
বাংলাদেশ রেলওয়ের সবচেয়ে জনপ্রিয় ও লাভজনক রুট ‘ঢাকা-কক্সবাজার-ঢাকা’। ঢাকা থেকে এই রুটের এক একটি টিকিট যেন সোনার হরিণ। ট্রেনের স্বল্পতায় টিকিটের চাহিদা এতটাই বেশি যে, ৩০ শতাংশ পর্যন্ত অতিরিক্ত চার্জ দিয়েও টিকিট সংগ্রহ করেন যাত্রীরা। যাত্রী চাহিদা বিবেচনায় পর্যটন নগরীতে আরও একটি ট্রেনের চাকা ঘুরতে যাচ্ছে এই মাসেই। ঢাকা-চট্টগ্রাম-ঢাকা রুটের ‘মহানগর এক্সপ্রেস’ (৭২১/৭২২) ট্রেনের রুট বাড়িয়ে নেওয়া হবে কক্সবাজার পর্যন্ত। সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী ২০ দিনের মধ্যেই এটি চালু হতে পারে।
যাত্রী চাহিদা বিবেচনায় ঢাকা-কক্সবাজার রুটে ট্রেন বাড়ানোর বিষয়টি কয়েক মাস ধরেই আলোচনায় ছিল রেল কর্মকর্তাদের টেবিলে। তবে রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলে লোকোমোটিভ (ইঞ্জিন) ও কোচ সংকট চরমে থাকায় নতুন ট্রেন চালুর সুযোগ ছিল না। পরে ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে চলাচলকারী ট্রেনগুলোর সময়সূচি পর্যালোচনা করে দেখা হয়, কোনো ট্রেনের রুট কক্সবাজার পর্যন্ত বাড়ানো সম্ভব কি না। সেই হিসেবে চট্টগ্রাম-ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটের ‘মহানগর এক্সপ্রেস’ ট্রেনটির সময়সূচি কক্সবাজার আইকনিক স্টেশন পর্যন্ত সম্প্রসারণের জন্য উপযুক্ত বলে বিবেচিত হয়। এরপর থেকেই বিষয়টি নিয়ে বিশ্লেষণ শুরু হয় বলে গণমাধ্যমকে জানিয়েছে বাংলাদেশ রেলওয়ের দায়িত্বশীল সূত্র।
বিপুল যাত্রীচাহিদা ও ট্রেনসংকট সামলাতে চট্টগ্রাম-ঢাকা রুটের দীর্ঘদিনের ‘মহানগর এক্সপ্রেস’ ট্রেনের পথ চলতি মাসের মধ্যেই কক্সবাজার আইকনিক স্টেশন পর্যন্ত বাড়াচ্ছে রেলওয়ে। এতে ঢাকা-কক্সবাজারের যাত্রীরা সমুদ্রসৈকতে চলাচলের জন্য পঞ্চম ট্রেনের সুবিধা পাবেন। নতুন রুট সম্প্রসারণের ফলে ৪৭২ কিলোমিটার দীর্ঘ পথের এই ট্রেনে প্রতিদিন প্রায় দেড় হাজার বাড়তি যাত্রীর যাতায়াত সুগম হবে। চট্টগ্রাম-কক্সবাজার অংশটি বিরতিহীনভাবে চলাচল করলেও চট্টগ্রাম অংশ পর্যন্ত সাধারণ ট্রেনের ভাড়াই বলবৎ থাকবে, যা যাত্রীসাধারণ ও পর্যটকদের স্বস্তি প্রদান করবে।
দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা প্রত্যাশা করছেন, এই ট্রেনটি চট্টগ্রাম পৌঁছায় রাত সাড়ে ৩টায়। এটি চট্টগ্রামবাসীর জন্য একটি অড-টাইম (অস্বাভাবিক সময়)। ফলে এই ট্রেনে চট্টগ্রামের সরাসরি যাত্রী হয় কম। এই ট্রেনের বেশিরভাগ যাত্রীই লোকাল। যদি ট্রেনটি কক্সবাজার পর্যন্ত যায়, তাহলে কক্সবাজারের জন্য ট্রেনের টাইমিং ভালো হবে। এতে কক্সবাজারের যাত্রীরা আগ্রহী হবেন।
রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলের একটি সূত্র জানিয়েছে, রেলপথ চালুর পর পাহাড়-সমুদ্রের শহর কক্সবাজারে প্রথম ট্রেন ‘কক্সবাজার এক্সপ্রেস’ যাত্রা শুরু করে ২০২৩ সালের ১ ডিসেম্বর। সেদিন ১ হাজার ১০ জন যাত্রী ট্রেনে প্রথমবার ঢাকা থেকে কক্সবাজার যান। এরপর থেকে আর কখনও ওই ট্রেনের কোনো আসন ফাঁকা যায়নি। যাত্রীদের এমন চাহিদার কথা বিবেচনা করে মাত্র ৪০ দিন পরই ‘পর্যটক এক্সপ্রেস’ নামে আরও একটি নতুন ট্রেন চালু করা হয়। তাতেও যাত্রী চাহিদা বিন্দুমাত্র কমেনি। বর্তমানে ঢাকা থেকে দুটি এবং শুধুমাত্র চট্টগ্রাম থেকে দুটি ট্রেন কক্সবাজার রুটে চলাচল করছে।
গত এপ্রিল মাসে শুধু কক্সবাজার এক্সপ্রেস (৮১৩ ও ৮১৪) আয় করেছে ৫ কোটি ৭৮ লাখ টাকা। মে মাসে ট্রেনটির আয় হয়েছে ৫ কোটি ৫২ লাখ টাকা। অন্যদিকে, গত এপ্রিল মাসে পর্যটক এক্সপ্রেস (৮১৫ ও ৮১৬) আয় করেছে ৪ কোটি ২৪ লাখ টাকা এবং মে মাসে আয় করেছে ৩ কোটি ৮৬ লাখ টাকা।
আমরা চাচ্ছি রেলের কানেক্টিভিটি বাড়াতে। লোকোমোটিভ ও ক্যারেজের সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে আমরা কক্সবাজারকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছি।
— হাবিবুর রশিদ হাবিব, প্রতিমন্ত্রী, রেলপথ মন্ত্রণালয়
সূত্রটি আরও জানায়, এই দুটি ট্রেনে টিকিটের চাহিদা এমন যে, বছরে গড়ে ৩৬৫ দিনের মধ্যে ৩৬০ দিনই (৯৮ দশমিক ৬৩ শতাংশ) ১০০ শতাংশ যাত্রী নিয়ে ঢাকা ছাড়ে ট্রেন দুটি। এটি বাংলাদেশ রেলওয়ের সবচেয়ে লাভজনক রুট। তাই এই রুটে আরও ট্রেন বাড়ানোর চেষ্টা করছে রেলওয়ে।
মহানগর এক্সপ্রেসের সময়সূচি ও ভাড়া কেমন হবে?
মহানগর এক্সপ্রেসই যে পর্যটন নগরী কক্সবাজারের পঞ্চম ট্রেন হতে যাচ্ছে, বিষয়টি গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেছেন বাংলাদেশ রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক মো. সুবক্তগীন। যাত্রীবাহী এই আন্তঃনগর ট্রেনটি গত ৪০ বছর ধরে চট্টগ্রাম-ঢাকা রুটে চলাচল করছে। দুই বছর আগে ট্রেনটির রেকে ইন্দোনেশিয়া থেকে আমদানি করা আধুনিক ব্রেক সিস্টেমের নতুন কোচ যুক্ত করা হয়েছে।
রেলওয়ের দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, বর্তমানে মহানগর এক্সপ্রেস (৭২২) ঢাকা থেকে রাত ৯টা ২০ মিনিটে চট্টগ্রামের উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায়। পথে ১২টি স্টেশনে যাত্রাবিরতি শেষে রাত সাড়ে ৩টায় চট্টগ্রাম স্টেশনে পৌঁছায়। প্রস্তাব অনুযায়ী, সেখানে ইঞ্জিন ঘুরানোর জন্য ২০ মিনিট বিরতি দিয়ে রাত ৩টা ৫০ মিনিটে ট্রেনটি কক্সবাজারের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করবে। এরপর টানা তিন ঘণ্টার যাত্রা শেষে সকাল ৬টা ৫০ মিনিটে কক্সবাজার আইকনিক স্টেশনে পৌঁছাবে।
সেখানে এক ঘণ্টা ২০ মিনিট বিরতির পর মহানগর এক্সপ্রেস (৭২১) সকাল ৯টা ১০ মিনিটে কক্সবাজার স্টেশন থেকে ছেড়ে আসবে। তিন ঘণ্টার যাত্রা শেষে দুপুর ১২টা ১০ মিনিটে ট্রেনটি চট্টগ্রাম স্টেশনে পৌঁছাবে। সেখানে ইঞ্জিন ঘুরানোর জন্য ২০ মিনিট বিরতি দিয়ে আগের মতোই দুপুর সাড়ে ১২টায় ঢাকার উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করবে। পথে ১২টি স্টেশনে যাত্রাবিরতি শেষে সন্ধ্যা ৬টা ৪০ মিনিটে ঢাকা রেলওয়ে স্টেশনে পৌঁছাবে। এই সময়টা এখনও চূড়ান্ত হয়নি।
চলতি মাসের মধ্যেই ট্রেনটি চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। বিস্তারিত সময়সূচি ও আনুষঙ্গিক বিষয় চূড়ান্ত করতে দ্রুতই কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে বসা হবে।
— মো. সুবক্তগীন, মহাব্যবস্থাপক, বাংলাদেশ রেলওয়ে (পূর্বাঞ্চল)
রেলওয়ের দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, বর্তমানে ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে ট্রেনটি ৩২০ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে। চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত গেলে আরও ১৫২ কিলোমিটার পথ যুক্ত হবে। ফলে মোট দূরত্ব দাঁড়াবে ৪৭২ কিলোমিটার। তবে চট্টগ্রাম পর্যন্ত ভাড়া সাধারণ আন্তঃনগর ট্রেনের মতোই থাকবে, কারণ ট্রেনটি বিরতিহীন নয়। কিন্তু চট্টগ্রাম-কক্সবাজার-চট্টগ্রাম অংশে ট্রেনটি বিরতিহীনভাবে চলবে। ফলে ওই অংশের ভাড়া বিরতিহীন আন্তঃনগর ট্রেন ‘কক্সবাজার এক্সপ্রেস’ ও ‘পর্যটক এক্সপ্রেস’ এর মতোই হবে।
মহানগর এক্সপ্রেস ট্রেনের মোট আসনসংখ্যা রাতে ৭০৬টি এবং দিনে ৭৩৬টি। ট্রেনটিতে এসি বার্থ, স্নিগ্ধা (এসি চেয়ার) এবং শোভন চেয়ার শ্রেণির আসন রয়েছে। অর্থাৎ এই ট্রেনে প্রায় দেড় হাজার যাত্রী যাতায়াত করতে পারবে।
কবে কক্সবাজার যাবে ‘মহানগর এক্সপ্রেস’?
বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক মো. সুবক্তগীন বলেন, আমরা এই মাসের মধ্যে চালু করবো। বিষয়টি নিয়ে আমাদের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বসতে হবে। আনুমানিক সময়টা এখনই বলতে পারছি না।
তবে ‘মহানগর এক্সপ্রেস’ কক্সবাজার পর্যন্ত এই মাসের মাঝামাঝি বা শেষ সপ্তাহে চালানো হবে বলে গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন রেলপথ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ হাবিব। তিনি বলেন, এই মাসের মধ্যে কার্যকর হয়ে যাবে। বলতে পারেন, এই মাসের মাঝামাঝি বা শেষের দিকে।
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা চাচ্ছি রেলের কানেক্টিভিটি বাড়াতে। আমাদের লোকোমোটিভ ও ক্যারেজের সীমাবদ্ধতা রয়েছে। তারপরও পর্যটন স্পট হিসেবে কক্সবাজারকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছি। ইতোমধ্যে কক্সবাজারের আইকনিক স্টেশনের ব্যবস্থাপনা বেসরকারি পর্যায়ে পরিচালনার দায়িত্ব দিতে চাচ্ছি।
রেলপথ প্রতিমন্ত্রী বলেন, যদি রেলের সক্ষমতা থাকতো, তাহলে কক্সবাজার রুটে ট্রেন দ্বিগুণ করতাম। ভবিষ্যতে লোকোমোটিভ ও ক্যারেজ এলে কক্সবাজার রুটে ট্রেন বাড়ানো আমাদের অগ্রাধিকারের মধ্যেই থাকবে।

