উত্তরা প্রতিদিন
ঢাকা

অফিস সহকারীর বেতন লাখ টাকা—মনিপুর স্কুলে সাড়ে ৫০০ কোটির অনিয়ম

১৫০ শিক্ষক-কর্মচারীর নিয়োগ অবৈধ
উত্তরা ডেস্ক ১২ মে ২০২৬, ১২:৪২ অপরাহ্ণ
অফিস সহকারীর বেতন লাখ টাকা—মনিপুর স্কুলে সাড়ে ৫০০ কোটির অনিয়ম

রাজধানীর অন্যতম বৃহৎ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান মনিপুর উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজ। প্রতিষ্ঠানটির ছয়টি শাখায় বর্তমানে ৩৭ হাজারের বেশি শিক্ষার্থী পড়ালেখা করছেন। এ প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী দেশের উন্নয়নে ভূমিকা রাখলেও বিগত সময়ে প্রতিষ্ঠানটির কর্তাব্যক্তিরা প্রায় সাড়ে ৫০০ কোটি টাকার অনিয়ম করেছেন। শুধু তাই নয়; প্রতিষ্ঠানটির অফিস সহকারীরা প্রায় লাখ টাকা বেতন পান। উচ্চ বেতন নেন শিক্ষকরাও।

সম্প্রতি মনিপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের নানা অনিয়ম নিয়ে তদন্ত করেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তর (ডিআইএ)। তদন্তে ভয়াবহ আর্থিক অনিয়ম, অবৈধ নিয়োগ ও বিধিবহির্ভূত ভাতা প্রদানের প্রমাণ পেয়েছে সংস্থাটি।

২০১০ সাল থেকে ২০২৫ পর্যন্ত মনিপুর উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজের ছয়টি শাখার কেনাকাটা, বেতন-ভাতা, উন্নয়ন ব্যয়, বিল্ডিং নির্মাণ, শিক্ষক-কর্মচারী ও কর্মকর্তা নিয়োগ, ঋণ জটিলতা, কর ফাঁকিসহ নানা অনিয়ম হয়েছে প্রতিষ্ঠানটিতে। এসব অনিয়ম রোধে প্রতিষ্ঠানটির ছয়টি শাখা ক্যাম্পাসকে ছয়টি স্কুলে রূপান্তরের সুপারিশ করতে পারে ডিআইএ।

এ বিষয়ে ডিআইএ পরিচালক অধ্যাপক এম. এম সহিদুল ইসলাম গণমাধ্যমকে বলেন, ‘মনিপুর উচ্চবিদ্যালয় ও কলেজের আর্থিক অনিয়মের প্রতিবেদনটি শিগগিরই শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া হবে। তারাই এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে। এ ছাড়া এই প্রতিবেদনের কপি মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক, বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরেও পাঠানো হবে।’

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২০১০ সাল থেকে ২০২৫ পর্যন্ত মনিপুর উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজের ছয়টি শাখার কেনাকাটা, বেতন-ভাতা, উন্নয়ন ব্যয়, বিল্ডিং নির্মাণ, শিক্ষক-কর্মচারী ও কর্মকর্তা নিয়োগ, ঋণ জটিলতা, কর ফাঁকিসহ নানা অনিয়ম হয়েছে প্রতিষ্ঠানটিতে। এসব অনিয়ম রোধে প্রতিষ্ঠানটির ছয়টি শাখা ক্যাম্পাসকে ছয়টি স্কুলে রূপান্তরের সুপারিশ করতে পারে ডিআইএ।

ডিআইএ সূত্র জানিয়েছে, মনিপুর উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজের ছয়টি শাখা ক্যাম্পাস রয়েছে। এগুলো হলো- মনিপুর এলাকায় বালক ও বালিকাদের জন্য পৃথক ক্যাম্পাস রয়েছে। এর বাইরে শেওড়াপাড়া, ইব্রাহীমপুর ও রূপনগরে শাখা রয়েছে। আর রূপনগরে আলাদাভাবে করা হয়েছে কলেজ ক্যাম্পাস। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৩৭ হাজারের ওপরে।

প্রতি বছরের শুরুতে জানুয়ারি মাসের টিউশন ফি, ভর্তি ও সেশনচার্জ বাবদ প্রতিষ্ঠানটিতে এককালীন আয় হয় প্রায় ৪০ কোটি টাকা। এর বাইরে প্রতি মাসে টিউশন ফি বাবদ ওঠে প্রায় ৭ কোটি টাকা। সেই হিসাবে প্রতি বছর প্রতিষ্ঠানটির আয় প্রায় ১২০ কোটি টাকা।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, মনিপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের ছয়টি ক্যাম্পাসের মধ্যে চারটিরই সরকারি অনুমোদন নেই। অথচ বছরের পর বছর এই শাখা ক্যাম্পাসগুলোতে শিক্ষার্থী ভর্তি, ক্লাস কার্যক্রম পরিচালনা এবং টিউশন ফি আদায় করা হচ্ছে। বিধি লঙ্ঘন করে এসব ক্যাম্পাসে প্রায় দেড় শতাধিক শিক্ষক-কর্মচারী ও কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এসব শিক্ষক-কর্মচারী ও কর্মকর্তাদের বেত-ভাতা পরিশোধে বিপুল পরিমাণ আর্থিক ক্ষতি হয়েছে।

মনিপুর উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজের অনিয়মগুলোর মধ্যে সবেচেয়ে বেশি আলোচিত হচ্ছে কর্মচারীদের অস্বাভাবিক বেতন কাঠামোর বিষয়টি। বিদ্যালয়টির পিয়ন পদে কর্মরতদের মাসিক বেতন দেওয়া হচ্ছে ৫৭ হাজার টাকা করে। আর অফিস সহকারীদের মাসিক বেতন ৯৫ হাজার টাকা পর্যন্ত। এছাড়া প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষকরা মাসে প্রায় এক লাখ ৩০ হাজার টাকা করে বেতন পান।

অথচ এমপিওভুক্ত সহকারী শিক্ষকদের মাসিক বেতন সবমিলিয়ে ১৫ থেকে ১৬ হাজার টাকা। এমপিও নীতিমালার সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষক-কর্মচারী ও কর্মকর্তাদের বেতন কাঠামোর ব্যাপক অসঙ্গতি রয়েছে বলে জানিয়েছে ডিআইএ।

ডিআইএ সূত্র জানিয়েছে, মনিপুর উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজে কর্মরত শিক্ষক-কর্মচারী ও কর্মকর্তাদের অ্যাকাডেমিক উন্নয়ন ভাতা ও নগর ভাতা দেওয়া হয়। এ খাতে প্রতিষ্ঠানটির বিপুল অঙ্কের অর্থ ব্যয় হয়, যা দেওয়ার নিয়ম নেই। তদন্ত দল জানিয়েছে, বিধি বহির্ভূতভাবে এ দুই খাতে প্রায় ৮৮ কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে অ্যাকাডেমিক উন্নয়ন ভাতায় ৬৩ কোটি ৪৮ লাখ টাকা এবং নগর ভাতা খাতে ২৪ কোটি ৩৬ লাখ টাকা দেওয়া হয়েছে। এই অর্থ ফেরত এনে প্রতিষ্ঠানটির তহবিলে জমার সুপারিশ করতে যাচ্ছে ডিআইএ।

সূত্র বলছে, মনিপুর উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজের নামে ২৩০ কোটি টাকার ব্যাংক ঋণ নেওয়া হয়েছে। তবে সেই অর্থ কী কারণে নেওয়া হয়েছে বা কোন কোন খাতে ব্যয় করা হয়েছে তার পূর্ণাঙ্গ হিসাব দিতে পারেনি বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। প্রতিষ্ঠানটির হোস্টেল ও ক্যাম্পাস নির্মাণের নামে প্রায় ৫০ কোটি টাকার জমি কেনার তথ্য থাকলেও জমির রেজিস্ট্রি সম্পন্ন হয়নি। এর ফলে ভবিষ্যতে এই জমির মালিকানা নিয়ে সমস্যার সৃষ্টি হতে পারে বলে জানিয়েছে সূত্রটি।

পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের তদন্তে মনিপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের ভবন নির্মাণ ও বিভিন্ন সরঞ্জাম কেনার ক্ষেত্রেও অনিয়ম হয়েছে। নিময় লঙ্ঘন করে সরঞ্জাম ক্রয়ের ক্ষেত্রে কোনো উন্মুক্ত দরপত্র আহবান করেনি বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। এর পরিবর্তে পছন্দের প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়া হয়েছে। সরকারি ক্রয়বিধি লঙ্ঘনের পাশাপাশি ৫০ কোটি টাকার আয়কর ফাঁকি দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।

শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা বলছেন, একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এত বড় অনিয়ম হলেও বছরের পর বছর এর বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এর ফলে অবৈধ নিয়োগ ও অনুমোদনহীন ক্যাম্পাসের সংখ্যা বেড়েছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আর্থিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত না হলে পুরো শিক্ষা খাতের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। বিশেষ করে দেশের অন্যততম বৃহৎ বিদ্যালয়ে এমন অনিয়মের ফলে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে আস্থায় বড় ধাক্কা দিতে পারে। দ্রুত এ বিষয়ে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া দরকার।

কিছু হলেই আমরা বলি শিক্ষায় বাজেট নেই, অথচ একটি প্রতিষ্ঠান বছরে শত কোটি টাকার বেশি আয় করছে জানিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মোহাম্মদ মজিবর রহমান গণমাধ্যমকে বলেন, শিক্ষায় দুর্নীতি বন্ধ করতে হলে একটি শ্বেতপত্র প্রকাশ করতে হবে। এটি হলে শিক্ষার কোন খাতে কত অনিয়ম হয়েছে তা বের হয়ে আসবে। ফলে সেক্টর অনুয়ায়ী দুর্নীতি রোধ করা সম্ভব হবে। পাশাপাশি শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং এর বিভিন্ন দপ্তরের দুর্নীতিও বন্ধ করতে হবে।’

এ শিক্ষাবিদ আরও বলেন, ‘যেহেতু দুর্নীতি হচ্ছে এবং তদন্তের পরও ব্যবস্থা নেওয়া যাচ্ছে না, সেহেতু বিষয়গুলো তদারকি করার জন্য একটি দুর্নীতি বিরোধী সেল গঠন করা যেতে পারে। এই সেল সেন্ট্রাল এবং বিভাগীয় পর্যায়ে থাকতে পারে। সেলের সদস্যরা সবকিছু মনিটর করবে। কোথায় অনিয়ম হচ্ছে, সেগুলো খুঁজে বের করে রিপোর্ট জমা দেবে। এটি করা গেলে শিক্ষায় দুর্নীতি রোধ করা সম্ভব হবে।’

 

Read more — শিক্ষা
Home