
ঈদের দিন প্রেক্ষাগৃহে ‘রইদ’ উঠেছে। মেজবাউর রহমান সুমনের এ ছবির প্রধান অভিনেতা মোস্তাফিজুর নূর ইমরান। তার কাছ থেকে ‘রইদ’-এর কিছুটা আঁচ নিলেন কামরুল ইসলাম
‘রইদ’ নিয়ে নির্মাতা-শিল্পী থেকে শুরু করে দর্শক-অনেকেই কথা বলছেন। কিন্তু আপনাকে একটু নীরব মনে হচ্ছে…
আমি তো সবসময় এরকমই।
আচ্ছা। তাহলে ‘রইদ’-এ প্রবেশ করি। প্রেক্ষাগৃহে তো উঠল, সে রইদের আলো আপনার জীবনে কতখানি পড়ছে? মানে একদম ব্যক্তিগত পর্যায়ে আপনি কেমন প্রতিক্রিয়া পাচ্ছেন?
খুবই দারুণ। আমার সেই পুরনো বন্ধুরা, যাদের সঙ্গে হয়তো স্কুলের পরে পরে দেখাই হয়নি, তারাও অনেকে ফোন করছে, টেক্সট করছে। অনেকে দেখেছে, অনেকে দেখবে, শুভকামনা জানাচ্ছে। যাদের সঙ্গে এত বছর ধরে কাজ করছি, যাদের পথ অনুসরণ করছি, ওনাদের ভালোবাসাটা এখন এখনো যে পাচ্ছি এবং ছবি দেখে ওনারা যেভাবে আশীর্বাদ দিচ্ছেন, এটা খুবই উপভোগ করছি। আমার আব্বাও এসে দেখে গেলেন ছবিটা; উনার খুব ভালো লেগেছে। তো, ‘রইদ’-এর এ ওমটা খুব উপভোগ করছি।
আপনার বাবা ‘রইদ’ দেখার পর কী বললেন? বড় পর্দায় সন্তানের এমন অভিনয় দেখে তার অভিব্যক্তি কেমন ছিল?
এই চরিত্রে (সাদু) আব্বার অনেক ক্যারেক্টারিস্টিককে ব্লেন্ড করেছিলাম আমি। যেমন এর আগে ‘আলফা’র সময় আমার মায়ের কিছু চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ব্লেন্ড করেছিলাম। তো আব্বা এই দৃশ্যকাব্যটা রিলেট করতে পেরেছেন। কিছু দৃশ্যের সময় আব্বা প্রচণ্ড ইমোশনাল হয়ে পড়েছিলেন। বারবার বলছিলেন, ‘কী কষ্ট! কী কষ্ট!’ এ হাহাকারটা ফিল করেছেন উনি। ছবি দেখা শেষে বের হওয়ার সময় লিফটে উনি রীতিমতো কাঁপছিলেন! প্রথমে ভাবলাম, শরীর খারাপ করল কিনা। পরে বুঝলাম, উনি খুবই ইমোশনাল হয়ে গিয়েছিলেন। আব্বার এই প্রতিক্রিয়া আমার জন্য অনেক বড় একটা পাওয়া। আর উনি তো ‘লাইলি মজনু’, ‘ইউসুফ জুলেখা’, ‘রূপবান’ এসব দেখেছেন; রূপকথার বিষয়টা বোঝেন। এখন অনেকে বলছেন, ‘রইদ’ বুঝতে পারছেন না। এর একটাই কারণ, আগে যে পরিমাণ ফোকের চর্চা ছিল, সেটার কাছাকাছিও এখন আর অবশিষ্ট নেই। সবকিছু গোলেমালে হট্টগোলের মধ্যে ঢুকে গেছে!
‘রইদ’ না বোঝা নিয়ে অনেক কথা হচ্ছে। অনেকেই নাকি বুঝতে পারছেন না। তাদের জন্য একটা সহজ টোটকা দিন…
মন দিয়ে দেখো, মন দিয়ে শোনো, মন দিয়ে বোঝো। এই ছবি হলে বসে পাশে লোকের সঙ্গে গপ্প করতে করতে দেখলে হবে না। পপকর্ন খেতে খেতে দেখলে হবে না; পপকর্ন খাওয়ার একটা শব্দ হয়, সেটা ছবির শব্দেও প্রভাব ফেলে। একটা চলচ্চিত্র তো শুধু দৃশ্যে নয়, শব্দ, সংগীত, পারফরমেন্স অনেক কিছু মিলে হয়। আর সবকিছুকে শুধু একটা গল্পের স্ট্রাকচারেই বাঁধতে হবে, তা তো নয়; অনুভূতির স্ট্রাকচারেও বাঁধতে হয়। ‘রইদ’ সেই ছবি, যেটা অনুভূতির স্ট্রাকচারে বাঁধা, আবেগ ও ঘোরের স্ট্রাকচারে বাঁধা। আসলে সবকিছু বুঝে ওঠার মতো মনন এখনো আমাদের দর্শকের তৈরি হয়নি। দীর্ঘ ৩০-৩২ বছর ধরে লোকচর্চার যে অভাব, তাতে আমাদের শিক্ষা, সংস্কৃতির অনেক কিছুই তো নষ্ট হয়ে গেছে। তবে, ‘রইদ’-এর মধ্য দিয়ে একটা ট্রেন্ড সেট হলো, যেটা আগামীতে অন্যরা ফলো করবে।
সবকিছুকে শুধু একটা গল্পের স্ট্রাকচারেই বাঁধতে হবে, তা তো নয়; অনুভূতির স্ট্রাকচারেও বাঁধতে হয়। ‘রইদ’ সেই ছবি, যেটা অনুভূতির স্ট্রাকচারে বাঁধা, আবেগ ও ঘোরের স্ট্রাকচারে বাঁধা।
ছবিতে আপনি ‘সাদু’ চরিত্রে অভিনয় করেছেন। এই সাধুর সঙ্গে আপনার প্রথম পরিচয় কবে?
২০২২ সালের দিকে চরকির অ্যান্থলজি ছবি ‘এই মুহূর্তে’র একটা পর্ব ‘কোথায় পালাবে বলো রূপবান’ বানিয়েছিলেন সুমন ভাই, সেটাতে আমিও অভিনয় করেছিলাম। ওই সময়ই তিনি আমাকে সাদুর কথা জানান। তবে স্বভাবগত কারণেই তিনি পুরোটা বলতেন না, একটু একটু করে জানাতেন। এভাবে ধীরে ধীরে আলাপ হলো, সাদুর সঙ্গে পরিচয় হলো।
সাদু হয়ে উঠলেন কিভাবে? নেপথ্যের জার্নিটা জানতে চাচ্ছি…
যাপন থেকে। যেখানে শুটিং করেছি, সেখানে দীর্ঘদিন ধরে থাকা, ওই মানুষগুলোর সঙ্গে মিশে যাওয়া, প্রকৃতির সঙ্গে মিশে যাওয়া, ওই ঘর, উঠান, বারান্দা, ওই নদীর ঘাট, নৌকা, ওই গরু, ছাগলগুলোর সঙ্গে মিশে যাওয়া; সবকিছুর সঙ্গে একটা অভ্যস্ততা গড়ে ওঠা। এভাবেই আসলে সাদু হয়ে উঠেছিলাম। সাধু সারাক্ষণ পাথরের উপর দিয়ে খালি পায়ে হাঁটে, শুরুতে একটু কষ্ট হতো, স্বাচ্ছন্দ্য পেতাম না। কিন্তু আস্তে আস্তে অভ্যস্ত হয়ে গেলাম। কী যে অসাধারণ মুহূর্তগুলো আমরা কাটিয়েছি সেখানে, সেটা কোনো দিন শব্দে প্রকাশ করতে পারব না। আমার আত্মার মধ্যে গেঁথে গেছে। ওই যে আকাশটা প্রতিদিন একেক সময়ে একক রঙের হয়ে যেত, সেটা কিভাবে বুঝিয়ে বলব! যখন গরু নিয়ে যাচ্ছি, মনে হতো ওদের সঙ্গে আমার আত্মার সম্পর্ক হয়ে গেছে, ওরা আমার কথা শুনছে। গরুগুলোকে গোসল করিয়ে যখন আমি ওই মাঠে শুয়ে থাকতাম, এক অপরিসীম আনন্দে আমার বুকটা ভরে যেত। মনে হতো, আমি স্বর্গে আছি; এটাই বোধহয় স্বর্গ। অসাধারণ এই সফর বোধহয় যে কোনো অভিনেতার জীবনেই বিরল। আমি খুব ভাগ্যবান, এরকম একটা সফর করতে পেরেছি।
আপনার কথা শুনে মনে হচ্ছে, ‘রইদ’ থেকে যদি আর বাড়তি কিছু নাও পেতেন, তবুও প্রাপ্তি কম নয়…
হ্যাঁ। হ্যাঁ। একদম তাই। আমি জানি না, এরকম মুহূর্ত আর কোনো দিন তৈরি হবে কিনা।
শুটিংয়ের ওই জায়গায় পরবর্তীতে অনেক অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটেছে। জায়গাটির সৌন্দর্য নাকি আর আগের মতো নেই। তো, সেখানে আরেকবার গিয়ে দেখে আসা বা মানুষগুলোর সঙ্গে কথা বলার ইচ্ছে জাগে?
খুব ইচ্ছা ছিল। মানুষগুলোর সঙ্গে এখনো আমার মাঝে মাঝে কথা হয়। ফোনে ভালোবাসা ভালোবাসা জানায়। তারা এখনো আমাকে সাধু হিসেবেই বিশ্বাস করে। তাদের ওই ভালোবাসা অবশ্যই পেতে চাই। কিন্তু সেখানে গেলে প্রচণ্ড মন খারাপ হবে, ওই প্রকৃতিটা বোধহয় আর দেখতে পাবো না। সেজন্য এক ধরনের দ্বিধা কাজ করে।
‘রইদ’-এ আপনার সহশিল্পী নাজিফা তুষি। তিনিও বিপুল প্রশংসা পাচ্ছেন। ‘সাদু’ যদি ‘সাদুর বউ’কে বর্ণনা করে, কী বলবে?
আই বিলিভ, নাজিফা তুষি এই ছবির প্রাণ। পুরো ছবিটা আসলে সাধুর বউ মানে, পাগলীর উপরই। এত ভালো, এত সুন্দর, এত অসাধারণ সে! আগেও আমি বলেছি, তুষি আমাদের ইন্ডাস্ট্রির ব্রাইটেস্ট স্টার। আগে যেমন অভিনেত্রীরা ববিতা-শাবনূরের মতো হতে চাইত, সামনে এমন সময় আসবে, যখন সবাই তুষির মতো হতে চাইবে। অনেকদিন পর এত ভালো একজন অ্যাক্টরের সঙ্গে কাজ করলাম। অসাধারণ এক্সপেরিয়েন্স। ‘রইদ’ যেমনভাবে করতে চেয়েছি, পেরেছি; এর সম্পূর্ণ কৃতিত্ব আমি সুমন ভাই আর তুষিকে দিতে চাই।
নির্মাতা মেজবাউর রহমান সুমনকে নিয়ে আপনার দৃষ্টিভঙ্গি কেমন?
মেজবাউর রহমান ইজ দ্য ফাইনেস্ট ফিল্মমেকার অব আওয়ার কান্ট্রি। অ্যান্ড আই বিলিভ, যদি বিশ্বের মধ্যে আমার প্রিয় নির্মাতাদের তালিকা করতে হয়, সেখানে উচ্চতম পর্যায়ে ওনার নাম থাকবে। উনি এত অ্যাডভান্সড ফিল্মমেকার, উনি যেভাবে চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন, সেটাকে অন্য আট-দশটা ছবির স্ট্রাকচারে বাঁধা যায় না। আমার বিশ্বাস, একটা সময় তার চলচ্চিত্র নিয়ে গবেষণা হবে। এখন যেমন আমরা আলমগীর কবির, জহির রায়হান, ঋত্বিক ঘটক কিংবা সত্যজিৎ রায়ের কথা বলি, একদিন সুমন ভাইয়ের কথাও বলবে মানুষ।
মেজবাউর রহমান ইজ দ্য ফাইনেস্ট ফিল্মমেকার অব আওয়ার কান্ট্রি। অ্যান্ড আই বিলিভ, যদি বিশ্বের মধ্যে আমার প্রিয় নির্মাতাদের তালিকা করতে হয়, সেখানে উচ্চতম পর্যায়ে ওনার নাম থাকবে।
ঈদের আর কোনো ছবি দেখেছেন?
এখনো সুযোগ হয়নি। ঈদের দিন থেকে তো আসলে ‘রইদ’ নিয়েই ব্যস্ত। তবে খুব শিগগিরই অন্য ছবিগুলো দেখব।
অভিনয়ে নতুন কিছু করছেন?
কয়েকটা ছবি তো আছে, সেগুলো করব। আবার কিছু ছবির কাজ সম্পন্ন করে রেখেছি। কিন্তু ওই যে, বলা বারণ! মজার ব্যাপার, রিলিজের চেয়ে আমার আনরিলিজড কাজের সংখ্যা বেশি!
পরিচালনাও তো শুরু করলেন। সে ভূমিকায় নতুন কী করছেন?
ইতোমধ্যে একটা ওয়েব ছবির একটা লটের শুটিং সেরেছি। শিগরির বাকি শুটিং করব। কাজ শেষে বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে যোগাযোগ করব। যদি কোনো প্ল্যাটফর্ম ভিউ বাণিজ্যের বাইরে গিয়ে একটা কোয়ালিটি কনটেন্ট দেখাতে চান, তাহলে এটা দর্শকের কাছে পৌঁছে যাবে।
অভিনেতার সবচেয়ে বড় ক্রাইসিস হলো অপেক্ষা, একটা ভালো কাজের অপেক্ষা। এই যে ‘রইদ’ একটা দীর্ঘ সময়ের অপেক্ষার পর এলো। এরকম আবার কবে আসবে, জানি না। অর্থাৎ অভিনয়ের সফরটা একদমই আমার হাতে নেই।
শেষ প্রশ্ন। অভিনেতা হিসেবে তো সুনাম আছে। পরিচালনা কেন? মানে নির্মাণ আপনার কাছে জরুরি হয়ে উঠল কেন?
অভিনেতার সবচেয়ে বড় ক্রাইসিস হলো অপেক্ষা, একটা ভালো কাজের অপেক্ষা। এই যে ‘রইদ’ একটা দীর্ঘ সময়ের অপেক্ষার পর এলো। এরকম আবার কবে আসবে, জানি না। অর্থাৎ অভিনয়ের সফরটা একদমই আমার হাতে নেই। আর পরিচালনা আমার হাতে আছে, বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে থাকতেই মঞ্চনাটকে ডিরেকশন দিতাম। আর মনের ভেতরে গল্প বলারও একটা ক্ষুধা আছে। সেই তাড়না থেকেই পরিচালনায় আসা।

