
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম বলেছেন, শুধু ক্ষমতার পালাবদলে দেশের কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসবে না। দুর্নীতি, দলীয়করণ ও জবাবদিহিহীনতার যে রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে উঠেছে, সেটিই পরিবর্তন করতে হবে। একই সঙ্গে ন্যায়কে ন্যায় এবং অন্যায়কে অন্যায় বলার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে না পারলে কোনো সরকারই জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারবে না।
শনিবার বিকেলে রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার ডাইংপাড়া মোড়ে ‘দেশ গড়তে জুলাই পদযাত্রা’ কর্মসূচি শেষে অনুষ্ঠিত সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
সারজিস আলম বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের অভ্যুত্থান গুলি খাওয়া কিংবা রক্ত দেওয়ার মধ্যেই শেষ হয়ে যায়নি। গণহত্যার বিচার, রাষ্ট্র সংস্কার এবং জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম এখনো চলমান। শহীদদের আত্মত্যাগের পরও যদি অন্যায়, অপপ্রচার ও পুরোনো রাজনৈতিক সংস্কৃতি টিকে থাকে, তবে সেই লড়াই শেষ হয়েছে বলা যায় না।
তিনি বলেন, মাদক, চাঁদাবাজি, দখলবাজি ও দুর্নীতির পেছনে রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয় অন্যতম কারণ। যারা প্রকাশ্যে মাদকের বিরুদ্ধে কথা বলেন, অথচ গোপনে মাদক ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে সুবিধা নেন, তারা জনগণের নেতা হওয়ার যোগ্য নন।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের সমালোচনা করে তিনি বলেন, স্কুল পরিচালনা কমিটি, উন্নয়ন প্রকল্প ও টেন্ডারকে কেন্দ্র করে এখনো রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতা চলছে। শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যতের চেয়ে ব্যক্তিস্বার্থকে যারা বড় করে দেখেন, তাদের নেতৃত্ব দেওয়ার নৈতিক অধিকার নেই।
তিনি বলেন, কোনো রাজনৈতিক দলের প্রতি সমর্থন থাকতেই পারে। কিন্তু সেই দলের নেতাকর্মীরা যদি চাঁদাবাজি, জমি দখল, বালু-পাথর লুট বা দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়েন, তাহলে দলীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে তাদের বিরুদ্ধেও কথা বলতে হবে। বিবেককে কোনো দল বা প্রতীকের কাছে বন্ধক রাখা যাবে না।
সারজিস আলম বলেন, আজ বিএনপি ক্ষমতায়, ভবিষ্যতে এনসিপি, জামায়াত কিংবা অন্য কোনো দল ক্ষমতায় আসতে পারে। কিন্তু রাষ্ট্রের সিস্টেম যদি অপরিবর্তিত থাকে, তাহলে জনগণের ভাগ্যেরও পরিবর্তন হবে না। এ কারণে তিনি জুলাই সনদ বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
তিনি আরও বলেন, প্রশাসন, পুলিশ, গণমাধ্যমসহ রাষ্ট্রের সব প্রতিষ্ঠানকে দলীয় প্রভাবমুক্ত রাখতে হবে। এসব প্রতিষ্ঠান জনগণের জন্য কাজ করবে, কোনো রাজনৈতিক দলের জন্য নয়। বিশেষ করে পুলিশের প্রতি মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনতে পেশাদারিত্ব ও জনবান্ধব আচরণের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
আওয়ামী লীগের সমালোচনা করে সারজিস আলম বলেন, গণহত্যার অভিযোগে অভিযুক্ত এবং দেশের বাইরে আশ্রয় নেওয়া একটি রাজনৈতিক দল দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকি। এ ধরনের রাজনীতির বিরুদ্ধে জনগণকে সচেতন থাকার আহ্বান জানান তিনি।
জুলাই আন্দোলনের শহীদদের স্মরণ করে তিনি বলেন, আর কোনো মায়ের বুক যেন খালি না হয়। ব্যক্তি বা দলের প্রতি অন্ধ আনুগত্য নয়, বরং বিবেক ও ন্যায়বোধের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে।
সমাবেশে তিনি গোদাগাড়ী উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে এনসিপির সম্ভাব্য চেয়ারম্যান প্রার্থী আতিকুর রহমানের প্রতি সমর্থন জানিয়ে বলেন, সাধারণ কৃষক পরিবারের সন্তানও জনগণের ভোটে নেতৃত্বে আসতে পারেন। পরিবর্তনের রাজনীতি সাধারণ মানুষের হাত ধরেই এগিয়ে যাবে।
এর আগে সারাদেশে ঘোষিত কর্মসূচির অংশ হিসেবে গোদাগাড়ীতে ‘দেশ গড়তে জুলাই পদযাত্রা’ অনুষ্ঠিত হয়। ডাইংপাড়া মোড় থেকে শুরু হওয়া পদযাত্রা উপজেলা সদরের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ শেষে উপজেলা পরিষদ চত্বরে গিয়ে শেষ হয়। পরে সেখানে সংক্ষিপ্ত সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।
গোদাগাড়ী উপজেলা এনসিপির আহ্বায়ক জিয়াউর রহমানের সভাপতিত্বে সমাবেশে বক্তব্য দেন দলের কেন্দ্রীয় যুগ্ম আহ্বায়ক ও কুড়িগ্রাম-২ আসনের সংসদ সদস্য ড. আতিক মোজাহিদ, যুগ্ম আহ্বায়ক সরোয়ার তুষার, জাতীয় নারী শক্তির আহ্বায়ক ও এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক মনিরা শারমিন, যুগ্ম সদস্যসচিব এস এম সাইফ মোস্তাফিজ এবং ছাত্রশক্তির কেন্দ্রীয় সভাপতি জাহিদ আহসান।
গোদাগাড়ী উপজেলা এনসিপির সদস্যসচিব আব্দুল আলীমের সঞ্চালনায় সমাবেশে আরও উপস্থিত ছিলেন রাজশাহী বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ইমরান ইমন, রাজশাহী মহানগর এনসিপির আহ্বায়ক ও রাজশাহী সিটি করপোরেশনের মেয়র প্রার্থী মোবাশ্বের আলী, সদস্যসচিব ও গোদাগাড়ী উপজেলা চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী আতিকুর রহমানসহ দলটির নেতাকর্মীরা।

