
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে এবার ইঁদুরের মস্তিষ্কে অস্ত্রোপচারের গুরুত্বপূর্ণ কিছু ধাপ সম্পন্ন করা হয়েছে। শুধু অস্ত্রোপচারের নির্দেশ পালনই নয়, কোন চিকিৎসা দেওয়া হবে, মস্তিষ্কের কোথায় ওষুধ প্রয়োগ করতে হবে—সেসব সিদ্ধান্তও নিয়েছে এআই।
তবে যন্ত্রে ত্রুটি বুঝতে পেরে মানুষের নির্দেশ সত্ত্বেও নিজেই কাজ বন্ধ করে দেয় এটি।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রতিষ্ঠান এক্সিন থেরাপিউটিকসের সহপ্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী গ্যাব্রিয়েল ওকানা-সান্তেরো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) এই পরীক্ষার বিস্তারিত জানিয়েছেন। তার দল বিশেষভাবে তৈরি মোটরচালিত একটি রোবটিক অস্ত্রোপচারব্যবস্থার সঙ্গে এআই এজেন্টটিকে যুক্ত করে। এনডিটিভির এক প্রতিবেদন এ তথ্য জানায়।
পরীক্ষায় এআইকে মৃগীরোগে আক্রান্ত ইঁদুরের একটি মডেল এবং ১৯টি সম্ভাব্য জিন থেরাপির তালিকা দেওয়া হয়। এরপর বৈজ্ঞানিক গবেষণাপত্র বিশ্লেষণ করে কোন চিকিৎসা উপযুক্ত হবে, মস্তিষ্কের কোন অংশে তা প্রয়োগ করতে হবে এবং ইনজেকশনের সঠিক অবস্থান কী হবে—এসব নির্ধারণ করে এআই। পরে রোবটিক যন্ত্র নিয়ন্ত্রণ করে নির্দিষ্ট স্থানে চিকিৎসাটি প্রয়োগ করে।
অস্ত্রোপচারের সময় ক্যামেরার মাধ্যমে পুরো প্রক্রিয়াও পর্যবেক্ষণ করে এআই।
কোথাও রক্তপাত হচ্ছে কি না, ইনজেকশনের তরল ঠিকভাবে প্রবেশ করছে কি না, সেলাইয়ের অবস্থা কেমন—এসব বিষয়ও নজরে রাখে।
বিপদ বুঝে মানুষের নির্দেশও মানেনি এআই
পরীক্ষার সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা ঘটে অস্ত্রোপচারের একপর্যায়ে। যন্ত্রের অবস্থান নির্ধারণে ত্রুটি দেখা দিলে এআই সেটি শনাক্ত করে কাজ বন্ধ করে দেয়। মানুষের নির্দেশে আবার চেষ্টা করতে বলা হলেও নিরাপত্তার নিয়ম উপেক্ষা করে এগোতে রাজি হয়নি এটি।
পরীক্ষায় দেখা যায়, রোবটিক যন্ত্রের অবস্থান নির্ধারণের হিসাব অনুযায়ী সূচের লক্ষ্যবিন্দু ছিল ৩৪ মিলিমিটার।
কিন্তু যন্ত্রটির কাজ করার সর্বোচ্চ সীমা ৩০ মিলিমিটার। ফলে নিরাপত্তাব্যবস্থা যন্ত্রটির চলাচল আটকে দেয়। এআইও বুঝতে পারে, নির্ধারিত অবস্থান যন্ত্রটির সক্ষমতার বাইরে।
পরে যন্ত্রের শুরুর অবস্থান বা রেফারেন্স পয়েন্ট নতুন করে নির্ধারণ করে আবার চেষ্টা করতে বলা হয়। কিন্তু এআই তখনও কাজ শুরু করতে অস্বীকৃতি জানায়। শেষ পর্যন্ত প্রকৌশলীদের হাতে কোডের ত্রুটি সংশোধন করতে হয়।
পুরো অস্ত্রোপচার করেনি এআই
তবে এই পরীক্ষাকে সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রোপচার বলা যাবে না। ইঁদুরের মাথার খুলি খুলে মস্তিষ্কে পৌঁছানোর প্রাথমিক ধাপটি একজন মানব সার্জন সম্পন্ন করেন। নিরাপত্তার কারণে এই কাজ এআইকে দেওয়া হয়নি।
এ ছাড়া একজন লাইসেন্সধারী পশুচিকিৎসক পুরো প্রক্রিয়া তদারক করেন। প্রতিটি অপরিবর্তনীয় ধাপের অনুমোদন দেওয়ার পাশাপাশি জরুরি প্রয়োজনে রোবটের মোটর বন্ধ করার সুইচও তাঁর হাতে ছিল। পরীক্ষার পর ইঁদুরটি ভালোভাবে সেরে উঠেছে বলে জানানো হয়েছে। তবে চিকিৎসাটি মৃগীরোগের খিঁচুনি কমাতে পেরেছে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়।
এই পরীক্ষায় সব এআই মডেল অংশ নিতে রাজি হয়নি। অ্যানথ্রপিকের ওপাস ৫.৫ জৈবিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার বিষয়টি উল্লেখ করে কাজটি করতে অস্বীকৃতি জানায়। ওপাস ৫ প্রথমে পানি ও গ্রাফ পেপার ব্যবহার করে পরীক্ষামূলক অনুশীলন করলেও জীবন্ত প্রাণীর ওপর অস্ত্রোপচার করতে রাজি হয়নি। মাঝপথে কাজ বন্ধ হলে প্রাণীটির ক্ষতি হতে পারে—এমন আশঙ্কা জানায় মডেলটি।
তবে সনেট ৫ অস্ত্রোপচারের কাজটি সম্পন্ন করতে এগিয়ে যায়। পরীক্ষার উদ্যোক্তা ওকানা-সান্তেরো জানিয়েছেন, ওপাস ৫-এর এমন অস্বীকৃতি তার কাছে অপ্রত্যাশিত ছিল।
এই পরীক্ষা চিকিৎসাক্ষেত্রে এআই ও রোবটের ব্যবহারে নতুন সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিলেও মানুষের তত্ত্বাবধান, নিরাপত্তা এবং চিকিৎসার কার্যকারিতা নিশ্চিত করার বিষয়গুলো এখনো গুরুত্বপূর্ণ।
উত্তরা / এ এম

