
প্রকৌশলীর নাম আরিফুল ইসলাম জুয়েল। তার চাকরি জীবনের পুরোটাই বিতর্কে ভরা। দুর্নীতির প্রমাণ পাওয়ায় শাস্তি হিসাবে নির্বাহী প্রকৌশলী থেকে সহকারী প্রকৌশলী পদে পদাবনতি হয় তার। অনিয়মের অভিযোগে চার বছরের জন্য স্থগিত ছিল পদোন্নতি। কর্মস্থলে সময়মতো উপস্থিত না হওয়ায় অসংখ্যবার তাকে কারণ দর্শানো নোটিশ দেওয়া হয়েছে। তার তদবির বাণিজ্যে অতিষ্ঠ হয়ে কেন্দ্রে চিঠিও দিয়েছিলেন খুলনা মহানগর বিএনপির নেতারা।
আলোচিত এই প্রকৌশলী বিএনপি সমর্থিত প্রকৌশলীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ইঞ্জিনিয়ার্স বাংলাদেশের (অ্যাব) খুলনা জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক । তার কর্মজীবন শুরু খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে। পদোন্নতি পেয়ে নির্বাহী প্রকৌশলী, পদাবনতির পর ফের সহকারী প্রকৌশলী এবং অভ্যুত্থানের পর দলীয় প্রভাব খাটিয়ে পদোন্নতি পান উপ-প্রধান প্রকৌশলী হিসাবে।
এর মধ্যেই খুলনা ওয়াসার ২ হাজার ৫৯৮ কোটি টাকার পানি সরবরাহ প্রকল্প ফেজ-২ এর প্রকল্প পরিচালক (পিডি) নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু হয়।
অভিযোগ রয়েছে, এই প্রকল্পকে কেন্দ্র করেই ২৮ জুন ওয়াসার উপব্যবস্থাপনা পরিচালক পদে নিয়োগ পান তিনি। প্রকল্প পরিচালকের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের সরিয়ে দেন। ২ সেপ্টেম্বর ওই প্রকল্পের পরিচালকের দায়িত্ব পেয়েছেন জুয়েল।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক প্রকৌশলী জানান, জটিল প্রকৌশল জ্ঞানের এই কাজের কোনো অভিজ্ঞতা জুয়েলের নেই। কোন ক্ষমতাবলে তিনি এই দায়িত্ব পেয়েছেন তা নিয়ে ওয়াসাজুড়ে শুরু হয়েছে নানা আলোচনা-সমালোচনা।
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে জানা গেছে, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের (খুবি) তৃতীয় একাডেমিক ভবন নির্মাণের পরেই হাঁটাচলার সময় কম্পন সৃষ্টি হচ্ছিল। নতুন ভবনে এমন কম্পনের কারণ অনুসন্ধানে ২০১৬ সালের ৬ ডিসেম্বর তদন্ত কমিটি গঠন করে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। খুবি এবং খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুয়েট) প্রবীণ শিক্ষকদের নিয়ে গঠিত ওই কমিটি ছাদের ৪টি স্থানের স্ল্যাব কেটে বড় অনিয়ম দেখতে পান।
নমুনা পরীক্ষায় দেখা যায়, ছাদের নকশায় কংক্রিটের পুরুত্ব থাকার কথা ছিল সাড়ে ৫ ইঞ্চি। সেখানে কোথাও মাত্র ৩ ইঞ্চি, কোথাও মাত্র ৩ দশমিক ৭৫ ইঞ্চি রয়েছে। এতে স্থাপনা ও শিক্ষার্থীদের জীবন ঝুঁকিতে পড়েছে। তদন্তে উঠে আসে, তদারকির দায়িত্বে থাকা প্রকৌশলীরা অনিয়মে বাধা না দিয়ে উলটো ঠিকাদারের পক্ষে বিল ছাড়ের সুপারিশ করেন। কাজ শেষে সাড়ে ৫ ইঞ্চি কংক্রিট রয়েছে মর্মে পুরো অর্থ পরিশোধ করা হয়।
দুর্নীতিতে জড়িত থাকায় ওই সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী আরিফুল ইসলাম জুয়েলসহ বেশ কয়েকজনকে শাস্তি দেওয়া হয়। এর মধ্যে জুয়েলকে নির্বাহী প্রকৌশলী থেকে পদাবনতি দিয়ে সহকারী প্রকৌশলী এবং ৪ বছরের জন্য পদোন্নতি স্থগিত করা হয়।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, অ্যাবের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি ও বর্তমান রাজউক চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. রিয়াজুল ইসলামের আস্থাভাজন এই জুয়েল। বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান উপাচার্যসহ জ্যেষ্ঠ শিক্ষকদের অনেকেই অ্যাবের সদস্য। অভ্যুত্থানের পর তার বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয়ের শাস্তি বাতিল করান তিনি। ২০২৫ সালে তাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-প্রধান প্রকৌশলী হিসাবে পদোন্নতি দেওয়া হয়। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো কর্মকর্তাকে অন্য সংস্থায় প্রেষণে পাঠানোর ঘটনা ছিল এটাই প্রথম।
সূত্রটি জানায়, অভ্যুত্থানের পর বিএনপি ও অ্যাবের প্রভাব খাটিয়ে বিভিন্ন দপ্তরে খবরদারি শুরু করেন জুয়েল। দপ্তরগুলোতে বদলি ও পদায়নে হস্তক্ষেপের অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে। নানা অভিযোগে অতিষ্ঠ হয়ে ২০২৫ সালের ২৬ জুন অ্যাব সভাপতি ও আইইবির চেয়ারম্যান রিয়াজুল ইসলামকে চিঠি লেখেন খুলনা মহানগর বিএনপি সভাপতি এসএম শফিকুল আলম মনা ও সাধারণ সম্পাদক শফিকুল আলম তুহিন।
চিঠিতে তারা উল্লেখ করেন, ৭-৮ মাস ধরে একের পর এক অভিযোগ আসছে যে, দলের পদ ব্যবহার করে জুয়েল কুয়েটসহ বিভিন্ন প্রকৌশল দপ্তরে গিয়ে হুমকি-ধমকি, নিয়োগ পদোন্নতিতে অযাচিত হস্তক্ষেপ করছেন। বিভিন্ন অফিসে আর্থিক সুবিধার বিনিময়ে কাজ করে দেবেন বলে তদবির করছেন। এতে দলের সুনাম ক্ষুণ্ন হচ্ছে। ওই চিঠিতে তার সাধারণ সম্পাদক পদ বাতিলের সুপারিশ করা হয়।
অবশ্য আরিফুল ইসলাম জুয়েল সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। মুঠোফোনে তিনি বলেন, যেসব অভিযোগ উত্থাপন করা হয়েছে তার সবই ভুয়া। একজন আমার পেছনে লেগেছেন। আমার কাছে সব পেপার্স রয়েছে। বিএনপি চিঠি দিয়েছে মর্মে যে কথা প্রচার করা হয়েছে সেটি মিথ্যা। নগর বিএনপির সভাপতি মনা ভাই একাধিকবার অস্বীকার করেছেন। ফ্যাসিবাদ আমলে আমাকে পরিকল্পিতভাবে ফাঁসানোর চেষ্টা করা হয়েছে। ভবন নির্মাণে যে দুর্নীতির অভিযোগ তোলা হয়েছিল সে সময় আমি ভারতে চিকিৎসাধীন ছিলাম। পরে অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট মিটিংয়ে পূর্বের শাস্তি বাতিল করা হয়েছে। তিনি বলেন, বড় প্রকল্পের পিডি হতে অভিজ্ঞতার প্রয়োজন হয় না, যোগ্যতা থাকতে হয়। এজন্যই আমাকে মিনিস্ট্রি পিডি বানিয়েছে।
অসদাচরণে ভরা ছিল আগের কর্মস্থল : যোগ দেওয়ার পর থেকে সহকর্মীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার, কর্মস্থলে দেরি করে উপস্থিত হওয়াসহ বিভিন্ন অভিযোগে অসংখ্যবার তাকে কারণ দর্শানো নোটিশ দেওয়া হয়েছে। বিএনপি, আওয়ামী লীগ, অন্তর্বর্তীকালীন-তিন মেয়াদে একাধিকবার শোকজ পেয়েছেন তিনি। অভ্যুত্থানের পর আরও বেপরোয়া জীবনের অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিজিটাল হাজিরার ফিঙ্গার প্রিন্ট রেকর্ডে দেখা যায়, ২০২৫ সালের নভেম্বর থেকে পরবর্তী ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ৫৪ কর্মদিবসের মধ্যে তিনি ৫৪ দিনই দেরিতে অফিসে উপস্থিত হয়েছেন। ৩০ দিন তিনি আগে বের হয়েছেন। প্রতিদিন গড়ে মাত্র ২ দশমিক ৮৬ ঘণ্টা অফিস করেছেন। এ নিয়ে ৪ মার্চ তাকে আবার শোকজ করা হয়।
খুলনা ওয়াসায় যোগদানের পর তিনি নিয়মিত কার্যালয়ে যান না। উপব্যবস্থাপনা পরিচালকের হাজিরা খাতায় ও ফিঙ্গার প্রিন্ট দিতে হয় না বলে এর সত্যতা নিশ্চিত করা যায়নি।
সূত্রটি জানায়, ওয়াসার পানি সরবরাহ প্রকল্প পরিচালকের রুটিন দায়িত্বে ছিলেন নির্বাহী প্রকৌশলী রেজাউল ইসলাম। ২৬ এপ্রিল তাকে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। অভিযোগ রয়েছে, অ্যাবের কেন্দ্রীয় নেতাদের দিয়ে তদবির করিয়ে জুয়েলই এই কাজ করেন। ২৮ জুন ওয়াসায় যোগ দেওয়ার পর তিনি প্রকল্পটির পরিচালক হতে নানা তৎপরতা চালান। কিন্তু ২৯ জুলাই প্রকল্প পরিচালকের অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয় ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ফিরোজ শাহকে। এবার তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশ এবং মন্ত্রণালয়ে তদবির করে ফিরোজ শাহকে সরিয়ে দেন জুয়েল। এখন তিনিই প্রকল্পের দায়িত্ব নিয়েছেন।
খুলনা নাগরিক সমাজের সদস্য সচিব অ্যাডভোকেট বাবুল হাওলাদার বলেন, সুপেয় পানি সরবরাহের ব্যর্থতা, বিল ভোগান্তি ও সড়ক খোঁড়াখুঁড়িসহ সব মিলিয়ে ওয়াসা অথর্ব প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। এটিকে সচল করতে সৎ ও দক্ষ কর্মকর্তা দরকার। রাজনৈতিক বিবেচনায় দুর্নীতি-অনিয়ম প্রশ্রয় পেলে প্রতিষ্ঠানটির অবস্থা আরও নাজুক হবে।
ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফিরোজ শাহ বলেন, পিডি নিয়োগ মন্ত্রণালয়ের বিষয়। এখানে আমার কিছু বলার নেই।

