উত্তরা প্রতিদিন
ঢাকা

প্রাণহীন চিড়িয়াখানা হচ্ছে ‘বার্ড পার্ক’

রাজশাহী বোটানিক্যাল গার্ডেন
উত্তরা প্রতিবেদক ১৫ মে ২০২৬, ০৫:৩৪ অপরাহ্ণ
প্রাণহীন চিড়িয়াখানা হচ্ছে ‘বার্ড পার্ক’

একসময় যেখানে দর্শনার্থীদের ভিড় জমত বাঘ-সিংহ দেখতে, সেখানে এখন নিস্তব্ধতা ভাঙে কেবল কয়েকটি হরিণের ছুটোছুটি আর কবুতরের ডানার শব্দে। রাজশাহী শহরের ঐতিহ্যবাহী কেন্দ্রীয় উদ্যান ও চিড়িয়াখানা এখন আর আগের সেই চিড়িয়াখানা নেই। নাম পাল্টেছে, রূপ পাল্টেছে, আর ধীরে ধীরে হারিয়ে গেছে প্রাণীগুলোও।

২০২৩ সালে 'রাজশাহী কেন্দ্রীয় উদ্যান ও চিড়িয়াখানা' নাম বদলে রাখা হয় 'রাজশাহী বোটানিক্যাল গার্ডেন'। এবার আবারও নতুন নামের পথে হাঁটছে রাজশাহী সিটি করপোরেশন (রাসিক)। প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন মিললেই এর নতুন নাম হবে 'রাজশাহী বার্ড পার্ক'।

রাসিক জানায়, বর্তমান বাস্তবতায় বড় পরিসরের চিড়িয়াখানা পরিচালনা সম্ভব নয়। তাই সীমিত জায়গা ও কম প্রাণীর বাস্তবতা বিবেচনায় এটিকে পাখির অভয়াশ্রমকেন্দ্রিক পার্কে রূপান্তরের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ব্রিটিশ আমলে বর্তমান উদ্যানের জায়গাটি ছিল ঘোড়দৌঁড়ের মাঠ। পরে দীর্ঘদিন পরিত্যক্ত পড়ে থাকার পর স্বাধীনতার পর এখানে কেন্দ্রীয় উদ্যান ও চিড়িয়াখানা গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়। ১৯৭২ সালে আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হয়। ১৯৭৪ সালে উদ্যানে শুরু হয় বৃক্ষরোপণ, ফুলের কুঞ্জ, লেক-পুকুর খনন এবং কৃত্রিম পাহাড় নির্মাণের কাজ। পরে দেশ-বিদেশ থেকে পশুপাখি এনে এটিকে পূর্ণাঙ্গ বিনোদনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা হয়। সেই থেকেই এটি পরিচিতি পায় 'রাজশাহী চিড়িয়াখানা' নামে।

একসময় এই চিড়িয়াখানায় ছিল বাঘ, সিংহ, উট, হায়না, ভালুকসহ নানা বন্যপ্রাণী। ১৯৯৭ সালে ঢাকা থেকে আনা ছয় বছর বয়সী একটি বাঘ দীর্ঘদিন নিঃসঙ্গ জীবন কাটিয়ে ২০০৮ সালে মারা যায়।

এর আগে একটি সিংহ ও সিংহী ছিল চিড়িয়াখানার অন্যতম আকর্ষণ। ২০১৩ সালে সিংহীর মৃত্যু হলে কিছুদিন পর মারা যায় সিংহটিও। ভালুকের জন্য নির্মিত দুটি বিশেষ খাঁচাও এখন পরিত্যক্ত স্মৃতি। সর্বশেষ ২০২০ সালের জানুয়ারিতে অসুস্থ হয়ে মারা যায় একমাত্র ভালুকটি।

এখন পার্কটিতে রয়েছে মাত্র দুটি ঘড়িয়াল, কিছু চিত্রা হরিণ এবং প্রায় শতাধিক কবুতর। অন্য প্রাণীগুলোর অনেকগুলো বিভিন্ন পার্কে অনুদান বা বিক্রির মাধ্যমে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।

রাসিক সূত্র জানায়, স্বপ্নপুরী পার্কে অনুদান হিসেবে দেওয়া হয়েছে দুটি বেবুন, ১৩টি বানর, তিনটি হনুমান, একটি অজগর ও দুটি মদনটাক পাখি। এছাড়া একটি মায়া হরিণ বিক্রি করা হয়েছে।

রাজশাহী কেন্দ্রীয় উদ্যানের মোট আয়তন প্রায় ৩৩ একর। তবে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে প্রায় তিন একর জায়গাজুড়ে বঙ্গবন্ধু নভোথিয়েটার নির্মাণ হওয়ায় এর পরিসর কমে যায়। এছাড়া উদ্যানের ভেতরে নির্মাণ করা হয়েছে একটি রিসোর্টও।

রাসিকের কর্মকর্তাদের মতে, বর্তমান আয়তনে আধুনিক চিড়িয়াখানা পরিচালনা প্রায় অসম্ভব। ফলে এটিকে 'বার্ড পার্ক' হিসেবে গড়ে তোলার নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

বিগত সরকারের আমলে প্রায় ১৬ কোটি টাকা ব্যয়ে উদ্যানটির সৌন্দর্যবর্ধন ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন করা হয়। কিন্তু সাজসজ্জা বাড়লেও কমতে থাকে প্রাণীর সংখ্যা। বর্তমানে টিকিট বিক্রির সামান্য আয় দিয়েই কোনোভাবে প্রাণীগুলোর খাবার ও রক্ষণাবেক্ষণ চালানো হচ্ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

রাসিকের ভেটেরিনারি সার্জন ডা. ফরহাদ উদ্দিন বলেন, 'নাম পরিবর্তনসহ নতুন প্রকল্পের জন্য প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছে। অনুমোদন পেলে নতুন করে পার্কটিকে সাজানো হবে। সেখানে বিভিন্ন প্রজাতির পাখির আবাসস্থল ও অভয়াশ্রম তৈরি করা হবে।' তিনি আরও বলেন, প্রাথমিক পরিকল্পনায় ১০ থেকে ১৫ প্রজাতির রঙিন পাখি রাখা হবে।

পার্কটির সবচেয়ে বড় সংকট এখন হরিণের সংখ্যা। রাসিক বলছে, ধারণক্ষমতার চেয়ে ৪৯টি হরিণ বেশি রয়েছে উদ্যানে।

ডা. ফরহাদ উদ্দিন জানান, বন বিভাগের নিয়ম অনুযায়ী একটি হরিণের জন্য কমপক্ষে ৫০০ স্কয়ার ফিট জায়গা প্রয়োজন। সেই হিসাবে বর্তমান সেডে সর্বোচ্চ ৮০টি হরিণ রাখার সুযোগ থাকলেও সেখানে রয়েছে ১২৯টি হরিণ।

তিনি বলেন, অতিরিক্ত হরিণের খাবার ও পরিচর্যা ব্যয়বহুল হয়ে যাচ্ছে। তাই বন বিভাগের অনুমতি নিয়ে নির্ধারিত মূল্যে অতিরিক্ত হরিণ বিক্রির পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। তবে শর্ত থাকবে- কেউ জবাই করতে পারবে না, শুধুমাত্র লালন-পালনের জন্য নিতে হবে। ইতোমধ্যে সিলেটের জালালাবাদ প্যারা কমান্ড ইউনিট পাঁচটি হরিণ চেয়ে আবেদন করেছে বলেও জানান তিনি।

এদিকে, চিড়িয়াখানার সবচেয়ে ব্যতিক্রমী প্রাণী এখন দুটি ঘড়িয়াল—পুরুষটির নাম গড়াই এবং স্ত্রীটির নাম পদ্মা। গত ফেব্রুয়ারিতে পদ্মা ডিম দিলেও সেটি সময়মতো টের পাননি কর্মচারীরা। ফলে ডিমগুলো পানিতে ডুবে নষ্ট হয়ে যায়। পরে একটি পচা ডিম ভেসে উঠলে বিষয়টি জানা যায়।

ডা. ফরহাদ উদ্দিন বলেন, ঘড়িয়ালের বছরে একবার প্রজনন ক্ষমতা হয়। এবার আমরা আরও সতর্ক থাকব। ইনকিউবেটরে ডিম সংরক্ষণ করে বাচ্চা ফোটানোর চেষ্টা করা হবে।

Read more — উত্তরাঞ্চল
Home