
চীনে একটি হাসপাতালে জন্মের পরপরই নার্সদের ভুলে অদলবদল হয়ে গিয়েছিলেন দুই কন্যাসন্তান। দীর্ঘ ৩৭ বছর পর প্রকাশ্যে এলো সেই সত্য। ভাগ্যের অদ্ভুত পরিহাসে দেখা গেছে, আসল পরিচয় না জেনেও তারা একে অপরের থেকে মাত্র চার কিলোমিটার দূরত্বের ব্যবধানে বড় হয়েছেন।
সাউথ চায়না মর্নিং পোস্টের বরাতে জানা যায়, এক নারী তার প্রকৃত জৈবিক পরিবারের সন্ধান করতে গিয়েই হাসপাতালের এই মারাত্মক ভুলটি সামনে নিয়ে আসেন।
১৯৮৯ সালের অক্টোবরে চীনের গুয়াংডং প্রদেশের কিংইয়ুয়ান পিপলস হাসপাতালে মাত্র ৫৫ মিনিটের ব্যবধানে জন্মগ্রহণ করেন হুয়াং শাওলিন ও লি হুই।
তখন ওই হাসপাতালের প্রসূতি বিভাগে শিশুদের জন্য কোনো পরিচয়সূচক রিস্টব্যান্ড ব্যবহার করা হতো না; কেবল কাপড়ের ওপর রাখা নামকার্ড দেখে শিশু সনাক্ত করা হতো।
জন্মের পর নার্সরা নবজাতকদের মায়েদের কাছে দেখিয়ে নার্সারিতে নিয়ে যান। একই রকম কাপড় পরিহিত অবস্থায় ঠিক কী পরিস্থিতিতে দুই শিশু অদলবদল হয়েছিল, তা আজও স্পষ্ট নয়।
হাসপাতালের এই ভুলের কারণে দুই নারীর জীবন সম্পূর্ণ ভিন্ন খাতে প্রবাহিত হয়। হুয়াং এক সরকারি কর্মকর্তা দম্পতির ঘরে স্বচ্ছল পরিবারে লালিত-পালিত হন।
তবে হুয়াং বড় হওয়ার পর তার রক্তের গ্রুপ এবং চেহারা বাবার সঙ্গে না মেলায় দত্তক বাবা তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে পরকীয়ার সন্দেহ করেন। এ কারণে হুয়াংয়ের বয়স যখন মাত্র পাঁচ বছর, তখন তার পালক বাবা-মায়ের বিচ্ছেদ ঘটে। পরবর্তী সময়ে মায়ের কাছেই বড় হন হুয়াং।
বাবার সঙ্গে সম্পর্কের অম্লতা ও মানসিক দূরত্ব ঘোচাতে ২০২২ সালে হুয়াং একটি ডিএনএ পরীক্ষা করান। সেই পরীক্ষার ফলেই প্রকাশ পায়, যাদের তিনি নিজের জন্মদাতা বাবা-মা জেনে এসেছেন, তাদের কারও সঙ্গেই তার কোনো জৈবিক সম্পর্ক নেই।
পরবর্তীতে পুলিশের সহায়তায় গত বছরের এপ্রিলে হুয়াং তার আসল জৈবিক পরিবারের সন্ধান পান এবং জানতে পারেন, হাসপাতালের সেই অদলবদলে দ্বিতীয় শিশুটি ছিল ‘লি হুই’।
অন্যদিকে, লি হুই বড় হয়েছেন একটি সাধারণ মুদি দোকান পরিচালনাকারী পরিবারে। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ার সময় তার পালক বাবা এক বিনিয়োগ জালিয়াতিতে নিঃস্ব হয়ে পড়লে পরিবারটি চরম অর্থকষ্টে পড়ে। বাধ্য হয়ে মাধ্যমিক স্কুলেই পড়ালেখা ছেড়ে দিয়ে লি ট্যুর গাইড, হোটেলের রিসেপশনিস্ট ও বিক্রয়কর্মী হিসেবে কাজ শুরু করেন। বছরের পর বছর কঠোর পরিশ্রম ও আর্থিক টানাটানিতে লি গুরুতর রক্তাল্পতা ও থাইরয়েডের সমস্যায় ভোগেন এবং তাকে অস্ত্রোপচারও করাতে হয়।
সম্প্রতি একটি ক্যাফেতে প্রথমবারের মতো সাক্ষাৎ করেন হুয়াং ও লি। উভয়েই এই প্রথম দেখাকে 'উত্তেজনাপূর্ণ ও কিছুটা অস্বস্তিকর' অভিজ্ঞতা হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
লি যখন জানতে পারেন যে, তিনি তার প্রকৃত জন্মদাতা বাবা-মায়ের থেকে মাত্র ৪ কিলোমিটার দূরে বসবাস করতেন, তখন তিনি নিজেকে ধরে রাখতে পারেননি।
তবে দুই নারীই স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, তারা যাদের কাছে বড় হয়েছেন, সেই পরিবারের সঙ্গেই সম্পর্ক বজায় রাখবেন।
লি জানান, তার পালক মায়ের কোনো পেনশন নেই এবং তিনি এখনো লির ওপরই নির্ভরশীল। অন্যদিকে হুয়াংয়ের পালক মা-ও অন্য পরিবারের শান্তিময় জীবনে বিঘ্ন ঘটাতে চান না।
দুই নারীই পরবর্তীতে হাসপাতালের কাছে তাদের জন্মসংক্রান্ত নথি চেয়ে আবেদন করেন। কিন্তু হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানায়, সেই সময়ের ফাইলগুলো আর খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। এছাড়া সেই ঘটনার সঙ্গে জড়িত কর্মচারীদের অনেকে অবসর নিয়েছেন এবং কয়েকজন মৃত্যুবরণ করেছেন।

