উত্তরা প্রতিদিন
ঢাকা

বিট-খাটাল কেলেঙ্কারি : উপদেষ্টার সই জাল করে কোটি টাকা আত্মসাতের ছক

উত্তরা ডেস্ক ৫ মে ২০২৬, ০২:৩৫ অপরাহ্ণ
বিট-খাটাল কেলেঙ্কারি : উপদেষ্টার সই জাল করে কোটি টাকা আত্মসাতের ছক

কক্সবাজারের রামু উপজেলার বাসিন্দা মো. আলাউদ্দিন রবিন (৪০)। পেশায় আইনজীবী হলেও তার একাধিক ব্যবসা রয়েছে। এর মধ্যে ‘মেসার্স জিতু এন্টারপ্রাইজ’ নামক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে তিনি গবাদি পশু ক্রয়-বিক্রয়ের ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে কক্সবাজারের শাহপরীর দ্বীপ করিডোর দিয়ে মিয়ানমার থেকে গরু আমদানি করা হতো, তবে ২০১৯ সালের পর তা বন্ধ হয়ে যায়। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে পুনরায় আমদানি কার্যক্রম শুরু করার পরিকল্পনা থেকে তিনি ‘বিট-খাটাল’-এর সরকারি অনুমোদন পাওয়ার চেষ্টা করেন। একপর্যায়ে তিনি অনুমোদনপত্রও পান, তবে তা ছিল ভুয়া। গরু প্রতি ২ হাজার টাকা করে দুই লাখ গরু আমদানিতে প্রায় ৪০ কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার এই বিশাল পরিকল্পনা ভেস্তে গেছে ভুক্তভোগী ওই ব্যবসায়ীর সতর্কতায়।

 

ভুক্তভোগী ব্যবসায়ীর ভাষ্যমতে, গরু আমদানির অনুমোদনের জন্য তিনি স্থানীয় পরিচিত ব্যক্তি খোরশেদ আলমের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। খোরশেদ আলম একটি বেসরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তা এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীন পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) কর্তৃপক্ষের মহাপরিচালক ও যুগ্ম সচিব মফিদুল আলমের ভাই। সরকারি উচ্চপর্যায়ে সংযোগ থাকার কথা বলে খোরশেদ আলম তাকে গরু আমদানির অনুমোদন এনে দিতে পারবেন বলে আশ্বস্ত করেন। একপর্যায়ে তাকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আবেদন করতে বলা হয়। সেই আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে তৎকালীন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার সুপারিশসহ ৫ লাখ গরু আমদানি করার একটি মঞ্জুরিপত্র ইস্যু করা হয়। পরে আলাউদ্দিন রবিন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে খোঁজ নিতে গেলে জানতে পারেন যে, এমন কোনো আবেদন মন্ত্রণালয়ে আসেইনি। পরবর্তীতে এ ঘটনায় রাজধানীর পল্লবী থানায় মামলা দায়ের করে ডিবি পুলিশ।

সাবেক স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার স্বাক্ষর নকল করে প্রতারণা ও জালিয়াতির অভিযোগে দায়ের করা এ মামলায় তদন্ত শেষে পাঁচজনকে অভিযুক্ত করে আদালতে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) জমা দেওয়া হয়েছে। সেখানে এই সংঘবদ্ধ প্রতারক চক্রের নাম উঠে এসেছে। যুগ্ম সচিবের ভাই থেকে শুরু করে অতিরিক্ত পুলিশ সুপারসহ পাঁচজনের এই চক্র প্রতারণার মাধ্যমে কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার চেষ্টা চালিয়েছিল। আসামিরা হলেন— জাফর ইকবাল ওরফে রাঙ্গা, মো. আব্দুল্লাহ জাবেদ, খোরশেদ আলম, শাহাবুদ্দীন আহমদ ও মো. হযরত আলী।

 

মামলা সূত্রে জানা যায়, মিয়ানমার থেকে গরু আমদানির বিষয়ে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে ব্যবসায়ী আলাউদ্দিন রবিনের সঙ্গে কথা হয় পূর্বপরিচিত খোরশেদ আলমের। পরবর্তীতে খোরশেদ আলম তাকে ঢাকায় বসবাসরত আব্দুল্লাহ জাবেদ নামক এক ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দেন। ওই বছরের ২ মার্চ জাবেদ ও খোরশেদ আলমের মাধ্যমে আলাউদ্দিনকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর জন্য একটি আবেদনপত্রের নমুনা দেওয়া হয়। সেই নমুনার ওপর ভিত্তি করে আরেকটি আবেদন তৈরি করতে বলা হয়। পরদিন তিনি আবেদন প্রস্তুত করে হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে খোরশেদ আলমকে পাঠান। পরবর্তীতে জাবেদ তাকে জানায় যে, তার আবেদন অনুমোদনের প্রক্রিয়া অনেক দূর এগিয়েছে। তাকে ঢাকায় আসতে বলা হয়। ১৯ মার্চ তিনি ঢাকার মিরপুর ডিওএইচএস এলাকায় জাফর ইকবাল ওরফে রাঙ্গার অফিসে যান। আলোচনায় জাফর ইকবাল দাবি করেন যে, তিনি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে গরু আমদানির অনুমোদন এনে দিতে পারবেন। এজন্য তিনি একটি চুক্তির প্রস্তাব দেন, যেখানে দুই লাখ গরু আমদানির বিপরীতে গরুপ্রতি ২ হাজার টাকা হিসাবে মোট ৪০ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়। এর মধ্যে ২০ কোটি টাকা জাফর ইকবালের অংশ এবং ১০ কোটি টাকা অগ্রিম দেওয়ার শর্ত রাখা হয়। পরে আলাউদ্দিন রবিন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে খোঁজ নিতে গেলে জানতে পারেন যে, এমন কোনো আবেদন মন্ত্রণালয়ে আসেইনি। পরবর্তীতে এ ঘটনায় রাজধানীর পল্লবী থানায় মামলা দায়ের করে ডিবি পুলিশ।

মামলার কোথাও নাম না থাকলেও সিআইডির তদন্তে উঠে আসে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সাময়িক বরখাস্ত) শাহাবুদ্দীন আহমদের নাম। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা সিআইডির পরিদর্শক আবুল কালাম তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করেন, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর জন্য আবেদনপত্রের নমুনা প্রথমে শাহাবুদ্দীন আহমদের নম্বর থেকে জাফর ইকবাল ওরফে রাঙ্গাকে পাঠানো হয়। জাফর ইকবাল পরে জাবেদ ও খোরশেদ আলমকে আবেদনের কপি হোয়াটসঅ্যাপ করেন। যেটির আদলে আরেকটি আবেদন তৈরি করতে বলা হয় ব্যবসায়ী আলাউদ্দিন রবিনকে। পরবর্তীতে আলাউদ্দিন রবিন ৫ লাখ গবাদি পশুর আমদানির অনুমতি চেয়ে আবেদন করেন। সেই কপিতে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার ভুয়া সুপারিশসহ স্বাক্ষর সরবরাহ করেন শাহাবুদ্দীন। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের এক উপসচিবের সিল ও স্বাক্ষরসহ একটি ভুয়া আদেশনামাও পাঠানো হয়। এছাড়া শাহাবুদ্দীন ও জাফর ইকবালের হোয়াটসঅ্যাপের কথোপকথনে সরকারি বিভিন্ন কর্মকর্তার বদলির সুপারিশও পাওয়া যায়।

 

তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অভিযুক্ত পুলিশ কর্মকর্তা শাহাবুদ্দীন আহমদের ব্যবহার করা হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরটি হযরত আলী নামক এক ব্যক্তির নামে নিবন্ধিত। যার নামে দেশের বিভিন্ন থানায় একাধিক প্রতারণার মামলা রয়েছে। শাহাবুদ্দীন নিজের পরিচয় গোপন রাখতে অন্যের নামে নিবন্ধিত সিম ব্যবহার করতেন। তারা নিজেদের মধ্যে এবং ভিকটিমের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রেখে ভুয়া অনুমোদনপত্র, আবেদনপত্র ও চুক্তিনামা আদান-প্রদান করতেন। বিশেষ করে, স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার স্বাক্ষর করা ভুয়া নথি বিভিন্ন সময় হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে পাঠানো হয়েছে। এছাড়া বিতর্কিত নথিতে ব্যবহৃত স্বাক্ষরগুলো আসল স্বাক্ষরের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ এবং জাল। একইভাবে উপসচিবের স্বাক্ষরও জাল।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, জাফর ইকবাল ‘প্রামানিক ট্রেডিং কর্পোরেশন’ নামে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের আড়ালে ডিওএইচএস এলাকায় অফিস ভাড়া নিয়ে প্রতারণামূলক কাজ পরিচালনা করতেন। বিভিন্ন ব্যক্তিকে সরকারি অনুমোদন পাইয়ে দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে টাকা আদায়ের চেষ্টা করতেন।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ব্যবসায়ী আলাউদ্দিন রবিন গণমাধ্যমকে বলেন, ‘সন্দেহবশত আমি সরাসরি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে গিয়ে আবেদনের সত্যতা যাচাই করি। সেখানে তৎকালীন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার পিএস-এর কাছে জানতে পারি, আমার নামে কোনো আবেদন জমা হয়নি এবং প্রদর্শিত মঞ্জুরিপত্রটি সম্পূর্ণ ভুয়া। এছাড়া তথাকথিত অনুমোদনপত্রে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা ও উপসচিবের স্বাক্ষর জাল করা হয়েছে। এরপর আমি ঢাকা থেকে বাড়ি ফিরে আসি। পরবর্তীতে ডিবি পুলিশ আমার কাছ থেকে যাবতীয় তথ্য-উপাত্ত চাইলে আমি তাদেরকে সহযোগিতা করি।’

তিনি জানান, চুক্তি অনুসারে তারা ১০ কোটি টাকা অগ্রিম চেয়েছিল। একপর্যায়ে তা লাখের ঘরে আসে। তবে, তিনি অগ্রিম কোনো টাকা পরিশোধ করেননি। পরবর্তীতে জানতে পারেন যে, তারা ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করে প্রতারণার আশ্রয় নিয়েছে।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডির পরিদর্শক আবুল কালাম জানান, অভিযোগের বিষয়ে নিবিড় তদন্ত শেষে পাঁচজনকে অভিযুক্ত করে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়েছে। এর মধ্যে চারজনকে বিভিন্ন সময় গ্রেপ্তার করে আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে প্রতারণা ও জালিয়াতির অভিযোগ প্রাথমিকভাবে প্রমাণিত হওয়ায় দণ্ডবিধির একাধিক ধারায় তাদেরকে অভিযুক্ত করা হয়েছে।

বিট-খাটাল কী

বাংলাদেশের প্রতিবেশী দেশ ভারত বা মিয়ানমারের সীমান্ত দিয়ে স্থলপথে যেসব গরু, মহিষ বা অন্য চতুষ্পদ প্রাণী আনা হয়, সেগুলোর সংখ্যা নির্ধারণ, ব্যবস্থাপনা এবং রাজস্ব আদায়ের জন্য প্রাণীগুলোকে সীমান্তবর্তী যে স্থানে রাখা হয়, সেই স্থানটি খাটাল বা বিট বা বিট-খাটাল নামে পরিচিত। এর আভিধানিক অর্থ গোয়াল বা বাথান। বিট বলতে বোঝায়, সীমান্ত পার হওয়ার পর গবাদিপশু যেখান দিয়ে আসে। আর খাটাল হলো গবাদিপশু আনার পর যেখানে রাখা হয়।

 

Read more — জাতীয়
Home