উত্তরা প্রতিদিন
ঢাকা

বরেন্দ্র জাদুঘরের ১৭ হাজার নিদর্শনের ১৬ হাজারই গুদামবন্দি

উত্তরা ডেস্ক ১৮ মে ২০২৬, ০৮:৪৫ অপরাহ্ণ
বরেন্দ্র জাদুঘরের ১৭ হাজার নিদর্শনের ১৬ হাজারই গুদামবন্দি

দেশের প্রথম ও শতবর্ষী প্রাচীন সংগ্রহশালা রাজশাহীর বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘর। স্থান সংকটের কারণে এই ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানের ৯৩ শতাংশ প্রত্নসম্পদই এখন দর্শনার্থীদের চোখের আড়ালে। প্রায় ১৭ হাজার দুর্লভ নিদর্শনের এই জাদুঘরে প্রদর্শনের জায়গা হচ্ছে মাত্র হাজারখানিকের। বাকি বিপুল পরিমাণ ঐতিহাসিক সম্পদ বছরের পর বছর ধরে গুদামঘরে তালাবন্দি। এর ওপর প্রতিষ্ঠার পর থেকে এ পর্যন্ত হারিয়ে গেছে ১৮৫টি মূল্যবান প্রত্নসামগ্রীসহ প্রায় তিন হাজার দুর্লভ ঐতিহাসিক বস্তু।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আধুনিক সংরক্ষণাগার, ডিজিটাল আর্কাইভ এবং নিরাপত্তা জোরদার না করলে বাংলার প্রাচীন সভ্যতা ও সংস্কৃতির এই অনন্য ধারক চিরতরে হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে পড়বে।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট

ইতালির পম্পেই, গ্রিসের থিবস এবং মিসরের প্রাচীন শহরগুলোর ধ্বংসাবশেষ দেখে নিজের দেশের ইতিহাস অনুসন্ধানে উদ্বুদ্ধ হন নাটোরের দীঘাপাতিয়ার রাজকুমার শরৎকুমার রায়। দেশে ফিরে অক্ষয় কুমার মৈত্রেয় ও রমাপ্রসাদ চন্দ্রের সহযোগিতায় তিনি ‘বরেন্দ্র অনুসন্ধান সমিতি’ গঠন করেন। তাদের সংগৃহীত পুরাকীর্তি নিয়ে ১৯১০ সালের সেপ্টেম্বরে যাত্রা শুরু করে ‘বরেন্দ্র রিসার্চ মিউজিয়াম’।

অগ্রজ রাজা প্রমদানাথের দেওয়া জমিতে নিজের ৬৩ হাজার টাকা ব্যয়ে গৌড়ের স্থাপত্যশৈলীর অনুকরণে জাদুঘর ভবনটি তৈরি করান শরৎকুমার রায়, যার নকশাও তিনি নিজেই করেছিলেন। পরে ১৯১৩ সালের ১৩ নভেম্বর তৎকালীন বাংলার গভর্নর লর্ড কারমাইকেল আনুষ্ঠানিকভাবে এই জাদুঘরের উদ্বোধন করেন।

১৭ হাজারের মধ্যে প্রদর্শনে মাত্র ১১০০

১৯১০ সালে প্রতিষ্ঠিত এই জাদুঘরটি বর্তমানে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে পরিচালিত হচ্ছে। এখানে পাল, সেন, মৌর্য, মুসলিম ও ব্রিটিশ আমলের অসংখ্য দুর্লভ প্রত্নবস্তু রয়েছে। লাইফ-সাইজ গঙ্গা মূর্তি, অর্ধনারীশ্বর শিব ও সচিত্র অষ্টসাহস্রিকা প্রজ্ঞাপারমিতা পুঁথির মতো বিরল সব সংগ্রহ রয়েছে এখানে।

জাদুঘর সূত্র জানায়, সংগ্রহশালাটিতে প্রায় ৬ হাজার হাতে লেখা বাংলা ও সংস্কৃত পাণ্ডুলিপি, সাড়ে ৬ হাজারের বেশি প্রাচীন মুদ্রা, ১ হাজার ৩০০ পোড়ামাটির নিদর্শন, ১ হাজারের বেশি ধাতব প্রত্নবস্তু এবং পাল-সেন আমলের ২ হাজারের বেশি ভাস্কর্য রয়েছে। কিন্তু ১৭ হাজারের বেশি এ বিশাল ভাণ্ডারের বিপরীতে গ্যালারি কক্ষ মাত্র ১১টি। ফলে মাত্র এক হাজার ১০০ থেকে এক হাজার ২০০টি নিদর্শন দর্শনার্থীদের জন্য প্রদর্শন করা সম্ভব হচ্ছে। বাকি বিপুল পরিমাণ প্রত্নসম্পদ বছরের পর বছর ধরে গুদামে পড়ে আছে।

জাদুঘরের উপ-সংরক্ষণ কর্মকর্তা মো. আসলাম রেজা বলেন, জাদুঘরের ভেতরে প্রত্নসম্পদ রাখার মতো পর্যাপ্ত জায়গা নেই। বাধ্য হয়ে নিদর্শনগুলো বারান্দায় এবং গুদাম ঘরে রাখা হয়েছে। আরও গ্যালারি নির্মাণ করা জরুরি।

গায়েব ৩ হাজার দুর্লভ বস্তু

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রকাশিত জাদুঘরের পূর্ণাঙ্গ ইনভেন্টরি (তালিকাভুক্তি) প্রতিবেদন থেকে এক চাঞ্চল্যকর তথ্য মিলেছে। প্রতিষ্ঠার পর থেকে এ পর্যন্ত জাদুঘর থেকে হারিয়ে গেছে ১৮৫টি নিবন্ধিত প্রত্নসামগ্রীসহ ২ হাজার ৯৭২টি দুর্লভ বস্তু।

‘জাদুঘরে নিয়মিত নতুন নিদর্শন যুক্ত হচ্ছে। জায়গা সংকটের কারণে সবকিছু প্রদর্শন করা সম্ভব হচ্ছে না। ভবিষ্যতে অবকাঠামো সম্প্রসারণ করা গেলে আরও বেশি নিদর্শন দর্শনার্থীদের সামনে তুলে ধরা যাবে। এছাড়াও লোকবল সংকট জাদুঘরের অন্যতম একটি প্রধান সমস্যা’—বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘরের পরিচালক অধ্যাপক ড. কাজী মো. মোস্তাফিজুর রহমান

হারিয়ে যাওয়া প্রত্নসামগ্রীর মধ্যে রয়েছে ২টি ব্রোঞ্জ, ২টি কপার, ২টি লিনেন, ১টি ব্রাশ, ২টি সিলভার ও ১টি ক্রিস্টালের তৈরি বস্তু। এ ছাড়া ৪৭টি বিভিন্ন ধরনের পাথর, ১০১টি টেরাকোটা, ১৩টি কাগজ এবং ২টি প্রাণীর চামড়া নিখোঁজ। পাঁচ হাজার ৯৭১টি নিবন্ধিত প্রাচীন মুদ্রার মধ্যে ৩৩টি এবং ১৩ হাজার ৯৩৩টি দুর্লভ গ্রন্থের মধ্যে ৮৫টি বই আর পাওয়া যাচ্ছে না। এমনকি ১৩ হাজার ৫৭৬টি ঐতিহাসিক প্রকাশনা, জার্নাল ও পুস্তিকার মধ্যে তিন হাজার ৫২টির কোনো হদিস নেই।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (রাকসু) ভিপি মোস্তাকুর রহমান জাহিদ এই বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘর শুধু আমাদের এ জনপদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ নয়, এটি গোটা ভারতবর্ষের ইতিহাসের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ঐতিহাসিক এ জাদুঘরের এত বড় অঙ্কের প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন গুদামে তালাবন্দি থাকা এবং হারিয়ে যাওয়া অত্যন্ত দুঃখজনক ও হতাশাজনক।

খোলা আকাশের নিচে অরক্ষিত পাণ্ডুলিপি

সরেজমিনে দেখা গেছে, গ্যালারির ঠিক সামনে খোলা আকাশের নিচে রোদ-বৃষ্টিতে অরক্ষিত অবস্থায় পড়ে রয়েছে বেশ কিছু প্রাচীন প্রত্নসম্পদ। মূল কমপ্লেক্সের ভেতরে পাহারা থাকলেও লোকবলের অভাবে বাইরের খোলা জায়গাটি অরক্ষিত। আধুনিক সিসিটিভি নজরদারি কিংবা পর্যাপ্ত নিরাপত্তার অভাব রয়েছে। আনসার সদস্যদের দিয়ে নামমাত্র পাহারা চললেও দর্শনার্থীরা অনায়াসে নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে ছবি তুলছেন। অন্যদিকে, ডিজিটাল আর্কাইভ না থাকায় ৬ হাজার মূল্যবান প্রাচীন পাণ্ডুলিপি চরম ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।

‘এত বড় একটি ঐতিহ্যবাহী জাদুঘরে আধুনিক সুযোগ-সুবিধা আরও বাড়ানো দরকার। ভিড়ের সময় গ্যালারিতে চলাচল করাও কঠিন হয়ে পড়ে।’

জাদুঘরের সাবেক সংরক্ষণ কর্মকর্তা ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেপুটি রেজিস্ট্রার সফিকুল ইসলাম গণমাধ্যমকে বলেন, ‘আধুনিক সংরক্ষণাগার, ডিজিটাল তালিকাভুক্তি, সিসিটিভি নিরাপত্তা ও নতুন গ্যালারি নির্মাণ ছাড়া এত বড় সংগ্রহ দীর্ঘমেয়াদে সুরক্ষিত রাখা কঠিন হবে। তার মতে, দেশের প্রাচীন ইতিহাস ও ঐতিহ্য রক্ষায় বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘরকে ঘিরে দ্রুত কার্যকর পরিকল্পনা নেওয়া জরুরি।’

ভোগান্তিতে দর্শনার্থীরা

দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে প্রতিদিন দর্শনার্থীরা বরেন্দ্র জাদুঘরে আসেন। বিশেষ করে ইতিহাস ও প্রত্নতত্ত্ব বিষয়ে আগ্রহী শিক্ষার্থীদের কাছে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাকেন্দ্র। তবে দর্শনার্থীদের অভিযোগ, গ্যালারি ছোট হওয়ায় ছুটির দিনে অতিরিক্ত ভিড় তৈরি হয়। অনেক নিদর্শনও সঠিকভাবে উপস্থাপন করা হয়নি। পর্যাপ্ত বসার ব্যবস্থা ও দিকনির্দেশনার অভাবেও ভোগান্তিতে পড়তে হয় দর্শনার্থীদের।

ইতিহাসের সন্ধান করতে নগরীর আলুপট্টি এলাকা থেকে জাদুঘরে ঘুরতে আসা শ্রেয়া সাহা নামের এক দর্শনার্থী গণমাধ্যমকে বলেন, ‘জাদুঘরটিতে অনেক গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন আছে। কিন্তু আরও সুন্দরভাবে উপস্থাপন করা গেলে দর্শনার্থীরা ইতিহাস সম্পর্কে ভালোভাবে জানতে পারতেন।’

 

নওগাঁ থেকে বরেন্দ্র জাদুঘর দেখতে এসেছেন সপ্তম শ্রেণীর শিক্ষার্থী সুদৃশ্য পাল কর্ণ। তিনি  বলেন, ‘খুবই আনন্দিত আমাদের বাঙালির ঐতিহ্যের পুরাতন নিদর্শন দেখে। এখানে এসে অনেককিছু দেখার সুযোগ হলো। তবে জাদুঘরে জায়গা সংকট ফলে অনেক নিদর্শন বাহিরে পড়ে আছে। এভাবে থাকলে হয়তো অবহেলায় নষ্ট হয়ে যেতে পারে।’

নাটোর থেকে আসা ইবনূর নামে আরেক দর্শনার্থী বলেন, ‘এত বড় একটি ঐতিহ্যবাহী জাদুঘরে আধুনিক সুযোগ-সুবিধা আরও বাড়ানো দরকার। ভিড়ের সময় গ্যালারিতে চলাচল করাও কঠিন হয়ে পড়ে।’

কর্তৃপক্ষের বক্তব্য

বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘরের পরিচালক ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের অধ্যাপক ড. কাজী মো. মোস্তাফিজুর রহমান গণমাধ্যমকে বলেন, জাদুঘরের উন্নয়নে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। সম্প্রতি প্রত্নসম্পদ সংরক্ষণ বিষয়ে প্রশিক্ষণ কর্মসূচিও আয়োজন করা হয়েছে। এছাড়া বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে সমঝোতার মাধ্যমে গবেষণা ও সংরক্ষণ কার্যক্রম আরও সম্প্রসারণের চেষ্টা চলছে।

তিনি বলেন, জাদুঘরে নিয়মিত নতুন নিদর্শন যুক্ত হচ্ছে। জায়গা সংকটের কারণে সবকিছু প্রদর্শন করা সম্ভব হচ্ছে না। ভবিষ্যতে অবকাঠামো সম্প্রসারণ করা গেলে আরও বেশি নিদর্শন দর্শনার্থীদের সামনে তুলে ধরা যাবে। এছাড়াও লোকবল সংকট জাদুঘরের অন্যতম একটি প্রধান সমস্যা বলে জানান তিনি।

এ বিষয়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. ফরিদুল ইসলাম  বলেন, ‘বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘর দেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও প্রত্নসম্পদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সংগ্রহশালা। দীর্ঘদিন ধরে এটি গবেষণা, শিক্ষা ও সংস্কৃতি চর্চায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আসছে। বর্তমানে জায়গা ও অবকাঠামোগত কিছু সীমাবদ্ধতা থাকলেও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন জাদুঘরের আধুনিকায়ন, নতুন গ্যালারি সম্প্রসারণ, ডিজিটাল সংরক্ষণ এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থা উন্নয়নে কাজ করছে। ভবিষ্যতে আরও বেশি প্রত্নসম্পদ দর্শনার্থীদের সামনে উপস্থাপন এবং গবেষণার সুযোগ সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানান তিনি।’

 

Read more — উত্তরাঞ্চল
Home