
কিশোরগঞ্জের নিকলীতে ঘোড়াউত্রা নদীতে দীর্ঘ ১৭ বছর পর অনুষ্ঠিত হয়েছে ঐতিহ্যবাহী নৌকাবাইচ। নদীর দুই পাড়ে মানুষের ঢল। কারও চোখ নদীর বুকে ছুটে চলা নৌকায়, কারও কণ্ঠে উচ্ছ্বাস। মুহূর্তেই ভেসে আসে বৈঠার ছন্দ। একের পর এক নৌকা ছুটছে গন্তব্যের দিকে। কে আগে পৌঁছাবে, তা নিয়ে মাঝিদের টানটান লড়াই। এমন দৃশ্য যেন ফিরিয়ে আনল হারিয়ে যাওয়া গ্রামবাংলার সেই চেনা ছবি।
শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর) বিকেলে উপজেলার প্রেম ঘাট এলাকায় সম্মিলিত নাগরিক সমাজের আয়োজনে এ নৌকাবাইচ অনুষ্ঠিত হয়।
প্রায় চার কিলোমিটার দীর্ঘ প্রতিযোগিতায় ছোট-বড় অন্তত ১২টি নৌকা অংশ নেয়। কিশোরগঞ্জের বিভিন্ন এলাকার পাশাপাশি বৃহত্তর সিলেট, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও নেত্রকোণা থেকেও প্রতিযোগীরা এতে অংশ নেন।
নৌকাবাইচ ঘিরে দুপুরের পর থেকেই নদীর দুই পাড়ে বাড়তে থাকে মানুষের ভিড়। শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে নারী-পুরুষ ও প্রবীণ, নানা বয়সি মানুষ নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে উপভোগ করেন প্রতিযোগিতা। নৌকা ছুটে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়তে থাকে দর্শকদের উচ্ছ্বাসও।
গ্রামবাংলার লোকজ সংস্কৃতির অন্যতম অনুষঙ্গ নৌকাবাইচ। বর্ষা মৌসুমে নদী ও হাওরের পানিতে একসময় নিয়মিত বসত এমন আয়োজন। বৈঠার তালে তালে মাঝিদের নৌকা চালানো, প্রতিযোগিতার উত্তেজনা আর নদীর দুই পাড়ের মানুষের উচ্ছ্বাসে মুখর হয়ে উঠত জনপদ।
তবে সময়ের সঙ্গে নানা কারণে হারিয়ে যেতে থাকে সেই ঐতিহ্য। আয়োজকদের ভাষ্য, হাওরের মানুষের ঐতিহ্যবাহী নৌকাবাইচ প্রায় ১৭ বছর ধরে বন্ধ ছিল। দীর্ঘ বিরতির পর আবারও নৌকাবাইচ আয়োজন করায় স্থানীয়দের মধ্যে তৈরি হয়েছে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা।
প্রতিযোগিতায় প্রথম স্থান অর্জন করে মোটরসাইকেল পুরস্কার পেয়েছে মোহরকোনা-কেশবপুর একতা সংঘের নৌকা। দ্বিতীয় স্থান অর্জন করে নাগার্সিহাটি অ্যাডভোকেট মানিক মিয়ার নৌকা পেয়েছে একটি ফ্রিজ। তৃতীয় স্থান অর্জনকারী ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নৌকা পেয়েছে এলইডি টিভি।
নৌকাবাইচ দেকতে আসা শাকিল মিয়া বলেন, ছোটোবেলায় নৌকাবাইচ দেখেছি। এরপর দীর্ঘদিন এমন আয়োজন চোখে পড়েনি। ১৭ বছর পর আবার ঘোড়াউত্রা নদীতে নৌকাবাইচ দেখে খুব ভালো লাগছে। নদীর দুই পাড়ে মানুষের যে উৎসাহ, তাতে মনে হচ্ছে আমাদের সেই পুরোনো ঐতিহ্য আবারও ফিরে এসেছে।
আরেক দর্শক কফিল উদ্দিন বলেন, নৌকাবাইচ শুধু আনন্দ বা প্রতিযোগিতা নয়, এটি আমাদের হাওর এলাকার সংস্কৃতির অংশ। এখনকার প্রজন্ম মোবাইল ফোন আর প্রযুক্তির মধ্যে বড় হচ্ছে। তাদের সামনে এ ধরনের আয়োজন হলে তারা আমাদের গ্রামবাংলার ঐতিহ্য সম্পর্কে জানতে পারবে। প্রতিবছর এমন আয়োজন হওয়া উচিত।
কিশোরগঞ্জ-৫ (নিকলী-বাজিতপুর) আসনের সংসদ সদস্য শেখ মজিবুর রহমান ইকবাল নৌকাবাইচে উপস্থিত ছিলেন। প্রতিযোগিতা শেষে তিনি বিজয়ীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেন।
এমপি শেখ মজিবুর রহমান বলেন, নৌকাবাইচ আমাদের গ্রামবাংলার প্রাচীন লোকজ ঐতিহ্যের একটি অংশ। দীর্ঘদিন পর নিকলীতে এই আয়োজন হওয়ায় স্থানীয় মানুষের মধ্যে যে উৎসাহ তৈরি হয়েছে, তা অত্যন্ত আনন্দের। এ ধরনের আয়োজনের মাধ্যমে নতুন প্রজন্ম আমাদের হারিয়ে যেতে বসা সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পাবে। ভবিষ্যতেও নৌকাবাইচসহ স্থানীয় ঐতিহ্যবাহী আয়োজনগুলোকে ধরে রাখতে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।
নিকলী নাগরিক সমাজের সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা অ্যাডভোকেট মানিক মিয়া বলেন, হাওরাঞ্চলের মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে নৌকা ও নৌকাবাইচের সম্পর্ক বহু পুরোনো। প্রায় ১৭ বছর ধরে এই আয়োজন বন্ধ থাকায় নতুন প্রজন্মের অনেকেই নৌকাবাইচের সেই ঐতিহ্যবাহী রূপ দেখার সুযোগ পায়নি। তাই নৌকাবাইচের আয়োজনের মধ্য দিয়ে পুরোনো ঐতিহ্যকে আবারও মানুষের সামনে তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, নৌকাবাইচকে ঘিরে স্থানীয় মানুষের মধ্যে যে উৎসবের আমেজ তৈরি হয়েছে, সেটিই আমাদের আয়োজনের বড় সার্থকতা। ভবিষ্যতে আরও বড় পরিসরে এমন আয়োজন করার চেষ্টা থাকবে।
দীর্ঘ ১৭ বছর পর ঘোড়াউত্রার বুকে বৈঠার ছন্দে যেন ফিরে এল হাওরের সেই পুরোনো দিন। নৌকার সঙ্গে ছুটল মানুষের চোখ, নদীর দুই পাড়ে ছড়িয়ে পড়ল উৎসবের আমেজ। নিকলীর এই আয়োজন মনে করিয়ে দিল, নৌকাবাইচ শুধু একটি প্রতিযোগিতা নয়, হাওরের মানুষের জীবন, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যেরই একটি অংশ।

