
বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমিতে আয়োজিত ২৩তম নবীন শিল্পী প্রদর্শনী ২০২২-এ দর্শকদের দৃষ্টি কাড়ে তরুণ শিল্পী মিলন কুমার দাসের ভাস্কর্য ‘দুর্দম’। বাংলাদেশের শিল্পভুবনে এটি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, কারণ এটিই দেশের প্রথম পূর্ণাঙ্গ টায়ার-নির্মিত ভাস্কর্য। শুধু উপকরণের দিক থেকেই নয়, এর ভাবনা ও প্রতীকী রূপও সমানভাবে আলোচনায় এসেছে।
প্রায় ৮ ফুট উচ্চতার এই মানবাকৃতি গড়ে উঠেছে টায়ার কেটে বুননের মাধ্যমে। মাথা নত অবস্থায় দাঁড়িয়ে থাকা অবয়বটির ভেতর লুকিয়ে আছে ইতিহাসের দীর্ঘ পথচলা। শোষণ, প্রতিবাদ ও পুনর্জাগরণের গল্প যেন এই অবয়বের শরীরে ফুটে উঠেছে। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের দমননীতি, বাঙালির জাতিগত চেতনার উন্মেষ এবং স্বাধীনতার সংগ্রাম—সবই এখানে প্রতীকীভাবে মিশে গেছে। শিল্পকর্মটির ভঙ্গি যেন বলে, “হার মানিনি, ভেঙে পড়িনি।”
মাথা নুয়ে থাকলেও অবয়বটি স্থির ও দৃঢ়। এই দৃশ্যমান প্রতীকটির ভেতরেই নিহিত আছে বাঙালির অদম্য মানসিকতা। প্রতিকূল পরিস্থিতিতে সংগ্রামের সাহস, আত্মমর্যাদা ও টিকে থাকার শক্তি—সবকিছুরই রূপক হয়ে উঠেছে ‘দুর্দম’। দর্শকরা শিল্পকর্মটির সামনে দাঁড়িয়ে যেন নিজেদের ইতিহাস, সংগ্রাম ও আত্মপরিচয়ের সাথে নতুনভাবে মুখোমুখি হন।
বিশেষজ্ঞরা জানান, ‘দুর্দম’ কেবল একটি ভাস্কর্য নয়; এটি ইতিহাস, পরিবেশ ও আত্মপরিচয়ের প্রতি এক শিল্পিত শ্রদ্ধাঞ্জলি। দর্শকের চোখে এটি হয়ে উঠেছে সংগ্রাম ও আত্মমর্যাদার এক নীরব প্রতীক। শিল্পকর্মটির বুননে যেমন দৃঢ়তা রয়েছে, তেমনি এর ভাবনায়ও রয়েছে টিকে থাকার শক্তি।
বাংলাদেশের ভাস্কর্যশিল্পে ‘দুর্দম’ নিঃসন্দেহে এক নতুন দৃষ্টান্ত। এর মাধ্যমে শিল্পী মিলন কুমার দাস শুধু একটি শিল্পকর্মই তৈরি করেননি, বরং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সামনে রেখে গেছেন পরিবেশবান্ধব শিল্পচিন্তা ও আত্মপরিচয়ের প্রতীকী বার্তা।
শিল্পী মিলন কুমার দাস জানান, পরিবেশের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর টায়ারকে নতুনভাবে ব্যবহার করার মধ্য দিয়ে তিনি এক অভিনব শিল্পচিন্তার দিক উন্মোচন করতে চেয়েছেন। শিল্পের উপকরণ কেবল কাঠ, পাথর বা ধাতবেই সীমাবদ্ধ নয়—বর্জ্য উপকরণও শিল্প হয়ে উঠতে পারে। এভাবেই শিল্পকলা পরিবেশ সচেতনতা তৈরির একটি কার্যকর মাধ্যম হতে পারে বলে মনে করেন তিনি।

