না পল্টনের বক্তৃতা বুঝতে পারিনি।’
তিনি বলেন, ‘আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নে ছয় মাসে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সফল হয়েছেন কি না, এটা একটা প্রশ্ন। তারপর ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলায় সিনেমা হল কেন নেই, সেটা আরেকটা প্রশ্ন।’
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যে সংসদে হট্টগোল
হাসনাতের বক্তব্যে উল্লেখ করা হত্যা ও আহতের পরিসংখ্যান নিয়েও প্রশ্ন তোলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘কত হত্যা হয়েছে, জখম হয়েছে ইত্যাদি যে ডাটা দিলেন, সেই ডাটাটা কীসের ভিত্তিতে দিলেন, কী পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে দিলেন, সেই স্ট্যাটিস্টিকটা আমি জানি না।’
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে কি না, তা দৃশ্যমান।’ বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর দেশে যেসব অপরাধ সংঘটিত হয়েছে, সেগুলোর অপরাধীদের ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে গ্রেফতার করে আইনের আওতায় আনা হয়েছে।
সংসদে দেওয়া বক্তব্য প্রত্যাহার করলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
তিনি বলেন, ‘সামাজিকভাবে যেকোনো স্পেসিফিক ঘটনা যদি আপনারা বলতে পারেন, সে স্পেসিফিক ঘটনা আমি ৩০০ বিধিতে বিবৃতি দিতে পারবো।’
এদিকে, জাতীয় সংসদে হাসনাত আবদুল্লাহর দেওয়া বক্তব্যের প্রতিবাদে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় বিক্ষোভ মিছিল করেছে কওমি ছাত্র ঐক্য পরিষদ। শুক্রবার (২৮ আগস্ট) রাত পৌনে ১২টার দিকে শহরের জামিয়া ইউনিসিয়া মাদরাসা থেকে একটি বিক্ষোভ মিছিল বের হয়।
সমাবেশে বক্তারা সংসদে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সম্প্রতি বিভিন্ন ঘটনা নিয়ে হাসনাত আবদুল্লাহর বক্তব্যের সমালোচনা করেন। এসময় বিক্ষোভকারীরা তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন স্লোগান দেন ও বক্তব্যের জন্য তাকে ক্ষমা চাওয়ার আহ্বান জানান।
বক্তারা বলেন, হাসনাত আবদুল্লাহকে তার বক্তব্যের বিষয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়াবাসীর কাছে ক্ষমা চাইতে হবে। একই সঙ্গে তারা শনিবার (২৯ আগস্ট) ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় এনসিপির কোনো কর্মসূচি হতে না দেওয়ার ঘোষণাও দেন।

