
ভারত অভ্যন্তরীণ খাদ্যনিরাপত্তা ও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে চাল রপ্তানি নিরুৎসাহিত করতে কিছু বিধিনিষেধ ও শুল্ক আরোপ করেছে। দেশটি বাজারে পর্যাপ্ত সরবরাহ রাখতে যেকোনো সময় চাল রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা দিতে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে। এ বিষয়টিকে অজুহাত দেখিয়ে বাংলাদেশের বাজারে সিন্ডিকেট করে চালের দাম যাতে রাতারাতি বাড়াতে না পারে, এ জন্য অন্তর্বর্তী সরকার ভিয়েতনাম, মায়ানমার ও পাকিস্তান থেকে প্রয়োজনে বেশি পরিমাণ চাল আমদানির প্রস্তুতি নিয়েছে।
সূত্র জানায়, এরই মধ্যে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়, অর্থ, বাণিজ্য, কৃষি ও খাদ্য মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ট্রেড ও ট্যারিফ কমিশন, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডসহ (এনবিআর) বাজারে চাল আমদানির সঙ্গে সম্পর্কিত বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা একাধিক বৈঠক করেছেন। বৈঠকে দেশের চালের বাজার স্থিতিশীল রাখতে করণীয় নির্ধারণে আলোচনা করা হয়। ভারতের ওপর দেশের চালের বাজারের নির্ভরশীলতা কমিয়ে নতুন বাজার থেকে আমদানি বাড়াতে পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়ে একমত হয়েছেন তারা। স্থানীয়ভাবে চাল মজুত করে বাজারে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করতে না পারে, এ জন্য কঠোর নজরদারির সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়।
গত ৩০ সেপ্টেম্বর সচিবালয়ে সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদের কমিটির সভা শেষে অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ সাংবাদিকদের বলেন, ‘এখনো আমাদের দেশে চালের মজুত সন্তোষজনক। পার্শ্ববর্তী দেশ থেকে চাল আমদানিতে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। তবে আমরা বসে নেই। বিকল্প হিসেবে মায়ানমার, থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনাম থেকে ওপেন টেন্ডারের মাধ্যমে আনা হতে পারে।’
সরকার বাজার স্থিতিশীল করার জন্য গত ১০ আগস্ট ভারত থেকে ৪ লাখ ৬১ হাজার টন চাল আমদানির অনুমোদন দেয়। খাদ্য মন্ত্রণালয় থেকে এসব চাল আমদানির জন্য ২৪৫টি প্রতিষ্ঠানকে অনুমোদন দেয়। কেউ কেউ বিভিন্ন বন্দর দিয়ে চাল আমদানি করেন। এতে চালের দাম কিছুটা কমে। কিন্তু এখনো চালের দাম বেশি।
এ বিষয়ে খাদ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. মাসুদুল হাসান বলেন, ‘দেশে ১৯ লাখ মেট্রিক টন চাল এবং ৬৮ হাজার টন গম মজুত রয়েছে, যা সন্তোষজনক। গত অর্থবছরে চালের চাহিদা ছিল ৪ কোটি ১৬ লাখ টন। দেশে উৎপাদনও ভালো হয়েছে। তারপরও ভারত থেকে চাল আমদানির অনুমতি দেওয়া হয়েছে। গত অর্থবছরে সরকারিভাবে ৫০ হাজার টন ও বেসরকারিভাবে ৩ লাখ ৪২ হাজার টন চাল আমদানি করা হয়েছে। দেশে চালের কোনো সংকট তৈরি হলে ভিয়েতনাম, মায়ানমার ও পাকিস্তান থেকে চাল আমদানির ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। বেসরকারি খাতকে এ সুযোগ দেওয়া হয়েছে।’
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান সাংবাদিকদের বলেন, ‘ভারত নিজের দেশের বাজার স্থিতিশীল রাখতে যেকোনো পণ্য রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা দিতে পারে। এ সিদ্ধান্ত দেশটির নিজস্ব। ভারতের এমন সিদ্ধান্ত ঘিরে আমাদের দেশের কিছু অসাধু ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট করে পণ্যের দাম বাড়াতে পারেন। এর আগে পেঁয়াজের ঘটনায় আমরা সবাই এমনটাই দেখেছি। ভারত পেঁয়াজ রপ্তানিতেতে নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার পর এ দেশের অসাধু ব্যবসায়ীরা রাতারাতি দেশের বাজারে কয়েক গুণ দাম বাড়িয়ে বিক্রি করেছেন। এ ক্ষেত্রে একক বাজারের ওপর থেকে নির্ভরশীলতা কাটাতে হবে। সরকার সে পথে এগোলে সঠিক কাজটি করছে। সরকারের দায়িত্ব সাধারণ মানুষ যাতে ভোগান্তিতে না পড়েন সে পদক্ষেপ নেওয়া।’
তিনি বলেন, ভারত থেকে চাল আমদানি করা হলে তা দেশে পৌঁছাতে কমপক্ষে ১৫ দিন লাগবে। তাই রপ্তানি বন্ধ হলেই দাম বাড়ে এ কথা ঠিক নয়। সরকার ভারতের বিকল্প বাজার থেকে চাল আমদানির ব্যবস্থা করে রাখলে এই অজুহাত দিতে পারবে না। ফলে দামও বাড়ানোর সুযোগ থাকবে না।
কৃষিসচিব ড. মোহাম্মদ এমদাদ উল্লাহ মিয়ান বলেন, ‘গত অর্থবছরে বোরো ধানের উৎপাদন হয়েছে ২ কোটি ২৬ লাখ মেট্রিক টন। আগের বছরের একই সময়ে হয়েছিল প্রায় ২ কোটি ১০ লাখ টন। ১৬ লাখ টনের বেশি বোরো ধান উৎপাদন হয়েছে। বন্যায় ক্ষতি না হলে আমনেরও ভালো ফলন হবে। তারপরও বন্যায় যাতে কোনো সমস্যা না হয়, সে জন্য সরকার চাল আমদানি বন্ধ করবে না।’
চাল ব্যবসায়ীদের অনেকে স্বীকার করেছেন, ভারত থেকে চাল আমদানি বন্ধ হলেই দেশের বাজারে চালের দাম বেড়ে যায়। এর আগে ভারত থেকে চাল আমদানি হলেও দেশের বাজারে চালের দাম বেশি। চিকন বা মিনিকেট চালের কেজি বিক্রি হচ্ছে ৭৫ থেকে ৯০ টাকা পর্যন্ত। মাঝারি (আটাশ) চাল ৬০ থেকে ৬৫ টাকায় ও মোটা গুটি স্বর্ণা চাল ৫৫ টাকায় স্থির রয়েছে। সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা বলছেন, ভারত বাংলাদেশে চাল বিক্রি বন্ধ করলে- এ কারণ দেখিয়ে দেশের একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী বা আড়তদার ও মিলমালিকরা দাম বাড়িয়ে দেন।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের আওতায় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট চালের প্রায় ৫৫ শতাংশ বোরো মৌসুমে উৎপাদন হয়। এ বছর রেকর্ড ২ কোটি ১৪ লাখ টন বোরো ধান উৎপাদন হয়েছে। গত বছরের তুলনায় এবার বোরো ধান উৎপাদন ১৫ লাখ টন বেশি হয়েছে। তারপরও কৃষক ও ভোক্তা কেউই এর সুফল পাচ্ছেন না। ঈদুল আজহার পরে চালের দাম কেজিতে ১০ থেকে ১৫ টাকা পর্যন্ত বাড়ে। ঈদের আগে প্রতি কেজি মিনিকেট চালের দাম ছিল ৭৫ টাকা। সেই চাল ভোক্তাদের ৭৫ থেকে ৯০ টাকায় কিনে খেতে হচ্ছে।
ভারত থেকে চাল আমদানি কমে গেলে বা বন্ধ হলে দেশের বাজারে চালের দাম আরও বাড়বে বলে খুচরা চাল ব্যবসায়ীরা বলছেন। রাজধানীর মোহাম্মদপুরের টাউন হল বাজারের চাল ব্যবসায়ী অহিদুর রহমান বলেন, এখন চালের দাম বেশি। ভারত থেকে দেশে চাল আসা বন্ধ হয়ে গেলে রাতারাতি চালের দাম বাড়বে। কারা দাম বাড়ান এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, অসাধু মিলমালিকরা রপ্তানি বন্ধের অজুহাতে চালের দাম বাড়ান।
তার কথার সত্যতা যাচাই করতে সবচেয়ে ভালো কোয়ালিটির (মান) চাল উৎপাদনকারী মোজাম্মেল অটো রাইস মিলস লিমিটেডের চেয়ারম্যান মো. হারুন-অর-রশিদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। তিনি বলেন, ‘এটা অস্বীকার করার কিছু নেই। কিন্তু কারা দাম বাড়ান তা দেখার বিষয়। একশ্রেণির অসাধু মিলমালিক ও আড়তদাররা এ অনৈতিক কাজের সঙ্গে যুক্ত। তারা প্রকৃত চাল ব্যবসায়ী নন। তারপরও তারা গোডাউনে এমনকি বাড়িতেও প্রচুর ধান ও চাল স্টক (মজুত) করে রাখেন। ভারত চাল আমদানি বন্ধ ঘোষণা করা মাত্র সুযোগ বুঝে দাম বাড়িয়ে দেন।
এই মিলমালিক বলেন, ‘আমাদের দেশে সারা বছর যে ধান উৎপাদন হয়, তার পুরোটাই দেশে দরকার হয় না। ভারত থেকে চাল আমদানি না করলেও চলবে। কিন্তু ভারত যে সময় রপ্তানি বন্ধ করে দেবে ঠিক সেই সময়ে সরকারকে অবৈধভাবে ধান ও চাল মজুতকারীদের বিরুদ্ধে জেলায় জেলায় অভিযান করতে হবে। তাহলেও চালের দাম বাড়বে না।’

