
সংসদীয় গণতন্ত্রে ফেরার পর ১৯৯১ সালে বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো সংসদ সদস্যদের ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। তবে শুরু থেকেই এ নির্বাচন নিয়ে তৈরি হয়েছিল বিতর্ক। ভোটের দিন সংসদ কক্ষে প্রকাশ্যে ভোটগ্রহণের প্রতিবাদে আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতা ‘শেইম, শেইম’ স্লোগান দিয়ে আপত্তি জানিয়েছিলেন।
১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থানে এরশাদ সরকারের পতনের পর ১৯৯১ সালে দেশে সংসদীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়। ওই বছরের জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি সবচেয়ে বেশি আসন পেয়ে সরকার গঠন করে। আওয়ামী লীগ যায় বিরোধী দলে।
সংসদীয় ব্যবস্থায় ফেরার পর রাষ্ট্রপতিকে সংসদ সদস্যদের ভোটে নির্বাচনের বিধান চালু করা হয়। এ জন্য ১৯৯১ সালের আগস্টে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আইন এবং সেপ্টেম্বরে নির্বাচন বিধিমালা প্রণয়ন করা হয়।
ওই আইন ও বিধিমালা তৈরির প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তৎকালীন নির্বাচন কর্মকর্তা মিহির সারওয়ার মোর্শেদ। পরবর্তীতে তিনিই ১৯৯১ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে পোলিং অফিসারের দায়িত্ব পালন করেন।
১৯৯১ সালের ৮ অক্টোবর রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ভোট অনুষ্ঠিত হয় জাতীয় সংসদের অধিবেশন কক্ষে। তখন প্রধান নির্বাচন কমিশনার ছিলেন বিচারপতি আব্দুর রউফ।
পরদিন ৯ অক্টোবরের দৈনিক সংবাদের প্রতিবেদনে বলা হয়, সংসদ কক্ষে স্পিকারের বড় চেয়ার সরিয়ে সেখানে একটি ছোট চেয়ার বসানো হয়েছিল। ওই চেয়ারে বসেছিলেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার। ঠিক বেলা ২টায় ভোটগ্রহণ শুরু হয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, বেলা ২টা ৩ মিনিটে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার ভোট দেয়ার মধ্য দিয়ে ভোটগ্রহণ শুরু হয়। এরপর বিএনপির প্রার্থী আব্দুর রহমান বিশ্বাস, স্পিকার, ডেপুটি স্পিকারসহ দলটির সংসদ সদস্যরা ভোট দেন।
নির্বাচনে সংসদ কক্ষে চারটি ভোটকেন্দ্র বা বুথ স্থাপন করা হয়েছিল। পোলিং অফিসার মিহির সারওয়ার মোর্শেদ দায়িত্ব পালন করেছিলেন খুলনা ও বরিশাল বিভাগের জন্য।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, ওই দুই বিভাগের পোলিং এজেন্ট ছিলেন বিএনপির ব্যারিস্টার নাজমুল হুদা এবং আওয়ামী লীগের তোফায়েল আহমেদ। সংসদ সদস্যরা ভোট দিতে এলে তাদের সামনেই ভোট প্রদান করতেন।
ভোটদানের সময় বিভিন্ন বিষয়ে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির দুই পোলিং এজেন্টই নোট রাখতেন বলে জানান তিনি।
১৯৯১ সালের ওই রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোটগ্রহণের পদ্ধতি নিয়েই সবচেয়ে বেশি বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। কারণ সাধারণ নির্বাচনে গোপন ব্যালটে ভোট হলেও রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে সংসদ সদস্যদের ভোট ছিল প্রকাশ্য।
মিহির সারওয়ার মোর্শেদের বর্ণনা অনুযায়ী, ভোটগ্রহণ শুরুর কিছুক্ষণ পর আওয়ামী লীগের প্রায় ২০ থেকে ২৫ জন সংসদ সদস্য সংসদ কক্ষে ঢুকে ভোটগ্রহণের প্রতিবাদ করেন।
দৈনিক সংবাদের প্রতিবেদনে বলা হয়, বেলা সোয়া দুইটার দিকে মোহাম্মদ নাসিমসহ আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্যরা সংসদ কক্ষে প্রবেশ করে ভোটগ্রহণ নিয়ে আপত্তি জানান।
মোর্শেদ বলেন, মতিয়া চৌধুরী, মোহাম্মদ নাসিমসহ আওয়ামী লীগের নেতারা প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে স্পিকারের আসনে বসে থাকতে দেখে ‘শেইম, শেইম’ বলে প্রতিবাদ করেন। প্রকাশ্যে ভোট নেয়ার কারণে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের আইন কলুষিত হচ্ছে—এমন অভিযোগও তারা করেছিলেন বলে জানান তিনি।
১৯৯১ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রার্থী ছিলেন দুজন। বিএনপির পক্ষ থেকে প্রার্থী করা হয় আব্দুর রহমান বিশ্বাসকে। তার প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন সাবেক প্রধান বিচারপতি বদরুল হায়দার চৌধুরী, যিনি আওয়ামী লীগের সমর্থিত প্রার্থী ছিলেন।
সেবার ভোটার ছিলেন সংরক্ষিত নারী আসনের সদস্যসহ মোট ৩৩০ জন সংসদ সদস্য। তবে ভোট দেন ২৬৪ জন। ভোটদানে বিরত ছিলেন ৬৬ জন।
ভোট গণনা শেষে বিএনপির আব্দুর রহমান বিশ্বাস ১৭২ ভোট পেয়ে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। তার প্রতিদ্বন্দ্বী বদরুল হায়দার চৌধুরী পান ৯২ ভোট।
মিহির সারওয়ার মোর্শেদ জানান, ওই সংসদে হাফিজ উদ্দিন আহমদ ও নুরুল ইসলাম মনি স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য ছিলেন। তারাও ভোটকেন্দ্রে গিয়ে তাদের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দেন এবং বিষয়টি নির্বাচন কর্মকর্তা ও পোলিং এজেন্টরা দেখতে পেয়েছিলেন।
দৈনিক সংবাদের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছিল, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে আব্দুর রহমান বিশ্বাস ওই দুই স্বতন্ত্র সংসদ সদস্যের ভোটও পেয়েছিলেন।
১৯৯১ সালের ওই নির্বাচনের পর গত ৩৫ বছরে আরও আটবার রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। তবে প্রতিবারই একক প্রার্থী থাকায় ভোটগ্রহণের প্রয়োজন হয়নি।
ফলে সংসদ সদস্যদের সরাসরি ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের যে প্রক্রিয়া ১৯৯১ সালে প্রথম চালু হয়েছিল, দীর্ঘ সময় পর আবারও সেই প্রক্রিয়ায় ভোটের মুখোমুখি হচ্ছে দেশ।
এবারের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বিরোধী দলও অংশ নেয়ার ঘোষণা দিয়েছে। জামায়াত-এনসিপি জোটের পক্ষ থেকে এলডিপি চেয়ারম্যান অলি আহমদের নাম প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। অন্যদিকে বিএনপির পক্ষ থেকে মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করা হলেও দলটির প্রার্থীর নাম এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়নি।
ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী, ১৩ আগস্ট মনোনয়নপত্র জমা, ১৬ আগস্ট মনোনয়নপত্র বাছাই এবং ১৮ আগস্ট প্রত্যাহারের শেষ সময়। ভোট হবে ২০ আগস্ট জাতীয় সংসদের অধিবেশন কক্ষে।
ির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, ২০ আগস্ট দুপুর ২টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত ভোটগ্রহণ চলবে। এরপর সংসদ কক্ষেই ভোট গণনা করে সেখান থেকে প্রাথমিক ফল ঘোষণা করা হবে।
এবার ভোটার তালিকায় রয়েছেন ৩৪৯ জন। এর মধ্যে সংরক্ষিত নারী আসনের ৫০ জন সংসদ সদস্য রয়েছেন। চট্টগ্রাম-৪ আসনের প্রার্থিতা আদালতের আদেশে বাতিল হয়েছে।
ইসি সচিব আখতার আহমেদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, সংসদ সদস্যরা নিজ নিজ আসনে বসেই ভোট দেবেন। তাদের কাছে ব্যালট পেপার পৌঁছে দেয়া হবে। সেখানে প্রার্থীর নামের পাশে ভোটারের পূর্ণ স্বাক্ষর ও বিভক্তি সংখ্যা লিখে ব্যালট বাক্সে জমা দিতে হবে।
নির্বাচন পরিচালনায় প্রধান নির্বাচন কর্মকর্তাকে সহায়তা করতে নির্বাচন কমিশনের ২০ জন সহায়ক কর্মকর্তা থাকবেন। পাশাপাশি সংসদ সচিবালয়ের প্রয়োজনীয় সংখ্যক কর্মকর্তাও দায়িত্ব পালন করবেন।
চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি জানিয়েছেন, রাষ্ট্রপতি, সংসদ নেতা, বিরোধীদলীয় নেতা ও স্পিকারের ভোট দেয়ার দৃশ্য সরাসরি সম্প্রচারের সুযোগ থাকবে। ভোট শেষে গণনা, ফলাফল প্রস্তুত এবং ফল ঘোষণা পর্যন্ত কার্যক্রমও সরাসরি সম্প্রচার করা যাবে।
অর্থাৎ ১৯৯১ সালে যে সংসদ কক্ষে, সংসদ সদস্যদের ভোটে এবং প্রকাশ্য ভোটদানের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের যাত্রা শুরু হয়েছিল, ৩৫ বছর পর আবারও সেই সংসদ কক্ষেই ফিরছে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ভোট।
উত্তরা/এএম

