
উত্তরাঞ্চলের সীমান্তঘেঁষা জনপদগুলোতে নীরবে বিস্তার ঘটছে মানবপাচারের এক উদ্বেগজনক জাল। চাকরি, মোটা বেতন কিংবা বিদেশে উন্নত জীবনের স্বপ্ন দেখিয়ে তরুণদের টার্গেট করছে সংঘবদ্ধ চক্র। সেই স্বপ্নের টানে সীমান্ত পেরিয়ে যাওয়া অনেকেরই ঠিকানা হচ্ছে ভারতের কারাগার।
জানা গেছে, বগুড়া, নাটোর, জয়পুরহাট, নওগাঁ ও গাইবান্ধাসহ উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন জেলা এখন মানবপাচারকারীদের অন্যতম রুট। সম্প্রতি ১৭ মাস কারাভোগ শেষে দেশে ফেরা ৩৬ বাংলাদেশির ঘটনা আবারও সামনে এনেছে পাচারকারীদের সক্রিয় নেটওয়ার্ক, তাদের কৌশল এবং উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন জেলায় ছড়িয়ে থাকা এই ভয়ংকর বাস্তবতা।
ভুক্তভোগীদের বর্ণনা, মানবপাচার মামলার তথ্য ও মাঠপর্যায়ে দেখা গেছে, উত্তরাঞ্চলের একাধিক সীমান্ত রুট এখনো মানবপাচারের জন্য ব্যবহৃত হচ্ছে। দিনাজপুরের হিলি সীমান্ত, ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট, যশোরের বেনাপোল, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও নওগাঁ সংলগ্ন সীমান্ত এলাকা এবং বিভিন্ন অরক্ষিত পয়েন্ট ব্যবহার করে লোকজনকে ভারতে নেওয়া হচ্ছে।
স্থানীয় দালালরা প্রথমে গ্রামের বেকার যুবকদের সংগ্রহ করে। পরে কয়েক ধাপে সীমান্তবর্তী এলাকায় নিয়ে যাওয়া হয়। রাত গভীর হলে কাঁটাতারের বেড়া পার করে দেওয়া হয়। ওপারে আগে থেকেই অপেক্ষা করে ভারতীয় এজেন্টরা। এরপর বাস বা ট্রেনে তাদের পাঠানো হয় চেন্নাই, কেরালা, কর্ণাটক, দিল্লি কিংবা হরিয়ানার মতো দূরবর্তী অঞ্চলে।
একজন ভুক্তভোগী জানান, সীমান্ত পার হওয়ার পর তাদের আর কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকে না। কে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে, সেটাও জানানো হয় না। অথচ অনেককে ভুটান বা অন্য দেশে চাকরির কথা বলে ভারতে নিয়ে যাওয়া হয়।
নন্দীগ্রামের ভুক্তভোগী আতিকুল ইসলামকে বলা হয়েছিল ভুটানে চাকরি হবে। এজন্য দালালদের প্রায় ২৪ হাজার টাকা দেন তিনি।
আতিকুল বলেন, আমাকে বলা হয়েছিল ভারত হয়ে ভুটানে নিয়ে যাবে। সীমান্ত পার হওয়ার পর কয়েক দিন বিভিন্ন জায়গায় ঘুরিয়ে শেষ পর্যন্ত চেন্নাইয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। তখন বুঝতে পারি প্রতারণার শিকার হয়েছি।
তিনি আরও বলেন, চেন্নাই সেন্ট্রাল কারাগারে প্রথমে মামলার শুনানি শেষ হতে কয়েক মাস লেগেছে। পরে সাজা ভোগের পরও ডিটেনশন ক্যাম্পে থাকতে হয়েছে।
বগুড়ার নন্দীগ্রামের যুবক আব্দুল মোমিন। ভারতের কারাগার ও ডিটেনশন ক্যাম্পে কাটিয়েছেন ১৭ মাস। তিনি বলেন, যদি জানতাম এমন হবে, কোনোদিন সীমান্ত পার হতাম না। ভাগ্য বদলের আশায় ১০ হাজার টাকা দিয়ে অবৈধভাবে ভারতে গিয়েছিলাম। কয়েক বছর কাজও করেছি। কিন্তু একদিন ভোরে পুলিশের অভিযানে গ্রেফতার হই।
ফিরে আসা ব্যক্তিদের বর্ণনায় উঠে এসেছে আরও ভয়াবহ তথ্য। রানা আহমেদ নামে আরেকজন ভুক্তভোগী বলেন, কারাগারে গিয়ে দেখি শুধু আমরা না, আরও অনেক বাংলাদেশি আছে। নারী, পুরুষ, শিশু সবাই। কেউ দুই বছর, কেউ পাঁচ বছর ধরে আটকে আছে।
তার দাবি, চেন্নাইয়ের কারাগার ও ডিটেনশন ক্যাম্পে কয়েকশ বাংলাদেশি আছে। ভাষা না জানার কারণে অনেকেই নিজেদের আইনি সহায়তা বা সমস্যার কথা ঠিকমতো জানাতে পারেননি।
সাম্প্রতিক সময়ে ভারতজুড়ে অবৈধ অভিবাসীদের বিরুদ্ধে অভিযান জোরদার হয়েছে। বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে দেখা গেছে, পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন হোল্ডিং সেন্টারেই কয়েকশ সন্দেহভাজন বাংলাদেশি আটক রয়েছেন। ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে আটক আরও হাজারো বাংলাদেশির পরিচয় যাচাই ও প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া চলছে।
মানবাধিকারকর্মীদের মতে, এসব বন্দির বড় অংশই পাচারকারী চক্রের মাধ্যমে অবৈধভাবে সীমান্ত পার হয়েছিল।
বিজ্ঞাপন
নন্দীগ্রাম উপজেলার কহুলী, কাথম, ভাটগ্রাম, টেকরি, সিংড়াপাড়া ও দোহার গ্রাম ঘুরে স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত কয়েক বছরে এসব এলাকা থেকে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক যুবক ভারতে গেছেন। অধিকাংশই কৃষিশ্রমিক বা নিম্ন আয়ের পরিবারের সদস্য। বিদেশে ভালো আয়ের স্বপ্ন দেখিয়ে তাদের টার্গেট করা হয়।
নন্দীগ্রামের কয়েকটি গ্রাম থেকে বিগত পাঁচ বছরে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক যুবক অবৈধভাবে ভারতে গেছেন।
স্থানীয়দের দাবি, এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে কিছু ব্যক্তি বিদেশে কাজের ব্যবস্থা করার কথা বলে যুবকদের সংগ্রহ করে। এদের মধ্যে কাদের মোল্লা ও হাফিজ নামে পরিচয় দেওয়া দালালদের এখন আর এলাকায় দেখা যাচ্ছে না। তারা দুই মাসের বেশি এলাকায় থাকে না।
স্থানীয় মানবাধিকারকর্মী আবেদ হোসেন বলেন, পাচারকারীরা প্রথমে বিশ্বাস অর্জন করে। গ্রামের পরিচিত কাউকে ব্যবহার করে। একবার রাজি হলে ভুক্তভোগীকে ধাপে ধাপে সীমান্তে নিয়ে যাওয়া হয়। দারিদ্র্য, বেকারত্ব এবং দ্রুত অর্থ উপার্জনের আকাঙ্ক্ষাকেই পুঁজি করছে এসব চক্র।
হিলি সীমান্তসংলগ্ন এক ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, এখন কড়াকড়ি বেড়েছে। কিন্তু লোক পারাপারের কাজ বন্ধ হয়নি। শুধু খরচ বেড়েছে।
জানা গেছে, হালুয়াঘাট সীমান্তের কড়ইতলী ও গাবরাখালী এলাকা ব্যবহার করে একটি সংঘবদ্ধ চক্র দীর্ঘদিন ধরে অবৈধ পারাপার পরিচালনা করছে। সেখানে ফিলিপ পাল এই চক্রের প্রধান হোতা। হিলি সীমান্তে কুশ বর্মন, মিজানুর রহমান ও গৌতম মন্ডলের নাম রয়েছে পুলিশের খাতায়। তাদের বিরুদ্ধে সীমান্ত পারাপার, আশ্রয়ের ব্যবস্থা এবং ভুয়া পরিচয়পত্র সংগ্রহে সহায়তার অভিযোগ রয়েছে।
অন্যদিকে বেনাপোল সীমান্তের পুটখালী, গাতিপাড়া ও দৌলতপুর রুট ঘিরে অন্তত এক ডজন ছোট-বড় দালাল চক্র সক্রিয় থাকার তথ্য রয়েছে মানবাধিকার সংস্থা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে।
জাস্টিস অ্যান্ড কেয়ার এবং রাইটস যশোরের মতো স্থানীয় বেসরকারি সংস্থা ও ইমিগ্রেশন পুলিশের তথ্য মতে, বেনাপোল সীমান্তে অন্তত ১২টি ছোট-বড় দালাল চক্র বা ‘লাইনম্যান’ সক্রিয় রয়েছে। এরা মূলত নড়াইল, সাতক্ষীরা, খুলনা এবং যশোর অঞ্চল টার্গেট করে কাজ করে। মাঝে মাঝে অন্য জেলার মানুষকে পারাপার করে তারাই।

