
বাংলাদেশে এখন তিনটি সংকট ঘনীভূত হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু।
তিনি বলেন, প্রথমত- গণভোট আগে না পরে বা একসঙ্গে। দ্বিতীয়ত নোট অব ডিসেন্ট কী হবে? তৃতীয়ত আগামী দিনের নির্বাচন কিসের নির্বাচন?
রবিবার (২ নভেম্বর) ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির (ডিআরইউ) শফিকুল কবির মিলনায়তনে আয়োজিত এক আলোচনাসভায় তিনি এসব কথা বলেন।
আলোচনা সভাটি যৌথভাবে আয়োজন করে আমার বাংলাদেশ পার্টি (এবি পার্টি), বাংলাদেশ রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলন এবং ইউনাইটেড পিপলস বাংলাদেশ (আপ বাংলাদেশ)।
সরকারের উদ্দেশে মঞ্জু বলেন, এই অন্তবর্তী সরকার তার কোনো প্রিন্সিপাল পজিশন নেই। বিএনপির চাপে তারা কিছুক্ষণ ডানে ছুটেন। জামায়াতের চাপে তারা কিছুক্ষণ বামে ছুটেন। এনসিপির চাপে তারা মাথার উপর থেকেও একটা চেষ্টা করেন। আপনারদের কাছে আমাদের অনুরোধ হচ্ছে- আপনারা আপনাদের অবস্থান সঠিক করেন। আপনারাও যদি রাষ্ট্রের মালিক সাজেন তাহলে হবে না। আপনাদেরকে মানুষের দুঃখ দুর্দশার মানুষের প্রয়োজনের কথাগুলো শুনতে হবে।
জাতীয় ঐকমত্য কমিশনে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সালাহউদ্দিন আহমদের বক্তব্য প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, 'কমিশনে কথায় কথায় তিনি সংবিধান, আর্টিকেল ও অনুচ্ছেদ টেনে কথা বলতেন। কিন্তু তাকে যখন আইনশৃঙ্খলা বাহিনী গুম করে তামাবিল সীমান্ত দিয়ে ভারতের শিলংয়ে পাঠিয়ে দেওয়া হল? এটা কত নম্বর আর্টিকেলে লেখা ছিল? কোন আর্টিকেল অনুসারে আপনাকে এই বিনা ভিসায়, বিনা ভাড়ায় আপনাকে পরিভ্রমণ করানো হয়েছে। সেটাও যদি আপনি কখনো কখনো বলতেন তাহলে ভালো হতো।'
তিনি বলেন, 'গত ১৫ বছর শেখ হাসিনা প্রতিনিয়ত রাষ্ট্র ও সংবিধানকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে দুমড়ে-মুচড়ে হত্যা করেছিল। রাষ্ট্রকে এমন এক জায়গায় নিয়ে গিয়েছিলেন যার জন্য আমাদের গণ-অভ্যুত্থানের আশ্রয় নিতে হয়েছিল। এখন সংকটটা কোথায়? দল যদি সংস্কার না হয় রাজনীতি কিভাবে সংস্কার হবে?'
মঞ্জু আরও বলেন, 'সরকারকে বলব কয়েকটা রাজনৈতিক দলের মন জুগিয়ে চলার রাজনীতির চিন্তানীতি বাদ দেন। না হলে আপনারা যে একটা সুযোগ পেয়েছিলেন সেই সুযোগ হাতছাড়া করার দায় আপনারা স্থায়ীভাবে বাংলাদেশের মানুষের কাছে দায়ী থাকবেন। এই দায় থেকে আমাদের শহিদদের রক্ত আহতদের রক্ত আপনাদেরকে কখনো মুক্তি দেবে না।'
রাজনৈতিক দলগুলোর উদ্দেশে তিনি আরও বলেন, 'আমাদের বিকল্প রাজনৈতিক গুরুত্ব হিসেবে দাঁড় করাতে হবে। একটা বিকল্প পার্লামেন্ট হবে, বিকল্প যুক্তি হবে, যেমন ভাবে এবার ঐক্যমত কমিশন হয়েছিল। রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলন ও এবি পার্টি আমরা আস্তে আস্তে নিজেদের মধ্যে মতবিনিময় শুরু করেছি। এনসিপি, গণঅধিকার পরিষদ,জেএসডিসহ সব দল মিলে আমরা একটা বিকল্প রাজনীতির জন্য এক হতে পারি কিনা। দলের নৈতিক ও মানবিক সংস্কার করতে না পারলে কোনো পরিবর্তন হবে না।'
সোয়াস ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনে অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক এবং দুদক সংস্কার কমিশনের সদস্য ড. মুশতাক হুসেন খান বলেছে, 'বড় বড় অলিগার্ক কোথায় কোথায় হাজার হাজার কোটি টাকা পাচার করছে তা প্রমাণসহ আমাদের দেখানো উচিত ছিল। বড় বড় অলিগার্কদের সম্পদ ক্রোক হয়নি। তাদের টাকা পুনরুদ্ধার করার প্রয়োজন ছিল।'
তিনি আরও বলেন, 'আমরা বিদ্যুৎ খাতের চুরি নিয়ে কাজ করছি। আশা করি প্রমাণসহ জাতির সামনে উপস্থাপন করতে পারব। বড় চুরি করে কেউ পার পাবে না। কোনো অলিগার্ককে ক্ষমা করা যাবে না।'
ড. মুশতাক হুসেন খান বলেন, 'আমাদের আস্থা, নৈতিকতা, ক্ষমতা ও নতুন বন্দোবস্ত আছে। অভ্যুত্থানের পর সবাই সমাজের আমুল পরিবর্তন করতে চেয়েছিল। কিন্তু এই পরিবর্তন নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত সমঝোতার মাধ্যমে হবে না। একটা কামরায় বসে সবাই নিয়ে কোনো কিছুতে স্বাক্ষর করে হবে না। গণ-অভ্যুত্থানে পর আমাদের বাংলাদেশের মৌলিক সমস্যা কী কী তা বিন্যাস করতে হবে।'
তিনি আরও বলেন, 'আস্থা ও ক্ষমতা সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। আমাদের দেশে উপর থেকে নিচ পর্যন্ত কারও ওপর আস্থা নেই। ৫ আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানের পর আমরা সবাইকে খুব তাড়াতাড়ি ক্ষমা করে দিয়েছি। আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ, যুবলীগ এদের কোনো শাস্তি হয়নি। তাদের শাস্তি হওয়ার দরকার ছিল। আজকে আমরা কাউকে বিশ্বাস করতে পারছি না। আমরা চাই - সত্যিকার অর্থে নতুন বন্দোবস্ত করতে হবে। যারা ভয়ে বিক্রি হবে বা অনাস্থার কারণে বিক্রি হয়ে যায়, তাদের আমাদের কোনো সম্পর্ক থাকবে না এবং তাদেরকে ক্ষমা করা যাবে না। আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যারা জড়িত তাদেরকে চিহ্নিত করতে হবে। নির্বাচন হোক বা না হোক, তবে যারা দেশের টাকা পাচার করেছে, সে সমস্ত অলিগার্কদের শাস্তি দিতে হবে। বাংলাদেশে পরিবর্তনের সুযোগ এসেছে এবং এই পরিবর্তনটি করতে হবে। অলিগার্ক শাসিত সমাজ আমরা চাই না।'
সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে মুশতাক হুসেন বলেন, 'নির্বাচন দলগুলোকে এমনভাবে শৃঙ্খলাবদ্ধ হতে হবে এবং জনগণের আস্থা অর্জনের জন্য এমন কিছু কথা বলতে হবে, যেগুলো জনগণ চিনতে চায়।'
আলোচনাসভায় সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ রাষ্ট্র সংস্কার সভাপতি অ্যাডভোকেট হাসনাত কাইয়ূম।
তিনি বলেন, 'আজকে একটা জটিল সময়ের মধ্যে আছি। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ আসলে তেমন স্বস্তি পায়নি। এরপর চব্বিশে যে বিজয় এসেছে, এক বছর আলোচনা করার পর কোনো কিছুই হয়নি। চব্বিশের বিজয় এখনো ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে গেছে। যাদেরকে আমরা পরাজিত করেছি, তারা যেকোনো সময় উল্টো কামড় দিতে পারে।'
আগামীর বাংলাদেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানান তিনি।
জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জেএসডি) সাধারণ সম্পাদক শহীদ উদ্দিন মাহমুদ স্বপন বলেন, 'দেশে আইনের শাসন না থাকলে, সেখানে আস্থার শাসন প্রতিষ্ঠিত হওয়ার কোনো সুযোগ নেই।'
তিনি আরও বলেন, 'ফ্যাসিবাদকে আমরা তাড়ালেও, ফ্যাসিবাদী বন্দোবস্ত এখনো রয়ে গেছে।'
ইউনাইটেড পিপলস বাংলাদেশ'র (আপ বাংলাদেশ) আহ্বায়ক আলী আহসান জুনায়েদ বলেন, 'রাজনৈতিক দলগুলো শুধু ক্ষমতার কথা ভেবেছে। জনগণের কথা ভাবছে না। সংস্কারের সঙ্গে জনগণের কোনো সম্পর্ক নেই। জনগণ এমন বাংলাদেশ চায়- যেখানে শেখ হাসিনার মতো কেউ আর যাতে ফ্যাসিবাদ কায়েম করতে না পারে। গণভোট প্রশ্নে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে 'হ্যা' বা 'না' বলছে। জনগণ শান্তির রাষ্ট্র চায়, নিরাপত্তার রাষ্ট্র চায়। আপ বাংলাদেশ এমন রাষ্ট্র চায় - জনগণের কাছে দেশের মালিকানা থাকবে।'
এবি পার্টির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান প্রফেসর ডা. মেজর (অব.) আব্দুল ওহাব মিনার বলেন, 'আমাদের রাজনৈতিক দলগুলো আস্থা রাখতে পারছে না। সেজন্য তাদেরকে ভোট চুরি করতে হচ্ছে। দীর্ঘদিনের বন্ধু বা মিত্র শত্রুতে পরিণত হচ্ছে।'
আপ বাংলাদেশ'র মুখপাত্র শাহরিন সুলতানা ইরার সঞ্চালনায় আলোচনাসভায় আরও উপস্থিত ছিলেন- বাংলাদেশ রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক দিদার হোসেন ভূঁইয়া, এবি পার্টির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার জোবায়ের আহমেদ ভূঁইয়া ও আপ বাংলাদেশ-এর প্রধান সংগঠক নাঈম আহমাদ প্রমুখ।

