
বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা। কোটি কোটি মানুষের আবেগের সবচেয়ে বড় মঞ্চ বিশ্বকাপ আয়োজনের দায়িত্বও তাদের কাঁধে। মাঠে ফুটবল যেমন আনন্দ, উন্মাদনা আর ঐক্যের প্রতীক, মাঠের বাইরের ফিফার ইতিহাস ততটাই বিতর্ক, ক্ষমতার লড়াই, দুর্নীতির অভিযোগ এবং প্রশাসনিক সংকটে ভরা।
১৯৭৪ সাল থেকে গত ৫২ বছরে ফিফার সভাপতি হয়েছেন মাত্র তিনজন- ব্রাজিলের হোয়াও হ্যাভেলাঞ্জ, সুইজারল্যান্ডের সেপ ব্ল্যাটার এবং বর্তমান সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো। তিনজনই নিজ নিজ সময়ে ফিফাকে আর্থিকভাবে শক্তিশালী ও প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠানে পরিণত করেছেন; কিন্তু একই সঙ্গে প্রত্যেকের প্রশাসনই কোনো না কোনো সময় দুর্নীতির অভিযোগ, তদন্ত কিংবা সুশাসন নিয়ে গুরুতর প্রশ্নের মুখে পড়েছে।
সবচেয়ে সাম্প্রতিক বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ইনফান্তিনো। বিশ্বকাপসহ ফিফার প্রধান প্রতিযোগিতাগুলোর বাণিজ্যিক স্বত্বের একটি অংশ বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের কাছে বিক্রির পরিকল্পনা করে তিনি নিজের ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক সংকটে পড়েছেন। ইউরোপীয় ফুটবল সংস্থা উয়েফা, কনকাকাফ এবং এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশনের (এএফসি) বিরোধিতার মুখে পরিকল্পনাটি কার্যত ভেস্তে যায়।
এরপর থেকেই একের পর এক সদস্য ফেডারেশন ইনফান্তিনোর পুনর্নির্বাচনের সমর্থন প্রত্যাহার করছে। পাশাপাশি ফিফার প্রশাসনিক কাঠামো পুনর্বিবেচনার দাবি উঠেছে এবং উয়েফা আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার হুমকিও দিয়েছে।
তবে এই সংকটকে আগের বিতর্কগুলোর সঙ্গে এক কাতারে রাখা যায় না। কারণ তিন সভাপতির বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের আইনি অবস্থান এক নয়। হ্যাভেলাঞ্জকে ফিফার নিজস্ব তদন্তেই অবৈধ অর্থ গ্রহণকারী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। ব্ল্যাটার ফিফার অভ্যন্তরীণ তদন্তে শাস্তি পেলেও পরে সুইস আদালতে একই মামলায় দুই দফায় খালাস পান। আর ইনফান্তিনোর বিরুদ্ধে অতীতে যে ফৌজদারি তদন্ত হয়েছিল, তা শেষ পর্যন্ত বন্ধ হয়ে যায়। বর্তমান বিতর্ক মূলত তার প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত এবং ফিফার বাণিজ্যিক ভবিষ্যৎ পরিচালনার ধরনকে কেন্দ্র করেই।
ফিফার ইতিহাসে আজ পর্যন্ত একমাত্র অ-ইউরোপীয় সভাপতি হোয়াও হ্যাভেলাঞ্জ। ১৯৭৪ থেকে ১৯৯৮ সাল পর্যন্ত টানা ২৪ বছর দায়িত্ব পালন করেন এই ব্রাজিলিয়ান। তার হাত ধরেই ফিফা একটি প্রভাবশালী বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়।
হ্যাভেলাঞ্জের সময় বিশ্বকাপের পরিসর বাড়ানো হয়, সদস্য দেশের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায় এবং বিশ্ব ফুটবলকে বড় বড় করপোরেট স্পন্সর ও আন্তর্জাতিক সম্প্রচার সংস্থার সঙ্গে যুক্ত করা হয়। তার প্রশাসন ফিফাকে বিপুল আর্থিক শক্তিতে পরিণত করে। কিন্তু এই বাণিজ্যিক সাফল্যের আড়ালেই জন্ম নেয় ফিফার ইতিহাসের সবচেয়ে আলোচিত দুর্নীতির একটি অধ্যায়।
ঘটনার কেন্দ্রবিন্দু ছিল ইন্টারন্যাশনাল স্পোর্ট অ্যান্ড লেজার (আইএসএল) নামের একটি স্পোর্টস মার্কেটিং প্রতিষ্ঠান। বহু বছর ধরে ফিফার বিপণন ও সম্প্রচারস্বত্বের বড় অংশ পরিচালনা করত এই প্রতিষ্ঠান। পরে তদন্তে উঠে আসে, গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক চুক্তি পাইয়ে দেওয়ার বিনিময়ে আইএসএল বিভিন্ন ক্রীড়া কর্মকর্তাকে গোপনে বিপুল অর্থ প্রদান করেছিল।
২০১৩ সালে ফিফার এথিকস কমিটির প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, হ্যাভেলাঞ্জ আইএসএলের কাছ থেকে ঘুষ গ্রহণ করেছিলেন। প্রতিবেদনে তার আচরণকে ‘নৈতিক ও নীতিগতভাবে নিন্দনীয়’ বলে উল্লেখ করা হয়। প্রতিবেদনের পূর্ণাঙ্গ ফলাফল প্রকাশের আগেই হ্যাভেলাঞ্জ ফিফার সম্মানসূচক সভাপতির পদ থেকে পদত্যাগ করেন।
এই একই কেলেঙ্কারিতে উঠে আসে ব্রাজিল ফুটবল কনফেডারেশনের সাবেক সভাপতি এবং হ্যাভেলাঞ্জের সাবেক জামাতা রিকার্দো তেইশেইরার নামও। তদন্তে দেখা যায়, আইএসএলের কাছ থেকে তিনিও নিয়মিত অর্থ গ্রহণ করেছিলেন। সেই সময় আইএসএল ফিফার সঙ্গে শত শত মিলিয়ন ডলারের বাণিজ্যিক ও সম্প্রচারস্বত্ব চুক্তি পরিচালনা করছিল।
১৯৯৮ সালে দীর্ঘ ২৪ বছরের অধ্যায়ের ইতি টেনে হ্যাভেলাঞ্জ দায়িত্ব ছেড়ে দেন। তার উত্তরসূরি হন দীর্ঘদিনের বিশ্বস্ত সহযোগী এবং তৎকালীন ফিফা মহাসচিব জোসেফ ‘সেপ’ ব্ল্যাটার।
১৯৯৮ সালে দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রায় ১৭ বছর ফিফার নেতৃত্ব দেন সুইজারল্যান্ডের সেপ ব্ল্যাটার। তার আমলেও ফিফার আর্থিক প্রবৃদ্ধি অব্যাহত থাকে। হ্যাভেলাঞ্জের শুরু করা বাণিজ্যিক সম্প্রসারণকে আরও এগিয়ে নেন তিনি।
বিশ্বকাপের আয় বাড়তে থাকে, সদস্য ফেডারেশনগুলোর মধ্যে অর্থ বণ্টনের পরিমাণও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়। এই অর্থনৈতিক সহায়তার মাধ্যমে ব্ল্যাটার বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ফুটবল ফেডারেশনের মধ্যে শক্তিশালী রাজনৈতিক সমর্থন গড়ে তুলেছিলেন।
তবে তার পুরো মেয়াদজুড়েই একের পর এক বিতর্ক লেগেই ছিল। বিশ্বকাপের আয়োজক নির্বাচন, বাণিজ্যিক চুক্তি এবং তার ঘনিষ্ঠ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতির অভিযোগ ফিফার ভাবমূর্তিকে ক্রমেই ক্ষতিগ্রস্ত করতে থাকে।
অবশেষে ২০১৫ সালে পরিস্থিতি বিস্ফোরণের রূপ নেয়। মার্কিন বিচার বিভাগের দীর্ঘ তদন্তের পর সুইজারল্যান্ডের জুরিখে ফিফার একাধিক শীর্ষ কর্মকর্তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। একই সঙ্গে বিভিন্ন ফুটবল কর্মকর্তা ও ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, জালিয়াতি, অর্থপাচার এবং ঘুষ লেনদেনের অভিযোগ আনা হয়। যদিও ব্ল্যাটারের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি কোনো ফৌজদারি অভিযোগ আনেনি, পুরো কেলেঙ্কারির কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল তার প্রশাসন।
ঘটনার কয়েকদিন পরই তিনি নতুন মেয়াদে পুনর্নির্বাচিত হন। কিন্তু বাড়তে থাকা চাপের মুখে শেষ পর্যন্ত পদত্যাগের ঘোষণা দিতে বাধ্য হন। এরপর ফিফার এথিকস কমিটি তাকে সাময়িকভাবে সব ধরনের ফুটবল কার্যক্রম থেকে নিষিদ্ধ করে।
ব্ল্যাটারের বিরুদ্ধে সবচেয়ে আলোচিত অভিযোগ ছিল ২০১১ সালে উয়েফা সভাপতি মিশেল প্লাতিনিকে ফিফার তহবিল থেকে ২০ লাখ সুইস ফ্রাঁ প্রদান করা। ফিফার এথিকস কমিটি মনে করে, এই অর্থ প্রদান স্বার্থের সংঘাত, প্রতিষ্ঠানের প্রতি দায়িত্ব লঙ্ঘন এবং অযৌক্তিক সুবিধা দেওয়ার শামিল। সে কারণে ব্ল্যাটার ও প্লাতিনি- দুজনকেই প্রথমে আট বছরের জন্য নিষিদ্ধ করা হয়। পরে সেই শাস্তির মেয়াদ কমিয়ে আনা হয়।
তবে একই ঘটনায় সুইজারল্যান্ডের ফৌজদারি আদালতে বিচার চলাকালে ব্ল্যাটার ও প্লাতিনি দাবি করেন, এটি কোনো অবৈধ অর্থ ছিল না; বরং বহু বছর আগে প্লাতিনির দেওয়া পরামর্শক সেবার বিপরীতে মৌখিক চুক্তির ভিত্তিতে পরিশোধ করা বকেয়া পারিশ্রমিক।
সুইস আদালত ২০২২ সালে প্রথম বিচারে তাদের খালাস দেন। এরপর ২০২৫ সালের মার্চে আপিল আদালতও একই রায় বহাল রাখে। অর্থাৎ, ফিফার নিজস্ব তদন্তে শাস্তি পেলেও, একই অভিযোগে সুইজারল্যান্ডের ফৌজদারি আদালতে শেষ পর্যন্ত কোনো অপরাধ প্রমাণিত হয়নি ব্ল্যাটার বা প্লাতিনির বিরুদ্ধে।
২০১৫ সালে সেপ ব্ল্যাটারের আমলের দুর্নীতি কেলেঙ্কারিতে ফিফার ভাবমূর্তি যখন ইতিহাসের সবচেয়ে বড় সংকটে পড়ে, তখন সংস্থাটিকে নতুনভাবে গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি দিয়েই ২০১৬ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি ফিফার সভাপতি নির্বাচিত হন সুইজারল্যান্ডের আরেকজন ফুটবল প্রশাসক জিয়ান্নি ইনফান্তিনো।
পেশায় আইনজীবী এবং উয়েফার সাবেক মহাসচিব ইনফান্তিনো দায়িত্ব নেওয়ার সময় প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন- ফিফায় ফিরিয়ে আনবেন স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও সুশাসন। রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ও প্রশাসনিক কার্যক্রমের মধ্যে স্পষ্ট বিভাজন তৈরি করে সংস্থাটিকে আরও আধুনিক ও বিশ্বাসযোগ্য প্রতিষ্ঠানে রূপ দেওয়ার কথাও বলেছিলেন তিনি।
প্রথম মেয়াদের পর ২০১৯ এবং ২০২৩ সালেও বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় পুনর্নির্বাচিত হন ইনফান্তিনো। বর্তমান মেয়াদ শেষ হবে ২০২৭ সালে।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তার প্রশাসনও প্রশ্নের মুখে পড়তে শুরু করে। বিভিন্ন সুশাসনবিষয়ক প্রতিষ্ঠান, সাবেক ফুটবল প্রশাসক, সদস্য ফেডারেশন এবং মানবাধিকার সংগঠনগুলো একের পর এক তার সিদ্ধান্ত ও নেতৃত্ব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করতে থাকে।

