
জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন সংস্থার মূল্যায়ন বলছে, ২০২৬ সালে বৈশ্বিক বাণিজ্য প্রবৃদ্ধি কমে ১ দশমিক ৫ শতাংশ পর্যন্ত নেমে আসতে পারে। প্রতীকী ছবি
মধ্যপ্রাচ্য ও উপসাগরীয় অঞ্চলে ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের চলমান যুদ্ধের প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়তে শুরু করেছে বৈশ্বিক বাণিজ্যে। জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন সংস্থা ইউএনসিটিএডি সতর্ক করে বলেছে, এর প্রভাবে ২০২৬ সালে বৈশ্বিক পণ্য বাণিজ্যের প্রবৃদ্ধিতে ধস নামতে পারে। ২০২৫ সালে এ প্রবৃদ্ধি ছিল ৪ দশমিক ৭ শতাংশ, যা এক বছরের ব্যবধানে কমে ২ দশমিক ৫ শতাংশ, এবং এমনকি ১ দশমিক ৫ শতাংশেও নেমে আসতে পারে।
ইউএনসিটিএডির এক মূল্যায়ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এ ধাক্কা তৈরি হয়েছে, যার প্রভাব জ্বালানি খাত ছাড়িয়ে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে ছড়িয়ে পড়ছে।
জাতিসংঘের এ বাণিজ্য সংস্থার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হরমুজ প্রণালি কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। অথচ এটি বৈশ্বিক জ্বালানি পরিবহনের অন্যতম প্রধান রুট। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন বাণিজ্য সংস্থার তথ্য, হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ অপরিশোধিত তেল পরিবাহিত হয়। এসব জ্বালানির প্রধান গন্তব্য এশিয়ার দেশগুলো হলেও এর প্রভাব বিশ্ব জুড়েই পড়েছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে হামলা শুরুর পর থেকেই ইরান এই নৌ রুটকে নিজেদের কৌশলগত হাতিয়ারে পরিণত করেছে, বন্ধ করে দিয়েছে জাহাজ চলাচল। নানা কূটনৈতিক তৎপরতার মধ্য দিয়ে হাতেগোনা কয়েকটি দেশের জন্য হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত থাকলেও মাধ্যমে পরিবাহিত জ্বালানির পরিমাণ স্বাভাবিক পরিবহনের তুলনায় নগণ্য।
হরমুজ ঘিরে অচলাবস্থা নিরসনে ৪০ দেশের জোট, নেতৃত্বে যুক্তরাজ্যহরমুজ ঘিরে অচলাবস্থা নিরসনে ৪০ দেশের জোট, নেতৃত্বে যুক্তরাজ্য
এ পরিস্থিতিতে মার্চের শুরু থেকেই এশিয়া ও ইউরোপের তেলের বাজার অস্থির হয়ে পড়ে। ফেব্রুয়ারিতে প্রতি ব্যারেল অপরিশোধিত তেলের দাম (ব্রেন্ট ক্রুড) ছিল ৬৫ ডলার, যা মার্চের শেষ ভাগে এসে ১২০ ডলারের কাছাকাছি অবস্থান করছে। এশিয়ার কয়েকটি দেশে এরই মধ্যে জ্বালানি সংকট তীব্র হয়েছে, বেড়েছে দামও।
ইউএনসিটিএডির বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকার প্রভাব শুরু হয়েছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি করিডোরে বিঘ্ন হিসেবে, তা এখন পুরো বৈশ্বিক অর্থনীতিকে প্রভাবিত করছে।
সংস্থাটি বলছে, ফেব্রুয়ারিতে যেখানে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১৩০টি জাহাজ এই প্রণালি দিয়ে চলাচল করত, মার্চে তা কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ছয়টিতে, যা স্বাভাবিকের তুলনায় প্রায় ৯৫ শতাংশ কম। এ পরিস্থিতি বৈশ্বিক তেল ও গ্যাস সরবরাহের বড় অংশকে সরাসরি আঘাত করছে। এর প্রভাব উৎপাদন ও বাণিজ্য খাত ছাড়িয়ে ভোক্তা পর্যায়েও প্রকট হয়ে উঠছে। পাশাপাশি সমুদ্রপথ, এয়ার কার্গো ও বন্দর ব্যবস্থাপনাতেও চাপ বাড়ছে।
হরমুজ প্রণালির পর ওমান উপসাগরও নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার দাবি ইরানেরহরমুজ প্রণালির পর ওমান উপসাগরও নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার দাবি ইরানের
প্রবৃদ্ধি ও মুদ্রাবাজারে চাপ
এই সংকট বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে সতর্ক করেছে জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন সংস্থা। কেবল এশিয়ার দেশ নয়, পশ্চিমের উন্নত দেশগুলোর প্রবৃদ্ধিতেও পড়তে পারে এর প্রভাব।
পূর্বাভাস অনুযায়ী—
উন্নয়নশীল দেশগুলোর জিডিপি প্রবৃদ্ধি ২০২২ সালের ৪ দশমিক ২ শতাংশ থেকে কমে ২০২৬ সালে ৪ দশমিক ১ শতাংশে নামতে পারে;
উন্নত অর্থনীতিগুলোর ক্ষেত্রে এই পতন আরও তীব্র— ২ দশমিক ৮ শতাংশ থেকে নেমে আসতে পারে ১ দশমিক ৫ শতাংশে।
যুদ্ধ বন্ধে নতুন শর্ত: হরমুজ প্রণালিতে টোলের স্বীকৃতি চায় তেহরানযুদ্ধ বন্ধে নতুন শর্ত: হরমুজ প্রণালিতে টোলের স্বীকৃতি চায় তেহরান
অন্যদিকে উপসাগরীয় অঞ্চলে সামরিক উত্তেজনা বাড়ার পর থেকেই উন্নয়নশীল দেশগুলোর মুদ্রা দুর্বল হতে শুরু করেছে। ২৭ ফেব্রুয়ারি থেকে ২৬ মার্চ পর্যন্ত সময়ের হিসাব বলছে—
আফ্রিকায় মুদ্রার অবমূল্যায়ন হয়েছে ঋণাত্মক ২ দশমিক ৯ শতাংশ;
লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবীয় মুদ্রার অবমূল্যায়ন হয়েছে ঋণাত্মক ২ দশমিক ৩ শতাংশ;
উন্নয়নশীল এশিয়া ও ওশেনিয়া অঞ্চলেও মুদ্রার মান ১ শতাংশ কমে গেছে।
ইউএনসিটিএডি বলছে, এসব তথ্য-পরিসংখ্যান চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে, ইরান যুদ্ধ ঘিরে সৃষ্ট সংকট এখন আর কেবল বাণিজ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বা আর্থিক বাজারেও চাপ তৈরি করছে।
ঝুঁকি সামাল দিতে নীতিগত সুপারিশ
জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন সংস্থা তাদের প্রতিবেদনে যুদ্ধ থেকে সৃষ্ট এ সংকটে বিভিন্ন দেশের সরকারের জন্য কিছু গুরুত্বপূর্ণ ‘নীতিগত সুপারিশ’ দিয়েছে। ইউএনসিটিএডি বলছে, এসব সুপারিশ চলমান সংকটের প্রভাব কমাতে সহায়ক হতে পারে। এসব সুপারিশের মধ্যে রয়েছে—
মূল্যস্ফীতির চাপ মোকাবিলায় মূল্যস্তর স্থিতিশীল রাখতে সমন্বিত নীতিমালা গ্রহণ জরুরি। বিশেষ করে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে বিবেচনায় রেখে নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে;
জ্বালানি, বাণিজ্য ও আর্থিক খাতে ‘সিস্টেমিক ঝুঁকি’ (বড় কোনো আর্থিক প্রতিষ্ঠানের দেউলিয়া হয়ে পড়ার কারণে পুরো দেশের অর্থনীতি অচল হয়ে পড়ার ঝুঁকি) ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে;
উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য জরুরি আমদানি ও ঋণ পরিশোধ নিশ্চিত করতে বৈদেশিক অর্থায়নের সহজলভ্যতা বাড়াতে হবে।
হরমুজ প্রণালি নিয়ে ট্রাম্পের আলটিমেটামে বিশ্ববাজারে তেলের দামে ঊর্ধ্বগতিহরমুজ প্রণালি নিয়ে ট্রাম্পের আলটিমেটামে বিশ্ববাজারে তেলের দামে ঊর্ধ্বগতি
এ ক্ষেত্রে কয়েকটি আর্থিক ব্যবস্থাপনার কথাও তুলে ধরেছে ইউএনসিটিএডি। এগুলোর মধ্যে রয়েছে—
জরুরি আন্তর্জাতিক সহায়তা,
ঋণ মওকুফ বা পুনর্গঠন,
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কারেন্সি সোয়াপ চুক্তি,
আঞ্চলিক আর্থিক সহায়তা ব্যবস্থা।
এ ছাড়া উন্নয়ন ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে জরুরি ঋণ প্রদান ও দ্বিপাক্ষিক ঋণদাতাদের ঋণ পরিশোধ সাময়িক স্থগিত করার মতো পদক্ষেপও কার্যকর হতে পারে বলে মনে করছে জাতিসংঘের এই সংস্থা।
হরমুজ প্রণালি ঘিরে সৃষ্ট অচলাবস্থা এখন বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য একটি বড় ঝুঁকিতে পরিণত হয়েছে। জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন থেকে শুরু করে বাণিজ্য, মুদ্রাবাজার ও প্রবৃদ্ধি— সব ক্ষেত্রেই এর প্রভাব পড়ছে। ইউএনসিটিএডির চূড়ান্ত মূল্যায়ন, দ্রুত সমন্বিত নীতি গ্রহণ না করলে এই সংকট আরও গভীর হয়ে বৈশ্বিক অর্থনীতিকে দীর্ঘমেয়াদি অস্থিরতার দিকে ঠেলে দিতে পারে।

