উত্তরা প্রতিদিন
ঢাকা

যেভাবে মমতার দুর্গ ভেঙে গেরুয়া হল পশ্চিমবঙ্গ

আল জাজিরার বিশ্লেষণ
বিদেশ ডেস্ক ৫ মে ২০২৬, ০১:১৭ অপরাহ্ণ
 যেভাবে মমতার দুর্গ ভেঙে গেরুয়া হল পশ্চিমবঙ্গ

ভারতে পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচন ঘিরে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সমীকরণে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। প্রায় দেড় দশক ধরে ক্ষমতায় থাকা মমতা ব্যানার্জীর দল তৃণমূল কংগ্রেসকে হারিয়ে প্রথমবারের মতো রাজ্যটি দখলে নিয়েছে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)।

ধর্মীয় মেরুকরণ, সরকারবিরোধী ক্ষোভ এবং সুসংগঠিত নির্বাচনী কৌশলের সমন্বয়ে এই ফলাফল এসেছে বলে ধারণা বিশ্লেষকদের।

ধর্মীয় প্রভাব

নয়াদিল্লির গৃহকর্মী সীমা দাস ভোট দিতে দুই দিনের ভ্রমণ করে নিজ গ্রাম পশ্চিমবঙ্গে যান।

কয়েকবার ট্রেন বদলিয়ে সময়মতো পৌঁছে ভোট দেন তিনি। এতদিন তিনি নিয়মিত তৃণমূলকেই ভোট দিতেন। কিন্তু এবার শাশুড়ির প্রভাবে তার অবস্থান বদলায়।

সীমা দাস বলেন, ‘দিদি (মমতা ব্যানার্জির ডাকনাম) মুসলমানদের পক্ষেই বেশি থাকেন।

তিনি আরো বলেন, ‘ক্ষমতায় টিকে থাকতে তিনি শুধু মুসলমানদেরই তুষ্ট করছেন।’

এই অভিযোগ বহুদিন ধরেই তুলে আসছে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন বিজেপি, যদিও তৃণমূল সবসময় ধর্মীয় বহুত্ববাদ ও সংখ্যালঘু অধিকার রক্ষার কথা বলে এসেছে।

ঐতিহাসিক জয় বিজেপির

সোমবার ঘোষিত ফলাফলে দেখা গেছে, এপ্রিল মাসে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের ভোট গণনা শেষে বিজেপি ২৯৪টির মধ্যে ২০০টির বেশি আসনে জয়ী বা এগিয়ে রয়েছে। এর আগে ২০২১ সালে দলটির সর্বোচ্চ আসন ছিল ৭৭টি।

বিপরীতে এবার তৃণমূল পেয়েছে মাত্র ৮৭টি আসন। 

পশ্চিমবঙ্গ ছাড়াও এদিন আরো চারটি রাজ্য ও একটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের ফল ঘোষণা হয়। তামিলনাড়ুতে অভিনেতা থালাপতি বিজয় তার নতুন দল ‘টিভিকে’ নিয়ে চমক দেখান। কেরালায় কংগ্রেস বাম জোটকে হারিয়েছে। পুদুচেরিতে বিজেপি জোট জয় পেয়েছে এবং আসামে বিজেপি আবারও ক্ষমতায় ফিরেছে।

তবে বিশ্লেষকদের মতে, সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ ফল এসেছে পশ্চিমবঙ্গেই।

মমতার উত্থান ও পতনের প্রেক্ষাপট

১৯৯৮ সালে কংগ্রেস ছেড়ে ‘তৃণমূল কংগ্রেস’ গঠন করেন মমতা ব্যানার্জি। দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকা বামফ্রন্টকে হারিয়ে ২০১১ সালে তিনি রাজ্যের ক্ষমতায় আসেন। ২০১৪ সালে মোদি প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর থেকে তিনি বিজেপির অন্যতম প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করেন।

নারীকেন্দ্রিক বিভিন্ন কল্যাণমূলক কর্মসূচি এবং শিল্পের জমি অধিগ্রহণের বিরোধিতার মাধ্যমে তিনি জনসমর্থন ধরে রাখেন।

তবে চেন্নাইয়ের শিব নাদার বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি বিশ্লেষক রাহুল ভার্মার মতে, ‘মমতার জনপ্রিয়তা এখনো আছে, কিন্তু টিএমসির কার্যক্রমে মানুষের মধ্যে অসন্তোষও তৈরি হয়েছে। দৈনন্দিন জীবনে তাদের হস্তক্ষেপ মানুষ ভালোভাবে নেয়নি।’

তিনি বলেন, ‘বিজেপি এবার অনেক ভালোভাবে সংগঠিত প্রচারণা চালিয়েছে। ফলাফলটা কঠিন ছিল, কিন্তু অসম্ভব নয়।’

সরকারবিরোধী ক্ষোভ বড় ফ্যাক্টর

এই নির্বাচনে প্রায় ৬ কোটি ৮২ লাখ ভোটার অংশ নেন, যা মোট ভোটারের প্রায় ৯২.৯৩ শতাংশ। রাজ্যের ইতিহাসে এটিই সর্বোচ্চ।

নয়াদিল্লির সেন্টার ফর দ্য স্টাডি অব ডেভেলপিং সোসাইটিজের বিশ্লেষক প্রবীণ রায়ের মতে, ‘তৃণমূল ভোটারদের নতুন কিছু দিতে পারেনি এবং অর্থনৈতিক বঞ্চনা ও মানুষের প্রত্যাশা বুঝতে ব্যর্থ হয়েছে।’

তিনি আরো বলেন, এই পরাজয় মমতা ব্যানার্জির জাতীয় রাজনীতিতে বিকল্প নেতৃত্ব হয়ে ওঠার সম্ভাবনাকেও দুর্বল করেছে। একই সঙ্গে বিজেপির এই জয় ভারতের জাতীয় রাজনীতিতে তাদের অবস্থান আরও শক্তিশালী করেছে।

ধর্মীয় মেরুকরণ ও ভোটের সমীকরণ

নয়াদিল্লির সেন্টার ফর পলিসি রিসার্চের নীলাঞ্জন সরকার জানান, শহর ও গ্রামের ভোটারদের মানসিকতার মধ্যে বড় ধরনের পার্থক্য ছিল। তার ভাষায়, ‘শহরের পুরুষ ভোটারদের মধ্যে তীব্র মেরুকরণ দেখা গেছে।’

তিনি বলেন, মুসলিম জনসংখ্যার বড় অংশ গ্রামাঞ্চলে হওয়ায় এই বিভাজনের প্রভাব ফলাফলে স্পষ্ট হয়েছে।

বিজেপি নেতা শুভেন্দু অধিকারী দাবি করেন, ‘হিন্দু ভোটের একীকরণ হয়েছে।’ তিনি আরো দাবি করেন, অনেক মুসলিম ভোটারও এবার টিএমসিকে ভোট দেননি। তবে এ দাবি যাচাই করা সম্ভব নয়।

ভোটার তালিকা নিয়ে বিতর্ক

নির্বাচনের আগে ভারতের নির্বাচন কমিশন বিশেষ সংশোধনের মাধ্যমে প্রায় ৯০ লাখ ভোটারকে তালিকা থেকে বাদ দেয়, যা মোট ভোটারের প্রায় ১২ শতাংশ। এর মধ্যে ৬০ লাখকে অনুপস্থিত বা মৃত দেখানো হয়, আর বাকি ৩০ লাখ যথাসময়ে আপিল করতে না পারায় ভোট দিতে পারেননি।

টিএমসি ও অন্যান্য বিরোধী দল অভিযোগ করেছে, এই প্রক্রিয়ায় মুসলিম ভোটাররা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন এবং নির্বাচন কমিশন বিজেপির পক্ষ নিয়েছে। বিষয়টি নিয়ে সুপ্রিম কোর্টেও যান মমতা, যদিও আদালত ভোটাধিকার ফিরিয়ে দেয়নি।

নিরাপত্তা বাহিনীর ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন

নির্বাচনে কেন্দ্রীয় সরকার ২ হাজার ৪০০ কোম্পানি আধাসামরিক বাহিনী মোতায়েন করে, যা রেকর্ড। সরকার বলেছে, এটি শান্তিপূর্ণ নির্বাচন নিশ্চিত করতে করা হয়েছে। তবে বিরোধীদের দাবি, এটি ভোটারদের প্রভাবিত করেছে।

শিব নাদার  বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রাহুল ভার্মা বলেন, নিরাপত্তা বাহিনীর এই বিশাল উপস্থিতি বিজেপির জন্য অনুকূল পরিস্থিতি তৈরি করে থাকতে পারে। যারা দোদুল্যমান ভোটার ছিলেন কিংবা তৃণমূলের স্থানীয় সাংগঠনিক ক্ষমতার ভয়ে থাকতেন, তারা হয়তো এর ফলে প্রভাবিত হয়েছেন।

 

Read more — আন্তর্জাতিক
Home