উত্তরা প্রতিদিন
ঢাকা

শেখ হাসিনার আসনে জিলানী-প্রামাণিকের হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস

গোপালগঞ্জ-৩
উত্তরা প্রতিদিন উত্তরা ডেস্ক ৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৭:০৭ অপরাহ্ণ
শেখ হাসিনার আসনে জিলানী-প্রামাণিকের হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস

গোপালগঞ্জ-৩ (টুঙ্গিপাড়া ও কোটালীপাড়া) আসনে বিএনপি ও হিন্দু মহাজোটের স্বতন্ত্র প্রার্থীর মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস পাওয়া যাচ্ছে।

দীর্ঘ কয়েক দশক এই আসনটি ছিল আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার একক আধিপত্যের জায়গা। ঐতিহাসিকভাবে এটি অত্যন্ত হাই প্রোফাইল আসন।

২০২৪ সালে ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তিত পরিস্থিতির পর এবারের নির্বাচন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ছাড়াই অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। ফলে নির্বাচনে ভোটের মাঠ এখন উম্মুক্ত। স্বাধীনতার ৫৪ বছর পর এই আসনটি পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে নিতে এবারই প্রথম বিএনপির জন্য একটি সুবর্ণ সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।

নির্বাচনের ৩ দিন বাকি থাকতেই স্বেচ্ছাসেবক দলের কেন্দ্রীয় সভাপতি ও বিএনপি মনোনীত হেভিওয়েট প্রার্থী এস এম জিলানীর ধানের শীষ ও স্বতন্ত্র প্রার্থী হিন্দু মহাজোটের মহাসচিব গোবিন্দ চন্দ্র প্রামাণিকের ঘোড়া প্রতীকের মধ্যে দ্বিমুখী লড়াইয়ের আভাস মিলছে।

জাতীয় রাজনীতিতে পোড়খাওয়া নেতা এস এম জিলানীর জন্য এবারের নির্বাচন হলো মর্যাদার লড়াই; আর সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আসনে ধানের শীষকে বিজয়ী করে নতুন ইতিহাস গড়ার সুযোগ। অপরদিকে, হিন্দু মহাজোট নেতা গোবিন্দ চন্দ্র প্রামাণিকের কাছে এটি অস্তিত্বের লড়াই।

এস এম জিলানীর ব্যক্তিগত ক্যারিশমা ও রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, নাকি গোবিন্দ প্রামাণিকের স্থানীয় সেন্টিমেন্ট ও মাইনোরিটি কার্ড- কোনটি জিতবে? এ নিয়ে ভোটারদের কৌতুহলের শেষ নাই। নতুন ইতিহাস কে রচনা করবেন, তা জানতে অপেক্ষা আর মাত্র তিন দিন।

কোটালীপাড়া ও টুঙ্গিপাড়ার সাধারন ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, স্বেচ্ছাসেবক দলের কেন্দ্রীয় সভাপতি এস এম জিলানী এ অঞ্চলের রাজনীতির এক পরিচিত মুখ। একজন পরিচ্ছন্ন রাজনীতিবিদ।  ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর এবারেই প্রথম নির্বাচনকে সামনে রেখে ধানের শীষের  পক্ষে জনজোয়ার সৃষ্টি হয়েছে।  

এস এম জিলানীর শক্তির উৎস হচ্ছে জাতীয় পর্যায়ে নেতৃত্ব ও সুসংগঠিত দলীয় নেতা-কর্মী। প্রতীক বরাদ্দের পর থেকে তিনি তার নির্বাচনি এলাকার জনগণের কাছে তারেক রহমানের রাষ্ট্র মেরামতের ৩১ দফার বার্তা পৌঁছে দেওয়া ও নির্বাচনি প্রচারনা চালিয়ে আসছেন। টানা গণসংযোগ ও সভা-সমাবেশ অংশগ্রহন, ধর্মীয় অনুষ্ঠান যোগদান, জানাজা ও সৎকারে হাজির থাকছেন তিনি।

অপরদিকে,  স্থানীয় আওয়ামী লীগ এখন নেতৃত্বহীন ও বিভ্রান্ত। নেতা-কর্মীদের মধ্যে সর্বক্ষণ বিরাজ করছে মামলা ও গ্রেফতার আতঙ্ক। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষের মধ্যে পরিবর্তনের যে আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছে, তা জিলানীকে সবার থেকে এগিয়ে রেখেছে। ইতোমধ্যে নির্বাচনি এলাকার তরুণ, যুবক, নারী ও বয়োজ্যেষ্ঠদের প্রিয়ভাজন ও নির্ভরতারস্থল হয়ে উঠেছেন তিনি।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এ আসনে জয় পরাজয়ের জন্য অন্যতম একটি বড় ফ্যাক্টর হলো বিশাল সংখ্যালঘু ভোট ব্যাংক। ওই ভোটগুলো একতরফা হলে নির্বচনের ফলাফল পাল্টে যেতে পারে বলে সাধারন ভোটারদের ধারণা।

এছাড়া এ আসনে মোট ভোটের শতকরা ৪০ থেকে ৪৫ ভাগ সংখ্যালঘু ভোটার। বিশাল এ ভোট ব্যাংকে ফাটল ধরাতে এস এম জিলানী নিয়েছেন নানান কৌশল। এলাকার মানুষের শান্তি, নিরাপত্তা ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখা,  এলাকার উন্নয়ন এবং বেকার ও তরুণদের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টিকে তিনি অগ্রাধিকার দিচ্ছেন।

অন্যদিকে, স্বতন্ত্র প্রার্থী গোবিন্দ্র চন্দ্র প্রামাণিকের শক্তির জায়গা হলো ধর্মীয় ও সামাজিক সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ততা। গোপালগঞ্জ জেলার স্থানীয় না হয়েও তিনি নির্বাচনে বড় চমক হয়ে দাঁড়িয়েছেন। নির্বাচনি বৈতরণী পার হতে তিনি সংখ্যালঘু ভোটারদের ওপর ভরসা করতে চান। নিজেকে সংখ্যালঘু প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অধিকারের কণ্ঠস্বর হিসেবে উপস্থাপন করছেন তিনি। নির্বচনে বিশাল এ ভোট ব্যাংকটিকে একাট্টা করতে পারলে এর সুফল তিনি পাবেন বলে মনে করেন। তিনি হয়ে যেতে পারেন বিল-হাওড় ও জলাভূমি পরিবেষ্টিত এ অঞ্চলের ‘ডার্ক হর্স’।

বিলের রাণী খ্যাত কোটালীপাড়া উপজেলার ১১টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা এবং মধুমতি বিধৌত টুঙ্গিপাড়া উপজেলার ৫টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা নিয়ে গোপালগঞ্জ-৩ আসন গঠিত।

নির্বাচন কমিশনের সর্বশেষ হাল নাগাদ তথ্য অনুযায়ি, গোপালগঞ্জ-৩ আসনের মোট ভোটার ৩ লাখ ৮ হাজার ৭৮৪ জন। যার মধ্যে পুরুষ ভোটার ১ লাখ ৫৮ হাজার ৪০৫ জন ও নারী ভোটার ১ লাখ ৫০ হাজার ৩৭৮ জন। এছাড়া ১ জন তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার রয়েছে। গোপালগঞ্জ-৩ আসনে মোট ভোটের শতকরা ৪০ থেকে ৪৫ ভাগ সংখ্যালঘু ভোট।  

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে গোপালগঞ্জ-৩ আসনে এ দুজন ছাড়া আরও ৬ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তারা হলেন, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মুফতি আব্দুল আজিজ মাক্কী (রিক্সা), ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মো. মারুফ শেখ (হাতপাখা), ন্যাশনাাল পিপলস পার্টির শেখ সালাউদ্দিন (আম), গণফোরামের দুলাল চন্দ্র বিশ্বাস (উদীয়মান সূর্য), গণ অধিকার পরিষদের আবুল বাসার (ট্রাক) ও স্বতন্ত্র প্রাার্থী হাবিবুর রহমান (ফুটবল)। এদের মধ্যে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের প্রার্খী আব্দুল আজিজ মাক্কি ও স্বতন্ত্র প্রার্থী হাবিবুর রহমান মাঠে সক্রিয় আছেন।

কোটালীপাড়ার কলাবাড়ি গ্রামের রবীন্দ্র নাথ অধিকারী গণমাধ্যমকে বলেন, গোপালগঞ্জ-৩ আসনের নির্বাচন এখন আর একমুখি নেই। বিএনপির প্রার্থী  এবং হিন্দু মহাজোটের প্রার্থীর মধ্যে তীব্র লড়াই হবে। তবে এ আসনে সবচেয়ে বড় রহস্য এখন আওয়ামী লীগের সাইলেন্ট ভোট। বিশাল এই সাইলেন্ট ভোট কোন প্রার্থীকে বিজয়ী করতে কৌশলগত সমর্থন দেবে, নাকি তাদের ভোট কেন্দ্রে যাওয়া থেকে বিরত থাকতে বলবে- এটাই এখন দেখার বিষয়।  

স্থানীয় ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে আরও জানা যায়, নির্বাচনকে সামনে রেখে ভোটাদের মধ্যে এক ধরনের চাপা ভয় কাজ করছে। বিশেষ করে সংখ্যালঘু পরিবারগুলোর মধ্যে নির্বাচন পরবর্তী নিরাপত্তা নিয়ে রয়েছে নানান শঙ্কা।

রাধাগঞ্জের উন্নয়ন কর্মী অনিতা রায় বলেন, আমি ভোট দিতে যাবো কিনা এখনো কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারিনি। আওয়ামী লীগ এবার নির্বাচনে অংশ নিতে পারছে না। তাই এখন আর ভোট দেওয়ার আগ্রহ নেই।

টুঙ্গিপাড়ার পাটগাতী বাজারের গ্রাম্য ডাক্তার প্রশান্ত বিশ্বাস বলেন, আমরা এবার পরিবর্তনের পক্ষে ভোট  দেব। দীর্ঘদিন আমরা ভোট দিতে পারিনি। এবার সুযোগ এসেছে এ সুযোগ হাতছাড়া করব না।

হিন্দু মহাজোটের মহাসচিব ও স্বতন্ত্র প্রার্থী গোবিন্দ চন্দ্র প্রামানিক বলেন, সংসদ সদস্য নির্বাচিত হলে তিনি এলাকার উন্নয়নের পাশপাশি ধর্মীয় সংখ্যালঘু ও প্রান্তিক মানুষের সুরক্ষা নিশ্চিত ও অধিকার আদায়ে ভূমিকা রাখবেন।

স্বেচ্ছাসেবক দলের কেন্দ্রীয় সভাপতি এস এম জিলানী বলেন, কোটপালীপাড়া ও টুঙ্গিপাড়া মুলত কৃষিনির্ভর। বছরের ছয় মাস মানুসের কাজ থাকে, বাকি ছয় মাস অধিকাংশ মানুষ বেকার থাকে। কৃষি ভিত্তিক অর্থনীতির এই মৌসুমি সংকট কাটিয়ে উঠতে বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করাই হলো আমার প্রধান লক্ষ্যগুলোর মধ্যে একটি। দীর্ঘদিন ধরে এ অঞ্চলে একতরফা রাজনীতির চর্চা চলে আসছিল। ফলে ভিন্নমতের বা প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ রাজনীতি করার সুযোগ ছিল না বললে চলে। ফলে ভোট দেওয়ার প্রতি মানুষের আগ্রহ হারিয়ে যায়। আমার প্রতি ভোটারদের আস্থা রয়েছে। নির্বাচনে জয়ের ব্যাপারে আমি শতভাগ আশাবাদী।

Read more — রাজনীতি
Home