
সাইবার অপরাধ দমন, ডিজিটাল নিরাপত্তা জোরদার এবং প্রযুক্তিনির্ভর তদন্ত সক্ষমতা বাড়াতে বাংলাদেশ পুলিশের অধীনে আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করেছে বিশেষায়িত ও স্বতন্ত্র ‘সাইবার পুলিশ ইউনিট’।
বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর) পুলিশ সদর দপ্তরের হল অব ইন্টেগ্রিটিতে ইউনিটটির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। পরে পুলিশ সদর দপ্তরের হল অব প্রাইডে আয়োজিত প্রেস ব্রিফিংয়ে ইউনিটটির কার্যক্রম ও কাঠামো নিয়ে বিস্তারিত তুলে ধরেন তিনি।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, পরিবর্তনশীল অপরাধের ধরন এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) যুগে প্রচলিত পদ্ধতি থেকে বেরিয়ে আধুনিক প্রযুক্তি ও মেধানির্ভর বাহিনী হিসেবে পুলিশকে গড়ে তোলার লক্ষ্যেই সাইবার পুলিশ ইউনিটের যাত্রা শুরু হয়েছে।
নতুন এই ইউনিট একজন অতিরিক্ত আইজিপির নেতৃত্বে পরিচালিত হবে। প্রাথমিকভাবে অতিরিক্ত আইজিপি মো. ইকবাল হোসেনকে ইউনিটটির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। বিভাগীয় পর্যায়ে ডিআইজি ও অতিরিক্ত ডিআইজি এবং জেলা পর্যায়ে পুলিশ সুপার (এসপি) বা দায়িত্বপ্রাপ্ত জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা দায়িত্ব পালন করবেন।
এ ছাড়া থানা পর্যায়ে ওসির নেতৃত্বে সাইবারকেন্দ্রিক সেবা ও তদন্তের জন্য পৃথক সাব-ইনস্পেক্টর (এসআই), সহকারী সাব-ইনস্পেক্টর (এএসআই) ও কনস্টেবল পদায়ন করা হবে। অনুমোদিত অর্গানোগ্রাম অনুযায়ী ইউনিটটির মোট জনবল ৪ হাজার ৫৯২ জন নির্ধারণ করা হয়েছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, বিদ্যমান পুলিশ বাহিনী থেকে অভিজ্ঞ ও প্রশিক্ষিত সদস্যদের পদায়নের পাশাপাশি নতুন নিয়োগের মাধ্যমে পর্যায়ক্রমে ইউনিটটির পূর্ণাঙ্গ জনবল গঠন করা হবে।
সাইবার পুলিশ ইউনিটে প্রচলিত পুলিশ সদস্যদের পাশাপাশি বিভিন্ন খাতের বিশেষজ্ঞ নিয়োগের সুযোগ রাখা হয়েছে। সিস্টেম অ্যানালিস্ট, ফিন্যান্সিয়াল ডেটা অ্যানালিস্ট, সাইবার সিকিউরিটি এক্সপার্ট, নেটওয়ার্ক অ্যাডমিনিস্ট্রেটর, ডার্ক ওয়েব অ্যানালিস্ট, ক্রিপ্টো অ্যানালিস্ট, ম্যালওয়্যার অ্যানালিস্ট, সোশ্যাল মিডিয়া অ্যানালিস্ট, ইমার্জেন্সি রেসপন্স কনসালট্যান্ট, ডিজাস্টার রিকভারি এক্সপার্ট, কনটেন্ট ডেভেলপার ও কমিউনিকেশন এক্সপার্টসহ বিভিন্ন পদে চুক্তিভিত্তিক বিশেষজ্ঞ নিয়োগ দেওয়া যাবে।
তিনি বলেন, এসব বিশেষজ্ঞের জন্য আলাদা বেতন-ভাতা কাঠামোর ব্যবস্থা থাকবে। একই সঙ্গে পুলিশের আইটি ও সাইবার বিষয়ে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সদস্যদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ইউনিটে নিয়োজিত করা হবে।
উপযুক্ত পুলিশ কর্মকর্তা ও সদস্যদের দেশে-বিদেশে উচ্চতর বিশেষায়িত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছে বলেও জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। ইউনিটের কার্যক্রমে বিশেষ অবদান রাখা কর্মকর্তা ও বিশেষজ্ঞদের জন্য প্রণোদনার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
সাইবার পুলিশ ইউনিটের অধীনে আধুনিক প্রযুক্তি ও সাইবার সরঞ্জামসমৃদ্ধ ডিজিটাল ফরেনসিক ল্যাবরেটরি স্থাপনের কথাও জানান তিনি। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, মাদক, জুয়া, সন্ত্রাস, মানি লন্ডারিং, আর্থিক অপরাধ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক অপরাধ, গুজব ও সাইবার অপরাধ মোকাবিলায় ডিজিটাল ও ফরেনসিক ল্যাবের প্রয়োজনীয়তা বাড়ছে।
তিনি বলেন, আগে বিভিন্ন ইউনিটে সাইবার অপরাধ নিয়ে বিচ্ছিন্নভাবে কাজ করা হতো। এতে সমন্বয়হীনতা ছিল। নতুন ইউনিটের মাধ্যমে এসব কার্যক্রম একটি সংগঠিত কাঠামোর আওতায় আনা হবে।
সাইবার নিরাপত্তা আইন আধুনিকায়নের প্রক্রিয়া চলছে বলেও জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, আইন সংশোধনের বিষয়ে সাংবাদিক, সম্পাদক ও সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে একাধিকবার মতবিনিময় হয়েছে। ভবিষ্যতেও তাঁদের মতামত নেওয়া হবে।
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, নতুন আইনে সাইবার-সংশ্লিষ্ট অপরাধগুলো আরও সুনির্দিষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত করার চেষ্টা করা হচ্ছে। ধর্মীয় ও সামাজিক সম্প্রীতি বজায় রাখার বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে আইনের অপপ্রয়োগের মাধ্যমে নিরপরাধ বা সংশ্লিষ্ট নন—এমন কেউ যেন হয়রানির শিকার না হন, সেটিও সংশোধন প্রক্রিয়ায় বিবেচনা করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, ‘এটা খুবই সেনসিটিভ আইন। সে জন্য আমরা দীর্ঘ সময় নিচ্ছি। সবার সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে সেই বিল আমরা নিয়ে আসব।’
বিদ্যমান সাইবার ক্রাইম ইউনিট ও সিআইডির সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম নতুন কাঠামোর অধীনে আসবে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এসব কার্যক্রমকে আরও সুসংগঠিত করা হচ্ছে।

