উত্তরা প্রতিদিন
ঢাকা

দখল-দূষণে বিপর্যস্ত রাজশাহীর নদ-নদী, সুরক্ষায় সমন্বিত উদ্যোগের আহ্বান

উত্তরা প্রতিদিন উত্তরা প্রতিবেদক ১৫ অক্টোবর ২০২৬, ০৬:২০ অপরাহ্ণ
দখল-দূষণে বিপর্যস্ত রাজশাহীর নদ-নদী, সুরক্ষায় সমন্বিত উদ্যোগের আহ্বান

দখল, দূষণ, ভরাট ও পানিপ্রবাহে প্রতিবন্ধকতার কারণে সংকটে পড়েছে রাজশাহীর নদ-নদী। কমছে নাব্যতা, ব্যাহত হচ্ছে স্বাভাবিক প্রবাহ। হুমকির মুখে পড়ছে কৃষি, মৎস্যসম্পদ, প্রাণবৈচিত্র্য ও নদীনির্ভর মানুষের জীবন-জীবিকা। এরই মধ্যে বারনই নদীতে দেশীয় মাছের ব্যাপক মৃত্যুর ঘটনায় পানিদূষণ নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে। এ পরিস্থিতিতে নদ-নদী রক্ষায় দখল-দূষণ বন্ধ, অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বিত উদ্যোগের আহ্বান জানিয়েছেন পরিবেশকর্মী ও আলোচনায় অংশগ্রহণকারীরা।

বিশ্ব নদী দিবস-২০২৬ উপলক্ষে আজ বৃহস্পতিবার রাজশাহী নগরীর এনজিও ফোরাম মিলনায়তনে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় ‘রাজশাহী জেলার নদ-নদীর সামগ্রিক অবস্থা’ শীর্ষক উপস্থাপনায় নদীগুলোর সংকটের চিত্র তুলে ধরা হয়। অ্যাসোসিয়েশন ফর ল্যান্ড রিফর্ম অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (এএলআরডি), বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা), রুলফাও, বস্তি উন্নয়ন ও কর্মসংস্থা, উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান বারসিক, বরেন্দ্র ইয়ুথ ফোরাম, মাসাউস, ঠিকানা ও সামাজিক কল্যাণ সংস্থার যৌথ উদ্যোগে এ সভার আয়োজন করা হয়। উপস্থাপনা করেন বেলার রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের সমন্বয়কারী তন্ময় কুমার সান্যাল।

উপস্থাপনায় পদ্মা, মহানন্দা, বড়াল, বারনই, শিব, ফকিরনী, মুসাখান, হোজা, নারদ, স্বরমঙ্গলা, বারাহী, দয়া ও সন্ধ্যাসহ ১৩টি নদীর সংকট তুলে ধরা হয়। পানি উন্নয়ন বোর্ডের সূত্র উল্লেখ করে জানানো হয়, রাজশাহী মহানগর এলাকায় পদ্মা নদীসংলগ্ন সহস্রাধিক অবৈধ দখলদারের তথ্য রয়েছে। এ ছাড়া ২০২২ সালে মহানন্দা ও পুনর্ভবা নদীতে ১ হাজার ৭৭১টি দখলস্থল এবং ৫৭ জন দখলদারের তথ্য উপস্থাপন করা হয়েছিল।

নাটোরের বড়াইগ্রাম এলাকায় ২০২২ সালে বড়াল নদীর প্রায় ৪০ কিলোমিটার অংশে ১ হাজার ১৭৮টি অবৈধ স্থাপনা শনাক্ত করা হয়। স্লুইসগেট, ক্রস-ড্যাম, পলি ও কচুরিপানার কারণে নদীটির বিভিন্ন অংশে পানিপ্রবাহ ও নাব্যতা ব্যাহত হচ্ছে। ফলে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনা এবং দখল-দূষণ নিয়ন্ত্রণ জরুরি হয়ে পড়েছে।

বারনই নদীর পরিস্থিতিও উদ্বেগজনক। ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে বাগমারা ও নলডাঙ্গা এলাকায় নদীতে দেশীয় মাছের ব্যাপক মৃত্যুর খবর প্রকাশিত হয়। জেলা মৎস্য কার্যালয়ের সূত্র উল্লেখ করে উপস্থাপনায় পানিতে অ্যামোনিয়ার আধিক্য ও দ্রবীভূত অক্সিজেনের ঘাটতিকে মাছের মৃত্যুর সম্ভাব্য কারণ হিসেবে তুলে ধরা হয়। নদীর পানির গুণগত মান নষ্ট হওয়ায় জলজ প্রাণবৈচিত্র্য ও মৎস্যসম্পদ হুমকির মুখে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

শিব নদীর ওপর ১০টি গ্রামের প্রায় ১ হাজার ৭৮৫টি জেলে পরিবার নির্ভরশীল। নদী ভরাট, দূষণ ও সংযোগে প্রতিবন্ধকতার কারণে তাঁদের জীবন-জীবিকা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অন্যদিকে, নারদ নদীতে পানিপ্রবাহে বাধা সৃষ্টিকারী ৩৬টি স্থাপনা এবং নাটোর সদর উপজেলায় ৪৭১ জন দখলদার চিহ্নিত হওয়ার তথ্য উপস্থাপনায় উল্লেখ করা হয়। পাশাপাশি বারাহী, স্বরমঙ্গলা ও দয়া নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ দখল, ভরাট ও নগর সম্প্রসারণের কারণে সংকুচিত হওয়ার চিত্র তুলে ধরা হয়।

সভায় রাজশাহী জেলা ও বিভাগের নদ-নদীর সংখ্যা ও নাম স্পষ্ট করা, নদীর সীমানা নির্ধারণ, অবৈধ দখল উচ্ছেদ, দূষণের উৎস বন্ধ, বর্জ্য শোধন নিশ্চিত করা, নদী-খাল-বিলের সংযোগ পুনরুদ্ধার এবং বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে প্রয়োজনীয় পুনঃখননের সুপারিশ করা হয়। একই সঙ্গে রাজশাহী নগরের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত বারাহী, নবগঙ্গা ও স্বরমঙ্গলা নদীকে দখল-দূষণমুক্ত করে স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানানো হয়।

সভায় সভাপতিত্ব করেন রুলফাওয়ের নির্বাহী পরিচালক আফজাল হোসেন। সম্মানিত অতিথি হিসাবে বক্তব্য দেন পবা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ইবনুল আবেদীন, রাজশাহী জেলা মৎস্য কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মোসা. আয়েশা খাতুন, পানি উন্নয়ন বোর্ডের সহকারী প্রকৌশলী রিংকু প্রামানিক, দৈনিক সোনার দেশের সম্পাদক আকবারুল হাসান মিল্লাত এবং এএলআরডির প্রোগ্রাম ম্যানেজার সানজিদা খান। শুভেচ্ছা বক্তব্য দেন বস্তি উন্নয়ন ও কর্মসংস্থার নির্বাহী পরিচালক হাসিনুর রহমান এবং এএলআরডির বিজয় শংকর বড়ুয়া। সভায় সাংবাদিক, এনজিও প্রতিনিধি, যুব সংগঠক, কৃষক ও জেলেসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নেন।

আলোচনায় অংশগ্রহণকারীরা বলেন, নদীকে শুধু খনন বা পানি নিষ্কাশনের অবকাঠামো হিসেবে দেখলে চলবে না; একে জীবন্ত বাস্তুতন্ত্র হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ, পানির গুণগত মান ও প্রাণবৈচিত্র্য রক্ষায় দখল-দূষণ নিয়ন্ত্রণ জরুরি। এ জন্য অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ, দূষণ নিয়ন্ত্রণ, নদী-খালের সংযোগ পুনরুদ্ধার এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি-বেসরকারি সংস্থার সমন্বিত উদ্যোগ নিশ্চিত করতে হবে।

তারা আরও বলেন, নদী রক্ষায় পরিকল্পিত ও ধারাবাহিক পদক্ষেপের পাশাপাশি স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণও গুরুত্বপূর্ণ। এখনই কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া না হলে নদীর অস্তিত্ব, জলজ প্রাণবৈচিত্র্য ও নদীনির্ভর মানুষের জীবন-জীবিকা আরও ঝুঁকির মুখে পড়বে। তাই ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য নদ-নদী সংরক্ষণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে।

Read more — উত্তরাঞ্চল
Home