উত্তরা প্রতিদিন
ঢাকা

তিন দশক ধরে উচ্চশিক্ষায় আলোকবর্তিকা আইআইইউসি

উত্তরা ডেস্ক ১৫ মে ২০২৬, ০৮:২৮ অপরাহ্ণ
তিন দশক ধরে উচ্চশিক্ষায় আলোকবর্তিকা আইআইইউসি

‘গুণগত মানের সঙ্গে নৈতিকতার সমন্বয়’— এই মূলমন্ত্রকে সামনে রেখে ১৯৯৫ সালে যাত্রা শুরু করে আন্তর্জাতিক ইসলামিক ইউনিভার্সিটি চট্টগ্রাম (আইআইইউসি)। প্রায় তিন দশক ধরে দেশের উচ্চশিক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলা এই বিশ্ববিদ্যালয়টি চট্টগ্রাম শহরের কুমিরায় ৬০ একর প্রাকৃতিক মনোরম পরিবেশে অবস্থিত। নিজস্ব স্বাতন্ত্র্য ও ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে আইআইইউসির কুমিরা ক্যাম্পাসে ছাত্র ও ছাত্রীদের জন্য রয়েছে পৃথক একাডেমিক ভবন, যেখানে সম্পূর্ণ আলাদাভাবে ক্লাস ও পরীক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত হয়।

১৯৯২ সালে প্রতিষ্ঠিত ইসলামিক ইউনিভার্সিটি চট্টগ্রাম ট্রাস্ট (আইইউসিটি)-এর এক মহৎ উদ্যোগ থেকেই এই বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়। মূলত ইসলামভিত্তিক আধুনিক উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেই আইআইইউসির যাত্রা। প্রথমে ‘ইসলামিক ইউনিভার্সিটি চট্টগ্রাম’ নামে শুরু হলেও পরবর্তীতে ২০০০ সালে বিশ্ববিদ্যালয়টির নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় ‘ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক ইউনিভার্সিটি চট্টগ্রাম (আইআইইউসি)’। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন ১৯৯২-এর অধীনে পরিচালিত এই প্রতিষ্ঠানটি বর্তমানে দেশের অন্যতম শীর্ষ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে সুপ্রতিষ্ঠিত।

বিশ্ববিদ্যালয়ে বর্তমানে দেশি শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বিদেশি শিক্ষার্থীরাও অধ্যয়ন করছেন, যা এর আন্তর্জাতিক পরিচিতিকে আরও বিস্তৃত করেছে।

গুণগত মানের সঙ্গে নৈতিকতার সমন্বয়— এই স্লোগানকে সামনে রেখে ১৯৯৫ সালে আন্তর্জাতিক ইসলামিক ইউনিভার্সিটি চট্টগ্রাম (আইআইইউসি) যাত্রা শুরু করে। চট্টগ্রামের কুমিরায় ৬০ একর জায়গায় অবস্থিত বিশ্ববিদ্যালয়টি বিগত তিন দশক ধরে দেশের উচ্চশিক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এখানে ছাত্র ও ছাত্রীদের জন্য পৃথক একাডেমিক ভবনে ক্লাস ও পরীক্ষা কার্যক্রম পরিচালনার মাধ্যমে নিজস্ব স্বাতন্ত্র্য গড়ে তোলা হয়েছে ।

শিক্ষার পরিসর ও সমৃদ্ধি

বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়টিতে প্রায় ১৩ হাজার শিক্ষার্থী এবং ৫০০ জন শিক্ষক রয়েছেন, যার মধ্যে ৩৬৫ জন স্থায়ী শিক্ষক। বিশ্ববিদ্যালয়টি পাঁচটি অনুষদ ভবন, পাঁচটিরও বেশি আধুনিক একাডেমিক ভবন, সাতটি স্থায়ী ও অস্থায়ী লাইব্রেরি, একটি কেন্দ্রীয় মসজিদ এবং দৃষ্টিনন্দন অডিটোরিয়াম নিয়ে এর কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। এছাড়া, শিক্ষার্থীদের সুবিধার্থে আবাসিক হল, মেডিকেল সেন্টার ও স্পোর্টস সেন্টার রয়েছে।

 

বিশ্ববিদ্যালয়ের শরিয়াহ ও ইসলামিক স্টাডিজ অনুষদের অধীনে রয়েছে কুরআনিক সায়েন্সেস অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ, দাওয়াহ অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ এবং হাদিস বিজ্ঞান ও ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ।

বিজ্ঞান ও প্রকৌশল অনুষদে রয়েছে কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ, কম্পিউটার অ্যান্ড কমিউনিকেশন ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ, ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ, ইলেকট্রনিক অ্যান্ড টেলিকমিউনিকেশন ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ, সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ এবং ফার্মেসি বিভাগ।

এছাড়া, ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদের অধীনে রয়েছে ব্যবসায় প্রশাসন বিভাগ ও ফাইন্যান্স বিভাগ। কলা ও মানবিক অনুষদে রয়েছে ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগ, আরবি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগ এবং লাইব্রেরি অ্যান্ড ইনফরমেশন সায়েন্স বিভাগ। আইন অনুষদে পরিচালিত হচ্ছে আইন বিভাগ। পাশাপাশি সমাজবিজ্ঞান অনুষদের অধীনে রয়েছে অর্থনীতি ও ব্যাংকিং বিভাগ। বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্র ও ইনস্টিটিউটগুলোর মধ্যে রয়েছে সেন্টার ফর জেনারেল এডুকেশন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম বর্তমানে স্বাভাবিক ও সুষ্ঠুভাবে পরিচালিত হচ্ছে। তবে, শিক্ষক সংকট দূর করতে দ্রুত সময়ের মধ্যে জ্যেষ্ঠ শিক্ষক নিয়োগ দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। শিক্ষার্থীদের গবেষণামুখী করতে বিশ্ববিদ্যালয় বিভিন্ন ধরনের আর্থিক সহায়তা দিচ্ছে এবং আন্তর্জাতিক জার্নালে গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে

উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ হাসমত আলী ।

এখানে ফলাফলভিত্তিক শিক্ষা বা আউটকাম-বেজড এডুকেশন (ওবিই) পদ্ধতির মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের ধারাবাহিক মূল্যায়ন করা হয়। ক্লাসে উপস্থিতি, অ্যাসাইনমেন্ট, মিডটার্ম ও চূড়ান্ত পরীক্ষা, ল্যাব কার্যক্রম, প্রকল্প, প্রেজেন্টেশন এবং সহশিক্ষা কার্যক্রম— সবকিছুর সমন্বয়ে শিক্ষার্থীদের মূল্যায়ন সম্পন্ন হয়। পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয় আবশ্যিক কোর্স (ইউআরসি) ও নৈতিকতা উন্নয়ন কর্মসূচি (এমডিপি)-এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের নৈতিকতা, সামাজিক মূল্যবোধ ও মানবিক গুণাবলি বিকাশের ওপরও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়।

আইআইইউসি কেবল দেশের গণ্ডিতেই নয়, আন্তর্জাতিক পরিসরেও নিজেদের অবস্থান দৃঢ় করেছে। বিশ্ববিদ্যালয়টি এখন পর্যন্ত শিক্ষা, বিজ্ঞান, নৈতিকতা ও ইসলামী জ্ঞানচর্চা বিষয়ক ১৭টি আন্তর্জাতিক সম্মেলনের সফল আয়োজন করেছে। ওয়েবমেট্রিক্স র‍্যাঙ্কিং অনুযায়ী, বাংলাদেশের ১৪৭টি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে আইআইইউসির অবস্থান ২৩তম। পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) মূল্যায়নেও এটি দেশের শীর্ষ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর একটি হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে।

এছাড়া, ইঞ্জিনিয়ারিং শিক্ষায় মানদণ্ড নির্ধারণকারী প্রতিষ্ঠান বিএইটিই (বোর্ড অব অ্যাক্রেডিটেশন ফর ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনিক্যাল এডুকেশন) কর্তৃক অ্যাক্রেডিটেশন পাওয়া দেশের প্রথম বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবেও প্রতিষ্ঠানটি গৌরবজনক অর্জনের দাবিদার।

শিক্ষার্থীদের বিকাশে বহুমাত্রিক উদ্যোগ

কেবল পাঠ্যবইভিত্তিক শিক্ষার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয় আইআইইউসির কার্যক্রম। শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বগুণ, সাংস্কৃতিক বিকাশ, খেলাধুলা, বিতর্ক, শিক্ষা সফর ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণে নিয়মিত উৎসাহিত দেওয়া হয়। প্রতিটি সেমিস্টারে শিক্ষার্থীদের জন্য ‘স্টুডেন্ট অ্যাডভাইজার’ নিয়োগ করা হয়, যারা তাদের একাডেমিক অগ্রগতি ও ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ার পরিকল্পনায় দিকনির্দেশনা দিয়ে থাকেন।

পতিত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শাসনামলে ২০২১ সালে আওয়ামী লীগ নেতা আবু রেজা নদভী বিশ্ববিদ্যালয়টি দখলে নিয়ে ট্রাস্টি বোর্ড পুনর্গঠন করেন। অভিযোগ রয়েছে, এরপর সম্মানী ও বিভিন্ন খাতের নামে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় ১০০ কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। চব্বিশের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর সেই ট্রাস্টি বোর্ড ভেঙে দেওয়া হয় এবং বিশ্ববিদ্যালয়টির নিয়ন্ত্রণ পুনরায় আগের মালিকপক্ষের হাতে ফিরে আসে ।

ট্রাস্টি বোর্ড দখল ও সংকট উত্তরণ

বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২০২১ সালের ১ মার্চ শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়টি দখলে নিয়ে ট্রাস্টি বোর্ড পুনর্গঠন করেন তৎকালীন আওয়ামী লীগ নেতা আবু রেজা নদভী। এরপর বিভিন্ন খাতে অর্থ লুটপাটের অভিযোগ উঠে ট্রাস্টি বোর্ড চেয়ারম্যান ও সদস্যদের বিরুদ্ধে, যার পরিপ্রেক্ষিতে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) কয়েকটি মামলাও দায়ের করে।

বর্তমান বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের মতে, এই সময়ে সম্মানী ও বিভিন্ন খাতের নামে প্রায় ১০০ কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়। নানা বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পরবর্তীতে ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর আবু রেজা নেজামুদ্দিন নদভীর নেতৃত্বাধীন ট্রাস্টি বোর্ড ভেঙে দেওয়া হয় এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ন্ত্রণ পুনরায় আগের মালিকপক্ষের হাতে ফিরে আসে। সেই সংকট কাটিয়ে বর্তমানে নতুন ট্রাস্টি বোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়টিকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে কাজ করছে।

বিশ্ববিদ্যালয়কে এগিয়ে নিতে বদ্ধপরিকর প্রশাসন

বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ হাসমত আলী বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম বর্তমানে স্বাভাবিক ও সুষ্ঠুভাবে পরিচালিত হচ্ছে। তবে, শিক্ষক সংকট দূর করতে দ্রুত সময়ের মধ্যে জ্যেষ্ঠ শিক্ষক নিয়োগ দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। শিক্ষার্থীদের গবেষণামুখী করতে বিশ্ববিদ্যালয় বিভিন্ন ধরনের আর্থিক সহায়তা দিচ্ছে এবং আন্তর্জাতিক জার্নালে গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়টিতে শিক্ষক সংকট রয়েছে, যা দ্রুত দূর করার চেষ্টা চলছে। শিক্ষার্থীদের গবেষণামুখী করতে আর্থিক সহায়তা দিচ্ছে আইআইইউসি প্রশাসন এবং শিক্ষকদের বিদেশে পিএইচডির জন্য এককালীন ফান্ড দেওয়া হচ্ছে। ভবিষ্যতে ফিসারিজ ও জার্নালিজমের মতো নতুন বিভাগ চালু করার পরিকল্পনাও রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রশাসনের ।

তিনি আরও বলেন, নতুন বিভাগ চালুর পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ফিসারিজ, জার্নালিজমসহ আরও কয়েকটি বিষয় চালুর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। যাতায়াত সংকট নিরসনে নতুন বাস সংযোজন এবং শিক্ষার্থীদের জন্য মানসম্মত খাবার ও আধুনিক ল্যাব সুবিধার ব্যবস্থা করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

টিউশন ফি কমানোর বিষয়ে উপ-উপাচার্য বলেন, গত ১০ বছরে বিশ্ববিদ্যালয় টিউশন ফি বাড়ায়নি। সম্প্রতি মাত্র ৭-৮ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে, যা অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনায় অনেক কম। এরপরও বিষয়টি আমাদের বিবেচনায় থাকবে।

এছাড়া, মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সন্তানদের বিনা টিউশন ফিতে পড়ার সুযোগসহ বিভিন্ন ধরনের বৃত্তির ব্যবস্থা রয়েছে বলেও জানান তিনি।

 

Read more — শিক্ষা
Home