
অর্থনীতিকে বাঁচাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির বিকল্প নেই মন্তব্য করে আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ব্যাংকিং খাত ও পুঁজিবাজারে আর্থিক অনিয়ম, তথ্য গোপন এবং ভুয়া তথ্য উপস্থাপনের ফলে অনেক কোম্পানি ভুয়া তথ্য দিয়ে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয়েছে, অথচ ভালো ও প্রকৃত কোম্পানিগুলো প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়েছে।
আজ বুধবার রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে ফিন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিল (এফআরসি) আয়োজিত ‘ট্রাস্টওয়ার্দি ফিন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং: হোয়াট রিয়েলি ম্যাটারস’ শীর্ষক এফএআর সামিটে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এ কথা বলেন তিনি।
অর্থমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতি বিগত বছরগুলোতে এক কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে গেছে, যেখানে প্রায় প্রতিটি প্রতিষ্ঠানই অকার্যকর হয়ে পড়েছিল। ফলে আর্থিক খাতে বিশৃঙ্খলা তৈরি এবং দুর্বল কোম্পানিগুলো মিথ্যা রিপোর্টিংয়ের মাধ্যমে বাজারে প্রবেশের সুযোগ পায়।
অর্থমন্ত্রী বলেন, আর্থিক প্রতিবেদন, অডিট ও কোম্পানির প্রকৃত আর্থিক চিত্র তুলে ধরা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু দেশের অডিটিং ও রিপোর্টিং ইকোসিস্টেম প্রায় ভেঙে পড়েছে। ফলে ব্যাংক থেকে অর্থপাচার, মিথ্যা তথ্য দিয়ে ঋণ নেওয়া এবং পুঁজিবাজারে ভুয়া কোম্পানির তালিকাভুক্তির মতো ঘটনা ঘটেছে।
তিনি বলেন, যেসব কোম্পানি ফলস রিপ্রেজেন্টেশন করে স্টক মার্কেটে এসেছে, তারাই অনেক ক্ষেত্রে বড় কোম্পানিতে পরিণত হয়েছে। এতে ভালো ও স্বচ্ছ কোম্পানিগুলো বাজারে আসতে নিরুৎসাহিত হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, বর্তমানে দেশের বেসরকারি খাতে বড় ধরনের মূলধন ঘাটতি রয়েছে। অনেক সফল কোম্পানি এবং একাধিক ব্যাংকও গুরুতর ক্যাপিটাল ডেফিসিটে ভুগছে। এর পেছনে খেলাপি ঋণ, অর্থপাচার এবং বোর্ড ও ব্যবস্থাপনার যোগসাজশে অর্থ আত্মসাতের ঘটনা দায়ী।
ব্যাংক মালিকানার ধারণা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, ব্যাংকের প্রকৃত মালিক শেয়ারহোল্ডার ও আমানতকারীরা। কেউ ব্যক্তিগতভাবে ব্যাংকের মালিক দাবি করে বোর্ডে বসে নিজেরাই ঋণ অনুমোদন করবে—এটা সঠিক নয়।
তিনি বলেন, বর্তমান সরকার এমন একটি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে চায়, যেখানে পূর্ণ স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি থাকবে। এজন্য আইসিএবি ও আইসিএমএবির সদস্যদের নিজেদের পেশাগত জায়গা থেকে আত্মনিয়ন্ত্রণ (সেলফ রেগুলেশন) নিশ্চিত করতে হবে।
তিনি বলেন, এফআরসি শুধু ওভারসাইট করতে পারে। কিন্তু সঠিক রিপোর্টিং ও অডিটের দায়িত্ব শুরু হতে হবে আপনাদের ভেতর থেকেই।
বিদেশি বিনিয়োগ প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রী বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশে বড় বড় আন্তর্জাতিক ফান্ড ম্যানেজার ও বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান আগ্রহ দেখাচ্ছে। জেপি মরগ্যানসহ বিভিন্ন বৈশ্বিক বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে আসতে চায়।
তিনি বলেন, প্রতিদিনই আমি আন্তর্জাতিক ফান্ড ম্যানেজারদের সঙ্গে বৈঠক করছি। তারা বাংলাদেশকে নিয়ে বিলিয়ন ডলারের ফান্ড গঠনের কথা বলছে।
অর্থমন্ত্রী অডিটরদের সতর্ক করে বলেন, বিদেশি বিনিয়োগ আনতে হলে কোম্পানির ব্যালেন্স শিট, অডিট রিপোর্ট ও আর্থিক প্রতিবেদনের ওপর বিনিয়োগকারীদের আস্থা তৈরি করতে হবে। সরকার পুঁজিবাজার, আর্থিক খাত ও এনবিআরসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বড় ধরনের ডিরেগুলেশনের পরিকল্পনা করছে। তবে সেটি সফল করতে পেশাজীবীদের সহযোগিতা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, ডিরেগুলেশন করলাম, কিন্তু রিপোর্টিং ঠিক না থাকলে কোনো লাভ হবে না। দেশের অর্থনীতি বাস্তব অর্থে বড় হলে সবাই লাভবান হবে। তাই আমাদের সবাইকে মিলেই গ্লোবাল বেস্ট প্র্যাকটিস অনুসরণ করে কাজ করতে হবে।
অর্থ সচিব ড. মো. খায়েরুজ্জামান মজুমদারের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন এফআরসি চেয়ারম্যান ড. মো. সাজ্জাদ হোসেন ভূইয়া। এতে আরও বক্তব্য রাখেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর এবং বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বাবু প্রমুখ।

