
রাজশাহী শহরে এখন অটোরিকশায় ওঠার আগে গন্তব্যের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে ভাড়ার হিসাব। কয়েকদিন আগেও যে দূরত্বে পাঁচ টাকা দিলেই চলত, সেখানে এখন গুনতে হচ্ছে ১০ টাকা। কোনো সরকারি ঘোষণা বা সিটি করপোরেশনের সিদ্ধান্ত ছাড়াই নগরজুড়ে কার্যত চালু হয়েছে নতুন ভাড়া। এতে যাত্রী ও চালকদের মধ্যে প্রতিদিনই তৈরি হচ্ছে উত্তেজনা, তর্ক-বিতর্ক এমনকি বাকবিতণ্ডাও। বাড়তি ব্যয়ের চাপের কথা বলছেন চালকেরা, আর যাত্রীরা বলছেন এটি এক ধরনের স্বেচ্ছাচারিতা। সব মিলিয়ে অটোরিকশা ভাড়া নিয়ে নতুন অস্থিরতার মুখে পড়েছে রাজশাহী নগরী। সরেজমিনে দেখা গেছে, সোমবার থেকে নগরীর বহু রুটে চালকেরা নিজেদের উদ্যোগেই সর্বনিম্ন ভাড়া ৫ টাকা থেকে ১০ টাকা এবং ১৫ টাকার ভাড়া ২০ টাকা আদায় শুরু করেছেন। অথচ এ বিষয়ে রাজশাহী সিটি করপোরেশনের কোনো সিদ্ধান্ত নেই। ফলে নগরজুড়ে তৈরি হয়েছে বিভ্রান্তি, ক্ষোভ ও অস্বস্তি। জানা যায়, রাজশাহীতে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার ভাড়া নির্ধারণ করে রাজশাহী সিটি করপোরেশন। তবে চালকদের দাবি, বর্তমান বাজার পরিস্থিতিতে পুরোনো ভাড়ায় আর চলা সম্ভব নয়। প্রায় চার বছর আগে, ২০২২ সালের আগস্টে সর্বনিম্ন ভাড়া ১০ টাকা করার দাবিতে ধর্মঘটও করেছিলেন তাঁরা। তখন বিকল্প পরিবহন হিসেবে টাউন সার্ভিস বাস চালু করা হলেও শেষ পর্যন্ত ভাড়া বাড়ানো হয়নি। এবার কোনো আনুষ্ঠানিক আন্দোলন ছাড়াই নগরের রাস্তায় কার্যত নতুন ভাড়া চালু হয়ে গেছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি পোস্টকে কেন্দ্র করে বিষয়টি আরও জোরালো হয়। সেখানে অটোরিকশার মূল্য ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় বৃদ্ধির নানা হিসাব তুলে ধরা হয়েছে। দাবি করা হয়েছে, কয়েক বছরে গাড়ির দাম ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা থেকে বেড়ে ২ লাখ ৮০ হাজার টাকায় পৌঁছেছে। একইভাবে ব্যাটারি, টায়ার, চার্জার, ব্রেক শু ও অন্যান্য যন্ত্রাংশের দামও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। তবে এসব তথ্যের সবকিছু বাস্তবতার সঙ্গে মেলে না বলে জানিয়েছেন অটোরিকশা ব্যবসায়ীরা। নগরীর অন্যতম অটোরিকশা বিক্রয় প্রতিষ্ঠান নাহার অটোর ব্যবস্থাপক কাজী মো. তুহিন বলেন, বর্তমানে একটি নতুন অটোরিকশার দাম ২ লাখ ৬০ থেকে ২ লাখ ৬৫ হাজার টাকার মধ্যে। তবে ব্যাটারি, টায়ার ও খুচরা যন্ত্রাংশের দাম যে বেড়েছে, সেটি সত্য। তিনি বলেন, পাঁচ টাকার সর্বনিম্ন ভাড়া বর্তমান বাজার বাস্তবতায় অযৌক্তিক হয়ে পড়েছে। কিন্তু ভাড়া বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্ব চালকদের নয়, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের। অন্যদিকে যাত্রীরা বলছেন, খরচ বাড়ার যুক্তি থাকলেও নিয়মের বাইরে গিয়ে ভাড়া আদায় কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। নগরীর শাহমখদুম এলাকার স্কুলশিক্ষক শারমিন সুলতানা প্রতিদিন কর্মস্থলে যেতে তিনবার অটোরিকশা বদল করেন। আগে যেখানে তার যাতায়াত ব্যয় ছিল ১৫ টাকা, এখন একই পথে দিতে হচ্ছে ৩০ টাকা। তিনি বলেন, একদিনে খরচ দ্বিগুণ হয়ে গেছে। যদি ভাড়া বাড়ানোর প্রয়োজন হয়, তাহলে সিটি করপোরেশন সিদ্ধান্ত নেবে। চালকেরা নিজেরাই ভাড়া নির্ধারণ করতে পারেন না। নগরীর আরও অনেক যাত্রীর অভিযোগ, ভাড়া বাড়ানোর বিষয়ে কোনো সরকারি ঘোষণা না থাকলেও অধিকাংশ চালক জোরপূর্বক নতুন ভাড়া আদায় করছেন। এতে প্রতিদিনের যাতায়াত ব্যয় হঠাৎ করেই বেড়ে গেছে। তবে চালকদের দৃষ্টিভঙ্গিও ভিন্ন। তাঁদের দাবি, জীবনযাত্রার ব্যয় যেমন বেড়েছে, তেমনি বেড়েছে অটোরিকশা পরিচালনার খরচও। আয় ও ব্যয়ের ভারসাম্য রক্ষা করতে গিয়ে তাঁরা চাপে পড়েছেন। বিনোদপুর এলাকার রিকশাচালক শফিকুল ইসলাম বলেন, শহরে এখন প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশি অটোরিকশা চলছে। ফলে যাত্রী ভাগ হয়ে যাওয়ায় আগের মতো আয় হয় না। এর ওপর যন্ত্রাংশ ও ব্যাটারির দাম বেড়ে যাওয়ায় সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। এদিকে, এরই মধ্যে ভাড়া বৃদ্ধির বিষয়ে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করেছে রাজশাহী সিটি করপোরেশন। বৃহস্পতিবার এক গণবিজ্ঞপ্তিতে তারা জানায়, অটোরিকশার ভাড়া বৃদ্ধি কিংবা নতুন করে কোনো ভাড়া নির্ধারণ করেনি রাসিক। বিজ্ঞপ্তিতে নগরবাসীকে নির্ধারিত ভাড়ার অতিরিক্ত অর্থ প্রদান না করার আহ্বান জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে চালকদের অতিরিক্ত ভাড়া আদায় থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। শুধু বিজ্ঞপ্তি দিয়েই থেমে থাকেনি সিটি করপোরেশন। বিষয়টি তদারকিতে রাজস্ব বিভাগের কর্মকর্তারা ইতোমধ্যে মাঠে নেমেছেন। বৃহস্পতিবার নগরীর বর্ণালী, লক্ষ্মীপুর মোড়সহ বিভিন্ন এলাকায় চালক ও যাত্রীদের সঙ্গে কথা বলে তাঁদের অবহিত করা হয়েছে যে, অটোরিকশার ভাড়া বৃদ্ধির কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। এ সময় রাসিকের প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা আবু সালেহ মো. নূর-ঈ-সাঈদ, রাজস্ব কর্মকর্তা সারোয়ার হোসেন খোকনসহ উপ-যানবাহন শাখার অন্যান্য কর্মকর্তা-কর্মচারীবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।

