উত্তরা প্রতিদিন
ঢাকা

জিআই স্বীকৃত মোহনপুরের পানে ৬০০ কোটি টাকার বাণিজ্য

‘সোনার পাতা’ বদলে দিচ্ছে গ্রামীণ অর্থনীতি
উত্তরা প্রতিদিন রাকিবুল ইসলাম, মাল্টিমিডিয়া প্রতিবেদক (মোহনপুর) ১৫ অক্টোবর ২০২৬, ১২:১৮ পূর্বাহ্ণ
জিআই স্বীকৃত মোহনপুরের পানে ৬০০ কোটি টাকার বাণিজ্য

বরজজুড়ে সারি সারি পানগাছ। সবুজ পাতার ফাঁকে ফাঁকে বেড়ে ওঠে কৃষকের স্বপ্ন। ভোরের আলো ফুটতেই শুরু হয় পান তোলার ব্যস্ততা। বরজ থেকে তোলা পান নিয়ে কৃষকেরা ছুটছেন হাটে। সেখানে দরদাম শেষে পাইকারদের হাত ধরে সেই পান পৌঁছে যাচ্ছে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। ঐতিহ্য, স্বাদ আর অর্থনৈতিক সম্ভাবনায় রাজশাহীর মোহনপুরের মিষ্টি পান এখন শুধু কৃষিপণ্য নয়, হয়ে উঠেছে গ্রামীণ অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এ উপজেলায় পান কেনাবেচায় ৬০০ কোটি টাকার বেশি বাণিজ্য হয়েছে। জিআই স্বীকৃতি পাওয়া এই ‘সোনার পাতা’ বদলে দিচ্ছে হাজারো মানুষের জীবন-জীবিকা।

রোববার মোহনপুর উপজেলার একদিলতলা হাটে গিয়ে দেখা যায়, কৃষকেরা ঝুড়ি ও বস্তায় করে তাঁদের উৎপাদিত পান নিয়ে এসেছেন। ক্রেতা-বিক্রেতার দরদামে সরগরম হাট। কেউ পান বাছাই করছেন, কেউ বিড়া বাঁধছেন, আবার কেউ পাইকারি চালানের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। হাট থেকে পান কিনে পাইকারেরা তা পাঠাচ্ছেন ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে। পান ঘিরে কৃষক, শ্রমিক, পরিবহনকর্মী ও ব্যবসায়ীদের কর্মব্যস্ততায় মুখর স্থানীয় বাজার।

উপজেলা কৃষি অফিসের তথ্য অনুযায়ী, মোহনপুরে প্রায় ১ হাজার ৩৭০ হেক্টর জমিতে পান চাষ হচ্ছে। এসব জমিতে রয়েছে প্রায় ১৪ হাজার ৭০০ পানবরজ। উপজেলার বাকশিমইল, মৌগাছি, ধুরইল, ঘাসিগ্রাম, জাহানাবাদ ও রায়ঘাটি ইউনিয়ন এবং কেশরহাট পৌরসভা এলাকায় বিস্তৃত এসব বরজ। পান চাষের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত কৃষকদের পাশাপাশি কর্মসংস্থান হয়েছে শ্রমিক, বাঁশ-খড়ের সরবরাহকারী, পরিবহন ব্যবসায়ী ও পাইকারদের। ফলে পানকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে একটি বিস্তৃত গ্রামীণ অর্থনৈতিক বলয়।

মোহনপুরের মিষ্টি পান ২০২৩ সালের ৩১ আগস্ট ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্যের স্বীকৃতি পায়। এ স্বীকৃতি পানের স্বতন্ত্র পরিচিতি ও ঐতিহ্যকে আরও গুরুত্ব দিয়েছে। স্বাদ, ঘ্রাণ ও বৈশিষ্ট্যের কারণে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে মোহনপুরের মিষ্টি পানের আলাদা কদর রয়েছে। স্থানীয়ভাবে পরিচিত এই পান এখন জিআই পণ্যের মর্যাদায় দেশের কৃষি ও বাণিজ্যে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলেছে।

উপজেলার পানচাষিদের হিসাবে, এক বিঘা জমিতে পান চাষের জন্য প্রাথমিকভাবে প্রায় ৪ থেকে ৫ লাখ টাকা বিনিয়োগ করতে হয়। পরিচর্যা ও উৎপাদন ভালো হলে বছরে ৮ থেকে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হতে পারে। সব খরচ বাদ দিয়ে নিট লাভ থাকে প্রায় ৪ থেকে ৫ লাখ টাকা। তবে জমির ধরন, ফলন, রোগবালাই, শ্রমিকের মজুরি ও বাজারদরের ওপর আয়-ব্যয়ের হিসাব নির্ভর করে।

পান চাষের শুরুতেই সবচেয়ে বেশি খরচ হয় বরজ তৈরিতে। বাঁশের বেড়া, ছাউনি, লতা ও অন্যান্য উপকরণ কিনতে বড় অঙ্কের অর্থ বিনিয়োগ করতে হয়। পরবর্তী বছরগুলোতে পরিচর্যা ও রক্ষণাবেক্ষণের ব্যয় তুলনামূলক কমে আসে। নিয়মিত পান সংগ্রহ ও বিক্রি করা যায় বলে কৃষকেরা প্রয়োজন অনুযায়ী নগদ অর্থও হাতে পান। এ কারণে অনেক কৃষকের কাছে পান চাষ শুধু লাভজনক ফসল নয়, আর্থিক স্বাবলম্বিতারও পথ।

মোহনপুরের সইপাড়া গ্রামের পানচাষি রইচ উদ্দিন প্রায় ২৫ বছর ধরে মিষ্টি পান চাষ করছেন। দুই বিঘা জমিতে পান চাষ করে ভালো আয় করেছেন তিনি। রইচ উদ্দিন বলেন, পান আমাদের কাছে সোনার পাতা। প্রয়োজনের সময় বরজ থেকে পান তুলে বাজারে বিক্রি করলেই নগদ টাকা পাওয়া যায়। তবে ভালো ফলন পেতে নিয়মিত পরিচর্যা করতে হয়।

চাষিদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে আকার ও মানভেদে প্রতি বিড়া চিকন পান ২০ থেকে ৩০ টাকা, মাঝারি পান ৬০ থেকে ৭০ টাকা এবং বড় পান ৮০ থেকে ৯০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। উন্নত মানের পান কোথাও কোথাও আরও বেশি দামে বিক্রি হয়। তবে হাট, পানপাতার মান ও সরবরাহের ওপর দাম ওঠানামা করে। বাজারে ভালো দাম থাকলে কৃষকেরা লাভবান হন, আর দরপতন হলে তাঁদের আয় কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।

মৌগাছিসহ উপজেলার বিভিন্ন হাট থেকে পান সংগ্রহ করেন পাইকারেরা। পরে সেগুলো পাঠানো হয় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে। এ বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত ব্যবসায়ীদের মতে, মোহনপুরের পানের চাহিদা থাকায় স্থানীয় বাজারের বাইরেও এর বিস্তৃত বিপণনব্যবস্থা গড়ে উঠেছে।

পাইকার ব্যবসায়ী আমিনুল ইসলাম বলেন, 'চলতি মৌসুমে পানের দাম ভালো পাচ্ছি। পান সংগ্রহ করে সরাসরি ঢাকার ব্যবসায়ীদের কাছে পাঠাচ্ছি। বাজারে বর্তমান দাম অব্যাহত থাকলে পানচাষিরা আরও উৎসাহিত হবেন।'

তবে সম্ভাবনাময় এ খাতে ঝুঁকিও কম নয়। অতিরিক্ত বৃষ্টি, জলাবদ্ধতা, তীব্র রোদ ও আবহাওয়ার আকস্মিক পরিবর্তনে পানগাছ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বর্ষা মৌসুমে গোড়া পচাসহ বিভিন্ন রোগের আক্রমণে ফলন কমে যেতে পারে। অন্যদিকে বাঁশ, খড়, শ্রমিকের মজুরি, সার ও কৃষি উপকরণের দাম বাড়ায় উৎপাদন ব্যয়ও বেড়েছে। এসব কারণে কোনো মৌসুমে ভালো ফলন হলেও কাঙ্ক্ষিত লাভ ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।

চাঁদপুর গ্রামের কৃষক আবদুল হামিদ বলেন, 'পান চাষ করেই আমি অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হয়েছি। তবে রোগবালাই ও আবহাওয়ার কারণে মাঝেমধ্যে ক্ষতির আশঙ্কা থাকে। অতিরিক্ত বৃষ্টি, বরজে পানি জমে যাওয়া এবং বিভিন্ন রোগের আক্রমণে পানগাছ নষ্ট হতে পারে। কৃষি বিভাগের নিয়মিত পরামর্শ ও রোগবালাই দমনের সহজ ব্যবস্থা থাকলে চাষিরা আরও উপকৃত হবেন।'

মোহনপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. কামরুল ইসলাম বলেন, 'উৎপাদন খরচের তুলনায় লাভের সম্ভাবনা বেশি হওয়ায় উপজেলায় পান চাষে কৃষকদের আগ্রহ বাড়ছে। জিআই স্বীকৃতির ফলে মোহনপুরের পানের পরিচিতিও বেড়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মোহনপুর উপজেলায় ৬০০ কোটি টাকার বেশি পানের বাণিজ্য হয়েছে। কৃষকদের মাঠপর্যায়ে নিয়মিত পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। রোগবালাই দেখা দিলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাপনার বিষয়ে নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে।'

মোহনপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফাহিমা বিনতে আখতার বলেন, ‘রাজশাহীর পান উৎপাদনের প্রায় ২৯ শতাংশ মোহনপুরে হয়। পান এখানকার অর্থনীতি ও সংস্কৃতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। মোহনপুরে পান গবেষণা ইনস্টিটিউট স্থাপনের জন্য প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে।’

Read more — উত্তরাঞ্চল
Home