
স্যাটেলাইট চিত্রের তুলনামূলক বিশ্লেষণে ২০২২ সালের ২ নভেম্বর থেকে ২০২৬ সালের জানুয়ারির মধ্যে তিব্বতের রাওরাং-এ পরিবর্তন ও নতুন উন্নয়ন দেখা যায়। ছবিতে সম্ভাব্য সামরিক বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন কয়েকটি স্থানে কিছু নির্মাণকাজ দেখা যাচ্ছে, যার মধ্যে একটি অতিরিক্ত প্রশিক্ষণ এলাকাও রয়েছে।
ভারত-চীন সীমান্তে নতুন করে উত্তেজনার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। অরুণাচল প্রদেশের দুর্গম সীমান্তবর্তী গ্রামগুলোতে স্থানীয় বাসিন্দারা অভিযোগ করছেন, চীনা বাহিনীর অবকাঠামো নির্মাণ ও অগ্রসর হওয়ার কারণে তারা দীর্ঘদিনের ইয়াক চরানো, শিকার ও জীবিকার এলাকা থেকে সরে যেতে বাধ্য হচ্ছেন। স্যাটেলাইট চিত্রেও ওই অঞ্চলে নতুন সড়ক, ভবন ও হেলিপ্যাডসহ ব্যাপক নির্মাণকাজের প্রমাণ মিলেছে বলে জানিয়েছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য ইন্ডিপেনডেন্ট।
স্যাটেলাইট চিত্রে বর্ণনা দিয়ে সংবাদমাধ্যমটি দাবি করেছে, অরুণাচল প্রদেশের বিতর্কিত সীমান্তসংলগ্ন বিভিন্ন এলাকায় সাম্প্রতিক সময়ে বেশ কিছু নতুন স্থাপনা ও অবকাঠামো গড়ে ওঠার চিত্র পাওয়া গেছে। এসবের মধ্যে রয়েছে নতুন ভবন, সড়ক ও হেলিপ্যাড। দুর্গম হিমালয় অঞ্চলের ভূদৃশ্যে এসব পরিবর্তন দুই দেশের দীর্ঘদিনের সীমান্ত বিরোধকে নতুন করে সামনে এনেছে।
অরুণাচল প্রদেশকে চীন নিজেদের ভূখণ্ডের অংশ বলে দাবি করে। চীনের সরকারি ভাষ্যে অঞ্চলটিকে ‘জাংনান’ বা ‘দক্ষিণ তিব্বত’ বলা হয়। সীমান্ত থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরের একটি প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে দ্য ইন্ডিপেনডেন্টকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে স্থানীয় বাসিন্দা তাকোক ম্রা বলেন, পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে প্রয়োজন হলে তিনি চীনা বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করতেও প্রস্তুত।
তার ভাষ্য, চীনারা তাদের পূর্বপুরুষদের ব্যবহার করা জমিতে ঢুকে পড়ছে। ওই জমি থেকেই স্থানীয়রা খাবার সংগ্রহ ও জীবিকা নির্বাহ করেন। ম্রার দাবি, চীনা বাহিনী ভারতীয় ভূখণ্ডের অনেকটা ভেতর পর্যন্ত অগ্রসর হয়েছে। তবে ঠিক কতটা এলাকা তারা নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে, তা তিনি নির্দিষ্ট করে বলতে পারেননি।
এমন পরিস্থিতির মধ্যেই চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ভারত সফরে রয়েছেন। কয়েক বছরের মধ্যে এটিকে ভারতে চীনের অন্যতম বড় প্রতিনিধিদল হিসেবে দেখা হচ্ছে। সফর ঘিরে দুই দেশের সরকারই সীমান্ত পরিস্থিতিকে তুলনামূলকভাবে স্বাভাবিক হিসেবে তুলে ধরছে। তাদের বক্তব্য, ২০২০ সালে গালওয়ান সংঘর্ষে ২০ ভারতীয় সেনা নিহত হওয়ার পর যে-ধরনের সরাসরি সামরিক অচলাবস্থা তৈরি হয়েছিল, বর্তমানে তেমন পরিস্থিতি নেই।
তবে স্থানীয় বাসিন্দাদের বক্তব্য এবং স্যাটেলাইট চিত্রে ভিন্ন ধরনের পরিস্থিতির ইঙ্গিত মিলছে। এসব তথ্য অনুযায়ী, বিতর্কিত সীমান্ত এলাকায় চীনের অবকাঠামো সম্প্রসারণ অব্যাহত রয়েছে। সীমান্তে দুই দেশের পৃথক ভূখণ্ডগত দাবি এবং সেখানে সামরিক ও কূটনৈতিক পর্যায়ে চলমান আলোচনার মধ্যেই এসব নির্মাণকাজ হচ্ছে।
স্যাটেলাইট ছবি বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান ভ্যান্টর আপার সুবানসিরি উপত্যকার কয়েকটি এলাকায় সাম্প্রতিক পরিবর্তন শনাক্ত করেছে। এই উপত্যকার মধ্যেই তাকোক ম্রার গ্রাম গেলেমো অবস্থিত।
গ্লোবাল ওপেন-সোর্স ইন্টেলিজেন্স প্রতিষ্ঠান জেনসের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, সীমান্তের চীনা নিয়ন্ত্রণাধীন অংশে তিব্বতের লুনজে কাউন্টির উত্তরে ঝারি শহরের আশপাশের অন্তত দুটি এলাকায় উল্লেখযোগ্য নির্মাণ তৎপরতা দেখা গেছে।
জেনসের বিশ্লেষকেরা জানিয়েছেন, স্যাটেলাইট চিত্রে ওই এলাকাগুলোতে সাম্প্রতিক নির্মাণকাজের প্রমাণ স্পষ্ট। ভারত ও চীনের পৃথক ভূখণ্ডগত দাবির মানচিত্রের সঙ্গে ছবিগুলো মিলিয়ে দেখলে দেখা যায়, নির্মিত অবকাঠামোর কিছু অংশ দুই পক্ষের দাবিকৃত ভূখণ্ডের ওপর পড়ে, অর্থাৎ সেগুলো বিতর্কিত এলাকার মধ্যেই অবস্থান করছে।
ঝারি শহরের দক্ষিণে একটি এলাকায় ২০১৯ সালের শুরুতেই নির্মাণকাজের সূচনা হয়। একই বছরের আগস্টের মধ্যে সেখানে প্রথম দৃশ্যমান স্থাপনা দেখা যায়। এরপর কয়েক বছর ধরে এলাকাটিতে নির্মাণকাজ অব্যাহত রয়েছে।
স্যাটেলাইট ছবিতে সেখানে ভূমি সমতল করার কাজ, নির্মাণসামগ্রী পরিবহনের জন্য ব্যবহৃত যানবাহন এবং একটি সিমেন্ট প্ল্যান্ট স্থাপনের কার্যক্রম দেখা গেছে। জেনসের বিশ্লেষকেরা জানিয়েছেন, এসব অবকাঠামো সামরিক প্রয়োজনে ব্যবহার করা হবে কি না, তা নিশ্চিতভাবে বলা না গেলেও সে সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
ঝারি শহরের ভেতরে থাকা আরেকটি নির্মাণস্থল নিয়েও একই ধরনের সন্দেহ প্রকাশ করেছেন বিশ্লেষকেরা। তাদের মতে, সেটি সামরিক স্থাপনা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
এ ছাড়া ওই এলাকার একটি সড়ক সম্প্রতি প্রশস্ত করার পাশাপাশি এর ঢালও কমানো হয়েছে। এতে ভারী যানবাহন ও সামরিক সরঞ্জাম পরিবহন সহজ হয়। পাশাপাশি সারা বছর চলাচলের উপযোগী করতে সড়ক পাকা করার আগে সাধারণত এ ধরনের প্রস্তুতিমূলক কাজ করা হয়।
লুনজের দক্ষিণে স্যাটেলাইট চিত্রে আগে থাকা দুটি ছোট হেলিপ্যাডের জায়গায় একটি নতুন হেলিপ্যাড তৈরির প্রমাণ পাওয়া গেছে। এর আরও দক্ষিণে আরেকটি নতুন হেলিপ্যাড নির্মাণের চিত্রও দেখা গেছে।
ভ্যান্টরের ২০২৬ সালের আগস্টের সর্বশেষ স্যাটেলাইট ছবিতে অন্তত একটি ভবনের ছাদ নির্মাণের কাজ শেষ হওয়ার চিত্র পাওয়া গেছে। এতে বোঝা যায়, ওই এলাকায় নির্মাণকাজ এখনো চলছে। বিশ্লেষকদের ধারণা, স্থাপনাটি সামরিক কাজে ব্যবহারের জন্য তৈরি হতে পারে। তারা ভবনটির অবস্থান, নকশা, সামরিক কাজে ব্যবহৃত যানবাহনের উপস্থিতি এবং কাছাকাছি প্রশিক্ষণ এলাকার বিষয়গুলোকে এর পক্ষে সম্ভাব্য প্রমাণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
এদিকে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে মে মাসের মধ্যে ঝারি শহরের সঙ্গে সংযোগকারী নতুন একটি সড়কও নির্মাণ করা হয়েছে বলে স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণে উঠে এসেছে।
চীন-ভারত সম্পর্কের এমন স্পর্শকাতর সময়ে এসব তথ্য সামনে এলো। ২০২০ সালের গালওয়ান সংঘর্ষের পর শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর, প্রথমবারের মতো ভারত সফরে এসেছেন শি জিনপিং। ওই সংঘর্ষের পর দুই পারমাণবিক শক্তিধর দেশের সম্পর্ক কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় পৌঁছেছিল।
সীমান্তে পরিস্থিতি নিয়ে স্থানীয়দের উদ্বেগের মধ্যে দুটি স্বাধীন তথ্য অনুসন্ধানকারী দল সম্প্রতি গেলেমো ও তাসকিং এলাকায় যায়। পূর্ব হিমালয়ের দুর্গম ও উচ্চভূমির এসব গ্রাম ভারত-চীন সীমান্ত থেকে প্রায় ১৫ থেকে ২০ কিলোমিটার দূরে।
অল তাগিন স্টুডেন্টস ইউনিয়নের (এটিএসইউ) সভাপতি তাদাক পাকবার নেতৃত্বে আট সদস্যের একটি দল গেলেমো ও তাসকিং সফর করে। তারা স্থানীয় বাসিন্দা, আদিবাসী জনগোষ্ঠী এবং সেনাবাহিনীর মালবাহকদের সঙ্গে কথা বলে তথ্য সংগ্রহ করেন। সংগঠনটি অরুণাচল প্রদেশের তাগিন আদিবাসী জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব করে।
পাকবার দাবি, ওই এলাকায় চীনের কথিত অনুপ্রবেশের মাত্রা আগে কখনো এতটা দেখা যায়নি। তার ভাষায়, সীমান্তবর্তী গ্রামগুলোতে শুধু মানুষের মধ্যে আতঙ্কই তৈরি হয়নি, সরেজমিন পরিস্থিতিও সেই উদ্বেগকে সমর্থন করছে। তার দাবি, ভারতীয় সেনারা পিছিয়ে যাচ্ছে এবং চীনা সেনারা সামনে এগিয়ে আসছে।
১১ থেকে ১৩ আগস্ট পর্যন্ত তিন দিন এলাকায় অবস্থান করে পাকবা ও তার দল তথ্য সংগ্রহ করেন। তাদের দাবি, এমন কয়েকটি জায়গায় চীনা বাহিনীর উপস্থিতি দেখা গেছে, যেখানে সাধারণত ভারতীয় সেনাদের টহল থাকে।
এসব এলাকার মধ্যে রয়েছে স্থানীয়দের ঐতিহ্যবাহী শিকারের স্থান এবং ইয়াক চরানোর বিস্তীর্ণ জমি। বহু বছর ধরে ভারতীয় গ্রামবাসীরা এসব এলাকায় যাতায়াত করলেও বর্তমানে সেখানে তাদের প্রবেশে বাধা দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন পাকবা। এর ফলে স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক বাড়ছে এবং কেউ কেউ সীমান্তবর্তী এলাকা ছেড়ে অন্যত্র চলে যাচ্ছেন।
পাকবার দাবি, এই পরিবর্তন খুবই সাম্প্রতিক। তার মতে, চলতি বছরের জুন থেকেই পরিস্থিতিতে এমন পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে।
দ্য ইন্ডিপেনডেন্টের দেখা তথ্য অনুসন্ধানী প্রতিবেদনটি আপার সুবানসিরির ডেপুটি কমিশনার এবং মুখ্যমন্ত্রীর দপ্তরে জমা দেওয়া হয়েছে। এতে তাসকিং-গেলেমো সীমান্ত এলাকায় চীনের পিপলস লিবারেশন আর্মির (পিএলএ) উপস্থিতি ও কর্মকাণ্ডের বিষয়ে দ্রুত সরকারি হস্তক্ষেপের আহ্বান জানানো হয়েছে।
প্রতিবেদনটির সুপারিশ হলো, বিষয়টিকে কেবল স্থানীয় উন্নয়ন বা অবকাঠামোগত সমস্যা হিসেবে দেখলে হবে না; এর সঙ্গে জাতীয় নিরাপত্তা ও কৌশলগত স্বার্থ সরাসরি জড়িত। তাই বিষয়টিকে গুরুতর কৌশলগত ইস্যু হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
স্থানীয় আদিবাসী সংগঠন নাহ ওয়েলফেয়ার সোসাইটি (এনডব্লিউএস) প্রথম বিষয়টি সামনে আনে। সংগঠনটি নাহ জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব করে। কয়েক প্রজন্ম আগে তিব্বত থেকে এসে এই জনগোষ্ঠীর মানুষ আপার সুবানসিরি এলাকায় বসতি স্থাপন করেন।
এনডব্লিউএস আপার সুবানসিরির ডেপুটি কমিশনারের কাছে দেওয়া স্মারকলিপিতে অভিযোগ করেছে, স্থানীয়রা প্রজন্মের পর প্রজন্ম যেসব এলাকায় পশু চরানো, শিকার ও বনজ সম্পদ সংগ্রহ করে আসছেন, সেসব জায়গার কয়েকটিতে পিএলএ সড়ক, সেতু ও সামরিক ক্যাম্প নির্মাণ করছে।
স্মারকলিপিতে সংগঠনটি সতর্ক করে বলেছে, তাসকিং এলাকায় চীনা বাহিনীর বর্তমান কর্মকাণ্ডের গতি ও উদ্দেশ্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক। তাদের আশঙ্কা, এভাবে চলতে থাকলে স্থানীয় জনগোষ্ঠী ধীরে ধীরে নিজেদের ঐতিহ্যগত জমি হারাতে থাকবে।
উত্তরা /এএম

