উত্তরা প্রতিদিন
ঢাকা

অন্তর্দ্বন্দ্বে অস্বস্তিতে বিএনপি, ফুরফুরে জামায়াত

রাজশাহী-১ আসন
উত্তরা প্রতিদিন উত্তরা প্রতিবেদক ২৯ নভেম্বর ২০২৫, ০৮:০১ অপরাহ্ণ
অন্তর্দ্বন্দ্বে অস্বস্তিতে বিএনপি, ফুরফুরে জামায়াত
মেজর জেনারেল (অব.) শরিফ উদ্দীন ও জামায়াতের কেন্দ্রীয় নায়েবে আমির অধ্যাপক মুজিবুর রহমান

তানোর ও গোদাগাড়ী উপজেলা নিয়ে গঠিত রাজশাহী-১ আসন। এই আসনকে ঘিরে আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে বিএনপির অভ্যন্তরীণ বিভাজন। জুলাই অভ্যুত্থানের আগে দু-একজন নেতা মাঠে থাকলেও পরিবর্তিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে অনেকেই মনোনয়ন পেতে সক্রিয় হয়ে ওঠেন। আর এ কারণেই দেখা দেয় সাংগঠনিক বিশৃঙ্খলা। মনোনয়নপ্রত্যাশীদেরকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন দল আর উপদলে বিভক্ত হয়ে পড়েন নেতাকর্মীরা। এতে সৃষ্টি হয়েছে দ্বন্দ্ব-সংঘাত। সম্প্রতি বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও জেলা বিএনপির সদস্য মেজর জেনারেল (অব.) শরিফ উদ্দীনকে প্রাথমিক মনোনয়ন দেওয়া হয়। তিনি প্রয়াত মন্ত্রী ব্যারিস্টার আমিনুল হকের ভাই। জনপ্রিয় এই পরিবারের প্রতি জনগণের আস্থা কাজে লাগাতে তাকে মনোনয়ন দেওয়া হলেও থামেনি বিভেদ। বরং অসন্তোষ ও প্রতিরোধমূলক আন্দোলন ক্রমেই তীব্র হচ্ছে। অন্যদিকে একই আসনে জামায়াতে ইসলামী তাদের কেন্দ্রীয় নায়েবে আমির অধ্যাপক মুজিবুর রহমানকে মনোনয়ন দেওয়ার পর বেশ উচ্ছ্বাসে রয়েছে দলটির নেতাকর্মীরা। ফলে মাঠপর্যায়ের অবস্থান ও জনসমর্থন বিশ্লেষণে স্থানীয়রা ধারণা করছেন- এই আসনে এবার বিএনপি–জামায়াতের কঠিন প্রতিদ্বন্দ্বিতা দেখা যেতে পারে।

বিএনপির ঘরেই অস্থিরতা : রাজশাহী-১ আসনটি বিএনপির ঐতিহ্যবাহী ‘সেফ সিট’ হিসেবে পরিচিত। দুইবারের মন্ত্রী ব্যারিস্টার আমিনুল হক ১৯৯১, ১৯৯৬ ও ২০০১ সালে এখান থেকে এমপি নির্বাচিত হয়েছিলেন। ২০১৯ সালে তার মৃত্যুর পর আসনটি বিএনপির জন্য আরও সংবেদনশীল হয়ে ওঠে। এ কারণেই এবার মনোনয়নপ্রত্যাশীর সংখ্যা ছিল বেশ কয়েকজন। তাদের মধ্যে সাবেক মন্ত্রী ব্যারিস্টার আমিনুল হকের ছোট ভাই মেজর জেনারেল (অব.) শরীফ উদ্দীন ছাড়াও তাদের ফুফাতো বোনের ছেলে ব্যারিস্টার মাহফুজুর রহমান মিলন, শিল্পপতি সুলতানুল ইসলাম তারেক, জেলা বিএনপির সদস্য সচিব বিশ্বনাথ সরকার, আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ বিপ্লব, কেএম জুয়েল, প্রবাসী শাহাদাত হোসেন শাহীন জোড়ালোভাবে লবিং-তদবির শুরু করেন। এমনকি ব্যারিস্টার আমিনুল হকের স্ত্রী আভা হকও আলোচনায় ছিলেন। এসব আলোচনাকে ছাপিয়ে প্রাথমিক মনোনয়ন পান মেজর জেনারেল (অব.) শরীফ উদ্দীন। মনোনয়ন ঘোষণার পর অনেকেই নীরব হয়ে গেলেও শিল্পপতি সুলতানুল ইসলাম তারেকের সমর্থকরা বিভিন্ন এলাকায় বিক্ষোভ মিছিল, মানববন্ধন ও সমাবেশ করে প্রার্থী পরিবর্তনের দাবি জানাচ্ছেন। এতে অন্য মনোনয়নপ্রত্যাশী অনেকেরই গোপন সমর্থন রয়েছে বলে সূত্রে জানা গেছে।

আন্দোলন-সংঘর্ষ রূপ নেয় অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে : প্রার্থী ঘোষণার আগে থেকেই শুরু হওয়া মনোনয়ন প্রত্যাশীদের বিভাজন শুধু রাজনৈতিক বিরোধেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; একের পর এক সংঘর্ষে প্রাণহানির ঘটনাও ঘটে। গত ১১ মার্চ তানোরে বিএনপির ইফতার মাহফিলে শরিফ উদ্দীনকে বরণ করা নিয়ে দু’পক্ষের সংঘর্ষে গানি­উল ইসলাম নামে একজন নিহত হন। এর ১৬ দিন পর আবারও তানোরে শরীফ ও তারেকের সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। এতে কৃষকদল নেতা নেকশার আলী প্রাণ হারান। এ ছাড়া ১৫ ডিসেম্বর সুলতানুল ইসলাম তারেকের সমর্থকদের সঙ্গে শরীফের অনুসারীদের সংঘর্ষ, ৪ জানুয়ারি ভবানীপুরে উত্তেজনা, ৮ ফেব্রুয়ারি গোদাগাড়ীর বারোমাইল এলাকায় তারেকপন্থী নেতাদের আহত হওয়ার ঘটনা—সব মিলিয়ে আসনটিতে বিএনপির অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি বেশ উত্তপ্ত। এছাড়া, ২ সেপ্টেম্বর দলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী  উপলক্ষে গোদাগাড়ীতে সমাবেশ ঘিরেও রক্তাক্ত সংঘর্ষ হয়। বর্তমানে মেজর শরিফ উদ্দীন মনোনয়ন পেলেও তারেকপন্থীরা প্রায় প্রতিদিনই প্রার্থী পরিবর্তনের দাবিতে আন্দোলন কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছেন। সর্বশেষ গত শনিবারও প্রার্থী পরিবর্তনের দাবিতে রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার মহিষালবাড়ী এলাকায় চাঁপাইনবাবগঞ্জ-ঢাকা মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ দেখায় বিএনপির একাংশ। এতে বিএনপিতে অস্বস্তি আরও বাড়ছে। যদিও জুলাই অভ্যুত্থানের পর এই আসনটি পুনরুদ্ধার করতে মরিয়া ছিল বিএনপি। কিন্তু দলের ভেতরের অস্থিরতা, সংঘর্ষ, পাল্টাপাল্টি মামলা ও অসন্তোষ চূড়ায় পৌঁছানোয় দলীয় প্রার্থীর সামনে বড় চ্যালেঞ্জ আসছে বলেই মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে মেজর জেনারেল (অব.) শরীফ উদ্দীন বলেন, যে আস্থা রেখে দলের হাইকমান্ড আমাকে মনোনয়ন দিয়েছেন নির্বাচিত হয়ে তার প্রতিদান দিতে চাই। এছাড়া, শিক্ষা, কৃষি, সেচ, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান, যোগাযোগ উন্নয়ন, সকল মানুষের ধর্মীয় মূল্যবোধকে গুরুত্ব দেওয়া আমার মূল প্রতিশ্রুতি। তবে মরহুম ব্যারিস্টার আমিনুল হকের অসম্পূর্ণ কাজগুলো সম্পন্ন করার পাশাপাশি তানোর-গোদাগাড়ীর উন্নয়নকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে জনগণের প্রাণের চাওয়া-পাওয়াগুলো সংসদে তুলে ধরবো। আমি জনগণের প্রার্থী হিসেবে জনগণের পাশে থাকতে চাই। আমি দীর্ঘ ৩৮ বছর ইউনিফর্মে (সেনাবাহিনী) কাজ করেছি। আমি কথায় না কাজে বিশ্বাসী।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, প্রার্থী পরিবর্তনের আন্দোলন বা অভ্যন্তরীণ বিরোধ আমার প্রচার-প্রচারণা বা জনপ্রিয়তায় জিরো পার্সেন্টও ভাটা ফেলতে পারবে না। ফলে এখান থেকে জামায়াতও কোনো সুবিধা নিতে পারবে না। ফলে জয়ের বিষয়ে আমি শতভাগ আশাবাদী।

জামায়াতে উচ্ছ্বাস, ‘হেভিওয়েট’ প্রার্থীকে ঘিরে শক্তিশালী প্রচার: অন্যদিকে একই আসনে জামায়াতে ইসলামী মনোনয়ন দিয়েছে দলটির নায়েবে আমির অধ্যাপক মুজিবুর রহমানকে। তিনি ১৯৮৬ সালে এখান থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, এলাকায় গ্রহণযোগ্যতা ও একক প্রার্থীতার কারণে তাকে ঘিরে দলীয় কাঠামোতে নতুন উদ্দীপনা সৃষ্টি হয়েছে। এছাড়া, জামায়াত ও শিবিরের নেতাকর্মীরা প্রতিদিনই তানোর ও গোদাগাড়ীজুড়ে গণসংযোগ, পথসভা ও যোগাযোগ কার্যক্রম চালাচ্ছেন। স্থানীয়দের মতে, বিএনপির অভ্যন্তরীণ বিভাজনের সুযোগ নিয়ে জামায়াত এবার শক্ত ভিত্তি গড়ার চেষ্টা করছে।

নির্বাচিত হলে এই আসনের সমস্যা চিহ্নিত করে তা সমাধানের প্রতিশ্রুতি দিয়ে জামায়াত মনোনীত প্রার্থী দলের নায়েবে আমির ও সাবেক সংসদ সদস্য অধ্যাপক মুজিবুর রহমান বলেন, প্রথমত, তানোর-গোদাগাড়ীর মানুষের মূল সমস্যা দরিদ্রতা। এটার যদি সমাধান করা যায় তাহলে তাদের জীবন-যাপন স্বাভাবিক হবে। তখন তারা ভালো কাজ করার সুযোগ পাবে। এতে প্রায় সকল সমস্যাই সমাধান হয়ে যাবে। দ্বিতীয়ত, সঠিক শিক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে যদি এই অঞ্চলের মানুষ গড়ে উঠতে পারে তাহলে তারা নিজেদের জীবন-মান উন্নয়নের পাশাপাশি সমাজ গঠনেও ভূমিকা রাখতে পারবে। তাই সবাই ঐক্যবদ্ধভাবে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা নিতে পারলে এলাকা আদর্শ আসন হিসেবে গড়ে তোলা সহজ হবে। তবে জাতীয় রাজনীতির কারণেই এগুলো সাধারণত হয়ে উঠছে না। তবে এই সমস্যা সমাধানের চেষ্টা আমরা করছি।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এই আসনের জনগণ মধ্যবিত্ত ও দরিদ্র। তাই তাদের সচ্ছল করতে মূলধন দিয়ে খুদ্র ব্যবসায় নিযুক্ত করার পরিকল্পনা আছে। তবে সেটা সুদভিত্তিক মূলধন নয়। কারণ এটা করলে তারা আরও শেষ হয়ে যাবে।

অপর এক প্রশ্নের জবাবে অধ্যাপক মুজিবুর রহমান বলেন, সমাজে ভালো মানুষের অনেক অভাব রয়েছে। অধিকাংশ মানুষ ব্যক্তি স্বার্থ বা দলীয় স্বার্থ চরিতার্থের জন্য কাজ করছে। জামায়াত একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কাজ করে। ফলে দেশের মানুষ ভালো মানুষের সন্ধানে আছে। দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রসংসদ নির্বাচনের ফলাফল তার প্রমাণ। তাই সুষ্ঠ-সুন্দর, ঘুষ-দুর্নীতি মুক্ত দেশ গড়তে জনগণ এবার জামায়াতকে সুযোগ দেবে বলে বিশ্বাস করি।

বিকল্প রাজনৈতিক দলগুলোর উপস্থিতি থাকলেও মাঠে দুর্বল: রাজশাহী–১ আসনে  বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ) থেকে মাঠে আছেন দলটির জেলা আহ্বায়ক আফজাল হোসেন, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ থেকে আরিফুল ইসলাম প্রার্থী হয়েছেন। এ ছাড়া জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) রাজশাহী মহানগরের সদস্যসচিব আতিকুর রহমান এই আসনে প্রার্থী হওয়ার আলোচনায় আছেন। গণ অধিকার পরিষদের কেন্দ্রীয় সহসভাপতি মীর মো. শাহজাহানকে এই আসনে প্রার্থী করা হয়েছে। তবে এদের মাঠপর্যায়ের তৎপরতা খুব কম হওয়ায় মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে বলে ধারণা স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের।

উল্লেখ্য, ভারতীয় সীমান্ত ঘেষা ও পদ্মা নদী বেষ্টিত রাজশাহীর গুরুত্বপূর্ণ এই আসনটি দুই উপজেলার চারটি পৌরসভা ও ১৬টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত। ভোটার সংখ্যা ৪ লাখ ৪০ হাজার ২১৮ জন। এর মধ্যে ২ লাখ ১৯ হাজার ৬৫৩ জন পুরুষ ও ২ লাখ ২০ হাজার ৫৬৪ জন নারী। এছাড়া ১ জন তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার রয়েছে।

Read more — রাজনীতি
Home