উত্তরা প্রতিদিন
ঢাকা

রাজশাহী বিভাগে ১৩০ প্রার্থীর জামানত বাজেয়াপ্ত

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন
উত্তরা প্রতিদিন সুজন আলী ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৪:০৭ অপরাহ্ণ
রাজশাহী বিভাগে ১৩০ প্রার্থীর জামানত বাজেয়াপ্ত

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটে রাজশাহী বিভাগের আট জেলার ৩৯টি সংসদীয় আসনে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী ছাড়া সব প্রার্থী প্রয়োজনীয় ন্যূনতম ভোট না পাওয়ায় জামানত হারিয়েছেন। সংশ্লিষ্ট জেলার রির্টানিং কর্মকর্তা স্বাক্ষরিত ফলাফলে এ তথ্য পাওয়া গেছে।

গত বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত সংসদ নির্বাচন ও একই সঙ্গে আয়োজিত গণভোটে সারাদেশে ভোটার উপস্থিতি ছিল ৫৯ দশমিক ৪৪ শতাংশ বলে জানিয়েছে নির্বাচন কমিশন। ফলাফল অনুযায়ী, বিএনপি ২০৯টি আসনে জয়লাভ করেছে। জামায়াতে ইসলামী পেয়েছে ৬৮টি আসন এবং জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ছয়টি আসনে বিজয়ী হয়েছে।

১৯৭২ সালের গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের (আরপিও) ৪১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনো প্রার্থী সংশ্লিষ্ট আসনে প্রদত্ত মোট বৈধ ভোটের অন্তত এক-অষ্টমাংশ বা ১২ দশমিক ৫ শতাংশ ভোট না পেলে তাঁর জামানত বাজেয়াপ্ত হয়। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জামানতের পরিমাণ ছিল ৫০ হাজার টাকা।

রিটার্নিং কর্মকর্তাদের স্বাক্ষরিত বেসরকারি ফলাফলে দেখা গেছে, রাজশাহী বিভাগে পরাজিত প্রার্থীদের বড় একটি অংশ এই জামানত রক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যক ভোট পান নি। বিভাগরে আট জেলার ৩৯টি আসনে নির্বাচনে অংশ নেওয়া ২০৩ প্রার্থীর ১৩০ জনই জামানাত রক্ষার করার জন্য নূন্যতম ভোট পান নি।

জেলা ভিত্তিক তথ্যে দেখা যায়, রাজশাহী জেলার ছয়টি আসনে ৩২ জন প্রার্থীর মধ্যে ২০ জন জামানত হারিয়েছেন। এতে দেখা যায়, রাজশাহী-১ আসনে মোট ভোট পড়েছেন ৩ লাখ ৫১ হাজার ৮৪৪টি। ফলে এই আসনটিতে জামানত বাঁচাতে প্রার্থীদের পেতে হবে ৪৩ হাজার ৯৮১টি ভোট। তবে এই আসনে ৩ জন প্রার্থী এই ভোট পায় নি। তারা হলেন- গণ অধিকার পরিষদের প্রার্থী মির মো. শাহজাহান- তিনি পয়েছেন ৪০৭ ভোট; আমার বাংলাদেম পার্টির প্রার্থী মো. আব্দুর রহমান, তিনি ভোট  পেয়েছেন ১১০০ ও স্বতন্ত্র প্রার্থী আল-সাআদ তিনি পেয়েছেন ৬৬৩ ভোট।

রাজশাহী-২ আসনে মোট ভোট পড়েছেন ২ লাখ ৩৫ হাজার ৯১৬ টি। ফলে এই আসনটিতে জামানত বাঁচাতে প্রার্থীদের পেতে হবে ২৯ হাজার ৪৯০টি ভোট। তবে এই আসনে ৪ জন প্রার্থী এই ভোট পায় নি। তার হলেন- আমার বাংলাদেশ পার্টির প্রার্থী মু. সাঈদ নোমান। তিনি পয়েছেন ৭৮৬ ভোট, নাগরিক ঐক্যার প্রার্থী সামছুল আলম। তিনি ভোট পেয়েছেন ৫৫২, বাংলাদেশ লেবার পার্টির প্রার্থী মেজবাউল ইসলাম। তিনি পেয়েছেন ৩৮৭ ভোট ও স্বতন্ত্র প্রার্থী সালেহ আহমেদ। তিনি পেয়েছেন ৮০১ ভোট।

রাজশাহী-৩ আসনে মোট ভোট পড়েছেন ৩ লাখ ২৭ হাজার ৪০৭টি। ফলে এই আসনটিতে জামানত বাঁচাতে প্রার্থীদের পেতে হবে ৪০ হাজার ৯২৬টি ভোট। তবে এই আসনে ৪ জন প্রার্থী এই ভোট পায় নি। তার হলেন- আম জনতার দলের প্রার্থী সাইদ পরভেজ। তিনি পয়েছেন ২৯৫ ভোট, ইসলামি আন্দলোন বাংলাদেশের প্রার্থী ফজলুর রহমান। তিনি ভোট পেয়েছেন ১১৫৪টি, জাতীয় পার্টির প্রার্থী অফজাল হোসেন। তিনি পেয়েছেন ২৩৯০ ভোট ও স্বতন্ত্র প্রার্থী হাবীবা বেগম। তিনি পেয়েছেন ১ হাজার ১৭৭ ভোট।

রাজশাহী-৪ আসনে মোট ভোট পড়েছেন ২ লাখ ৩১ হাজার ১৯০টি। ফলে এই আসনটিতে জামানত বাচাতে প্রার্থীদের পেতে হবে ২৮ হাজার ৮৯৯টি ভোট। তবে এই আসনে ২ জন প্রার্থী এই ভোট পায় নি। তার হলেন, ইসলামি আন্দলোন বাংলাদেশের প্রার্থী তাজুল ইসলাম খান। তিনি পয়েছেন ৬৭০ ভোট ও জাতীয় পার্টির প্রার্থী ফজলুল হক। তিনি পেয়েছেন ১ হাজার ৭৫৯ ভোট।

রাজশাহী-৫ আসনে মোট ভোট পড়েছেন ২ লাখ ৪৩ হাজার ৪৩৬টি। ফলে এই আসনটিতে জামানত বাচাতে প্রার্থীদের পেতে হবে ৩০ হাজার ৪৩০টি ভোট। তবে এই আসনে ৫ জন প্রার্থী এই ভোট পায় নি। তার হলেন- বাংলাদেশ সুপ্রীম পার্টির প্রার্থী আলতাফ হোসেন মোল্লা। তিনি পেয়েছেন ৯৩৮ ভোট। ইসলামি আন্দলোন বাংলাদেশের প্রার্থী রুহুল আমিন। তিনি পেয়েছেন ৬২০ ভোট। স্বতন্ত্র প্রার্থী ইসফা খাইরুল হক। তিনি পেয়েছেন ২ হাজার ৪৯৬ ভোট। স্বতন্ত্র প্রার্থী রায়হান কাউসার। তিনি পেয়েছেন ৪৪২ ভোট। আর স্বতন্ত্র প্রার্থী রেজাউল করিম পেয়েছেন ৬ হাজার ৪৩২ ভোট।

রাজশাহী-৬ আসনে মোট ভোট পড়েছেন ২ লাখ ৫৩ হাজার ৩০২টি। ফলে এই আসনটিতে জামানত বাঁচাতে প্রার্থীদের পেতে হবে ৩১ হাজার ৬৬৩টি ভোট। তবে এই আসনে ২ জন প্রার্থী এই ভোট পায় নি। তার হলেন- ইসলামী আন্দলোন বাংলাদেশের প্রার্থী আব্দুস সালাম সুরুজ। তিনি ভোট পেয়েছেন ১ হাজার ৬২৮টি। আর জাতীয় পার্টির প্রার্থী ইকবাল হোসেন পেয়েছেন ২ হাজার ৯৩০ ভোট।

এদিকে, নওগাঁর ছয়টি আসনে ৩২ জন প্রার্থীর ২০ জন এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জের তিনটি আসনে ১৬ জন প্রাথীর ১০ জন জামানত রক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় ভোট পাননি।

এছাড়াও পাবনার পাঁচটি আসনে ২৮ জন প্রাথীর ১৮ জন, সিরাজগঞ্জের ছয়টি আসনে ৩৯ জন প্রাথীর ২৭ জন জামানত হারিয়েছেন। বগুড়ার সাতটি আসনে ৩৪ জন প্রাথীর ২০ জন, নাটোরে ২৭ জন প্রাথীর ১৯ জন এবং জয়পুরহাটে আটজনের মধ্যে পাঁচজন প্রার্থী ন্যূনতম ভোট পেতে ব্যর্থ হয়েছেন।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এ ফলাফল থেকে স্পষ্ট যে বিভাগে ছোট দল ও স্বতন্ত্র প্রার্থীরা উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলতে পারেননি; ভোট মূলত কয়েকটি বড় রাজনৈতিক জোটের মধ্যেই কেন্দ্রীভূত ছিল।

রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে জাতীয় পার্টি বিভাগের ২৭টি আসনে প্রার্থী দিলেও কোনো আসনেই জামানত রক্ষা করতে পারেনি। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ২৫টি আসনে, গণঅধিকার পরিষদ ও বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি আটটি করে আসনে প্রার্থী দিলেও কেউ জামানত রক্ষার প্রয়োজনীয় ভোট পায়নি।

আমার বাংলাদেশ পার্টি (এবি পার্টি) সাতজন এবং বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ) ছয়জন প্রার্থী দিলেও তাঁদের সবার জামানত বাজেয়াপ্ত হয়েছে।

এ ছাড়া নাগরিক ঐক্য, গণফোরাম, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল, গণসংহতি আন্দোলন, বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্ট, লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি ও বাংলাদেশ মুসলিম লীগসহ আরও কয়েকটি দল যেসব আসনে প্রার্থী দিয়েছিল, সেখানেও কেউ জামানত রক্ষা করতে পারেনি।

নির্বাচন পর্যবেক্ষকদের মতে, ছোট দলগুলোর সীমিত সাংগঠনিক শক্তি ও ভোটভিত্তির প্রতিফলনই এই ব্যাপক জামানত বাজেয়াপ্তের ঘটনায় স্পষ্ট হয়েছে; বিভাগে প্রতিদ্বন্দ্বিতা মূলত কয়েকটি প্রধান রাজনৈতিক শক্তির মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল।

Read more — নির্বাচন
Home