
নির্বাচন সামনে রেখে জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে জোট গঠন নিয়ে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) ভেতরে ক্রমেই টানাপোড়েন বাড়ছে। এনসিপির পক্ষ থেকে জোট গঠন ইস্যুতে জামায়াতকে তিন শর্ত দেওয়া হয়েছে। দলের একটি অংশ জামায়াতের সঙ্গে জোটে যাওয়ার পক্ষে। অন্য একটি অংশ শর্তসাপেক্ষ জামায়েতের সঙ্গে জোট করার পক্ষে। এদিকে এনসিপির শীর্ষ নেতৃত্বের একটি অংশ নীরব থাকায় অনিশ্চয়তা বাড়ছে।
এসব বিষয়ে গত বুধবার রাতে এনসিপির দলীয় কার্যালয়ে নির্বাচন পরিচালনা কমিটির একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে জামায়াতের সঙ্গে জোট গঠনের বিষয়টি নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা হলেও কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। বরং বৈঠকে জামায়াতের জোটে যোগদান ইস্যুতে দলের ভেতরে দুই পক্ষের নেতারাই নিজ নিজ অবস্থান বেশ যুক্তিসংগত পন্থায় জোরালোভাবে তুলে ধরেছেন।
বৈঠকে উপস্থিত একটি সূত্র জানায়, জামায়াতের সঙ্গে জোটে যাওয়ার পক্ষে এনসিপির কয়েকজন নেতা মত দিয়েছেন। তবে বৈঠকে এনসিপির এক যুগ্ম সদস্যসচিব জামায়াতের সঙ্গে জোটের ক্ষেত্রে কয়েকটি মৌলিক শর্ত উত্থাপন করেন। তিনি বলেন, মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে ও স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে জামায়াতের ভূমিকা কী ছিল, তা স্পষ্ট করতে হবে দলটিকে। সেই সময়ে যদি তাদের কোনো ভুল বা বিতর্কিত ভূমিকা থেকে থাকে, তাহলে জাতির সামনে স্বীকার করে প্রকাশ্যে ক্ষমা চাইতে হবে। পাশাপাশি ভবিষ্যতে দেশবিরোধী কোনো কর্মকাণ্ডে জড়ানো যাবে না- এ মর্মে স্পষ্ট অঙ্গীকার থাকতে হবে জামায়েতের পক্ষ থেকে। একই সঙ্গে নারী অধিকার ও রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ নিয়ে জামায়াতের অবস্থান কী, সেটিও পরিষ্কারভাবে জানাতে হবে।
এ সময় বৈঠকে উপস্থিত অনেক নেতা এই শর্তগুলোর প্রতি সমর্থন জানান। অনেকেই মত দেন, জামায়াতকে যদি অতিরিক্ত গুরুত্ব দেওয়া হয়, তাহলে এনসিপির নিজস্ব রাজনৈতিক পরিচয় ও আদর্শ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কেউ কেউ আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, এতে এনসিপি ধীরে ধীরে জামায়াতের ছায়াতলে চলে যেতে পারে এবং দলটির স্বাধীন অবস্থান প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়বে।
জোট আলোচনার পাশাপাশি আসন সমঝোতা ও প্রার্থী মনোনয়ন নিয়েও বৈঠকে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন এনসিপির নেতারা। ভোটের সময় ঘনিয়ে এলেও দলের দ্বিতীয় ধাপের প্রার্থী তালিকা ঘোষণা না হওয়ায় তারা উদ্বেগ জানান। নেতাদের প্রশ্ন, যদি শেষ পর্যন্ত জোট করাই উদ্দেশ্য হয়, তাহলে শুরুতেই কেন এককভাবে নির্বাচনে যাওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। আবার যদি জামায়াতের সঙ্গে আসন সমঝোতা হয়, তবে কোন আসনে কতটি ছাড় দেওয়া হবে এবং এনসিপির কোন নেতারা মনোনয়ন পাবেন, সে বিষয়ে এখনো স্পষ্ট কোনো বার্তা না আসায় মাঠপর্যায়ের প্রস্তুতি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
৩০০ আসনের মধ্যে এনসিপি মাত্র ১২৫টি আসনে প্রার্থী ঘোষণা করেছে। বাকি আসনগুলোতে প্রার্থিতা অনিশ্চিত থাকায় দলীয় নেতা-কর্মীদের মধ্যে হতাশা ও বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। বৈঠকে উপস্থিত একাধিক নেতা বলেন, সময় নষ্ট হওয়ায় বড় দলগুলোর সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার মতো প্রস্তুতি নেওয়া যাচ্ছে না।
বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন এনসিপির এক যুগ্ম সদস্যসচিব, নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, জামায়াত এখনো তাদের অবস্থান পরিষ্কার করছে না। বরং তারা একধরনের ‘প্রক্সি’ খেলছে এনসিপির সঙ্গে। জামায়াতের মতাদর্শ বাস্তবায়ন বা সংসদে গিয়ে জামায়াতের পক্ষে কথা বলবেন, এনসিপির এমন নেতাদের বিষয়ে তারা তৎপর। অন্য নেতাদের বিষয়ে কোনো ভূমিকা জামায়াতের মধ্যে দেখা যাচ্ছে না। জোট হলে জামায়াত এনসিপিকে নিজেদের কাজে লাগাবে এমন লক্ষণ দেখা যাচ্ছে।
তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, পার্টিতে জামায়াতের অনুসারীদের জোটে মনোনয়নদানে ছাড় দেওয়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। আসন ও অঞ্চল অনুযায়ী প্রার্থিতা এবং সমঝোতা করতে চায় তারা। জামায়াতপন্থি অনেক নেতা ইতোমধ্যে এনসিপির মনোনয়ন পেয়ে প্রচার শুরু করলেও দলের অন্য নেতারা অনিশ্চয়তায় ভুগছেন। এতে দলের ভেতরে ভারসাম্য নষ্ট ও অনিশ্চয়তা তৈরি হচ্ছে।
এদিকে জামায়াতের সঙ্গে জোট ইস্যুতে এনসিপির অভ্যন্তরীণ সংকট আরও প্রকট হয়ে ওঠে কেন্দ্রীয় নেতার পদত্যাগের ঘটনায়। একাধিক প্রসঙ্গ এনে এনসিপির বিরুদ্ধে ব্যর্থতার অভিযোগ তুলে দলের যুগ্ম সদস্যসচিব মীর আরশাদুল হক পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছেন। পাশাপাশি জামায়াতের সঙ্গে আসন সমঝোতা ও জোট গঠনের বিষয়ে জুলাই আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক সমন্বয়ক আবদুল কাদের ক্ষোভ প্রকাশ করেন। নিজের ফেসবুকে তিনি লেখেন, ‘তারুণ্যের রাজনীতির কবর রচিত হতে যাচ্ছে। এনসিপি অবশেষে জামায়াতের সঙ্গেই সরাসরি জোট বাঁধছে। সারা দেশে মানুষের, নেতা-কর্মীদের আশা-আকাঙ্ক্ষাকে জলাঞ্জলি দিয়ে গুটিকয়েক নেতার স্বার্থ হাসিল করতেই এমন আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত নিয়েছে তারা।’
জামায়াতের সঙ্গে জোট নিয়ে এনসিপির অবস্থান জানতে চাইলে দলের সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক সামান্তা শারমিন কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে তিনি জানান, দলীয় প্রার্থী ঘোষণার প্রস্তুতি চলছে এবং শিগগিরই তালিকা প্রকাশ করা হবে। জোটগতভাবে নির্বাচনে যাওয়ার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, জোট হলে এককভাবে নির্বাচনের সুযোগ আর থাকে না। কয়েক দিনের মধ্যে তা পরিষ্কার হবে।
দলীয় বৈঠক ও জোট নিয়ে এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষার বলেন, ‘বৈঠকে জামায়াতের সঙ্গে জোট ইস্যুতে পক্ষে ও বিপক্ষে মতামত এসেছে। আমরা সবার মতকে গুরুত্ব দিচ্ছি। সেগুলো পর্যালোচনা হচ্ছে। আশা করি চলতি সপ্তাহে পরিষ্কার হবে।’ জোটের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘জামায়াতের সঙ্গে জোটের বিষয়ে কথা হয়েছে। এগিয়েছে, তবে চূড়ান্ত হয়নি। বিএনপির সঙ্গে আলোচনা চলছে।’
এদিকে জামায়াতের সঙ্গে এনসিপির আলোচনা চলার মধ্যেই আটদলীয় জোটেও টানাপোড়েন দেখা দিয়েছে। প্রত্যাশিতসংখ্যক আসন না পাওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছে চরমোনাই পীরের ইসলামী আন্দোলন এবং মাওলানা মামুনুল হকের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস। এসব দলের অভিযোগ, জামায়াত নিজে বেশি আসনে প্রার্থী দিতে চাইছে এবং মিত্রদের জন্য তুলনামূলক কম ছাড় দিচ্ছে।
উল্লেখ্য, গত ৭ ডিসেম্বর এনসিপি, আমার বাংলাদেশ পার্টি (এবি পার্টি) ও বাংলাদেশ রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের সমন্বয়ে ‘গণতান্ত্রিক সংস্কার জোট’-এর আত্মপ্রকাশ ঘটে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে এনসিপির সঙ্গে জামায়াতের ঘনিষ্ঠতা সেই সিদ্ধান্তকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। এর আগে বিএনপির সঙ্গে এনসিপির আসন সমঝোতার বিষয়টি আলোচনায় এসেছিল। শেষ পর্যন্ত তা বাস্তবায়িত হয়নি। তবে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান দেশে ফিরে আসায় আবারও বিএনপির সঙ্গে আলোচনার সম্ভাবনা দেখছেন এনসিপির শীর্ষ নেতাদের একটি অংশ। ফলে জোট রাজনীতিকে ঘিরে এনসিপির সামনে এখন একাধিক পথ খোলা থাকলেও কোন পথে দলটি এগোবে, সে সিদ্ধান্তই এখন সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

