উত্তরা প্রতিদিন
ঢাকা

দল বড় করতে চায় এনসিপি, দরজা উন্মুক্ত সবার জন্য

# টার্গেট বিএনপি ও অন্যান্য দলের বঞ্চিত নেতাকর্মীরা
উত্তরা ডেস্ক ২৩ এপ্রিল ২০২৬, ১১:২৪ পূর্বাহ্ণ
দল বড় করতে চায় এনসিপি, দরজা উন্মুক্ত সবার জন্য

আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর গড়ে ওঠা জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) দলকে আরো বড় করার চেষ্টায় নেমেছে। দলকে শক্তিশালী ও বিস্তৃত করার লক্ষ্যে দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলকে টার্গেট করে সদস্য সংগ্রহ কার্যক্রম জোরদার করেছে তারা। বিএনপি, জামায়াত, আওয়ামী লীগ, ছাত্রদল, ছাত্রশিবির, ছাত্র অধিকার পরিষদ এমনকি ছাত্রলীগ থেকেও নেতাকর্মীদের দলে ভেড়াচ্ছে নবগঠিত রাজনৈতিক দলটি।

শুধু রাজধানী ঢাকা নয়, দেশের বিভিন্ন জেলা-উপজেলায়ও অন্য দলের নেতাকর্মী ও সমর্থকদের টার্গেট করে দলে টানার চেষ্টা করছে গণঅভ্যুত্থানের সামনের সারিতে থাকা নেতাদের এ দল। এনসিপির নেতারা বলছেন, চাঁদাবাজি, দুর্নীতি ও সহিংসতার সঙ্গে জড়িত নয় বা ছিল না এমন যে কাউকে দলে স্বাগত জানানো হবে।

জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীব গণমাধ্যমকে বলেছেন, যারা ফ্যাসিবাদবিরোধী এবং যারা গণতন্ত্রের জন্য, মানবাধিকারের জন্য দীর্ঘ সময় লড়াই করেছেন, রাজনৈতিকভাবে নির্যাতিত হয়েছেন, এরকম নানা প্ল্যাটফর্মের নানা সহযোদ্ধা বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের হতে পারে। বিএনপি, এবি পার্টি কিংবা বিভিন্ন রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মের এমন নেতারা আমাদের সাথে যোগাযোগ করছেন। ইতিমধ্যে আমাদের দলে অনেকে যোগদান করেছেন। আরো যোগদানের তালিকা প্রস্তুত হচ্ছে। ধারাবাহিকভাবে আমাদের এই যোগদান কর্মসূচি চলবে।

তিনি আরও বলেন, বিভিন্ন দলের ছাত্র নেতৃত্ব যারা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাসিবাদ বিরোধী লড়াইয়ে অংশগ্রহণ করছেন, তারাও যোগাযোগ করছেন, তারাও আস্তে আস্তে যোগদান করবেন।

২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর দেশের রাজনীতিতে এসেছে ব্যাপক পরিবর্তন। তরুণরা অনেকে রাজনীতিতে এসেছেন। বড় দলগুলোতে তরুণরা অনেকে জায়গা করে নিয়েছেন। এই মুহূর্তে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে প্রধানত তরুণদের নিয়ে গঠিত রাজনৈতিক দল- জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)।  নতুন এ রাজনৈতিক দলটি দেশের অন্যান্য দলের মতোই কর্মকাণ্ড পরিচালনা করবে নাকি রাজনীতিতে নতুনত্ব আনবে তা নিয়ে বোদ্ধা মহলে আলোচনা আছে।

এরই মধ্যে দল গুছিয়ে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ এবং ৬টি আসনে জয়লাভ করায় দলটির প্রতি সমীহ নিয়ে তাকাচ্ছেন অনেকে। ২০২৫ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি যাত্রা শুরু করা দলটি এবার নিজেদের পরিসর বাড়াতে চায়। বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে অংশ নেওয়া সব পক্ষকে এক ছাতার নিচে আনতে চায় তারা। পাশাপাশি বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষদেরও তারা আমন্ত্রণ জানাচ্ছে এনসিপির ছায়াতলে এসে দেশের রাজনীতিতে ভূমিকা রাখার জন্য, দেশ গঠনে এগিয়ে আসার জন্য।

 

সম্প্রতি জাতীয় নাগরিক পার্টিতে যোগ দিয়েছেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন, আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টি ও ইউনাইটেড পিপলস (আপ) বাংলাদেশের ৪৫ জন নেতাকর্মী। নেতাদের মধ্যে রয়েছেন ইউনাইটেড পিপলস বাংলাদেশের (আপ বাংলাদেশ) আহ্বায়ক আলী আহসান জুনায়েদ এবং মুখ্য সমন্বয়কারী রাফে সালমান রিফাত। তারা জাতীয় নাগরিক পার্টি গঠনের পূর্বে রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম জাতীয় নাগরিক কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক এবং যুগ্ম সদস্য সচিব পদে ছিলেন।

এ ছাড়া আপ বাংলাদেশের মুখপাত্র শাহরিন সুলতানা ইরা এবং বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সভাপতি রিফাত রশিদও এনসিপিতে যোগ দিয়েছেন। যোগ দিয়েছেন আইমান রাহাদ ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের দপ্তর সম্পাদক শাহাদাত হোসেন এবং এবি পার্টির ব্যারিস্টার সানি আব্দুল হক।

অন্যান্যের মধ্যে যুক্ত হয়েছেন হাসান তানভীর, তানভীর আহমেদ কল্লোল, হাসিবুল ইসলাম, এস এন সুইট, ওয়াহিদ আলম, জাহিদুল ইসলাম, মোহাম্মদ জসিমুদ্দিন, মোহাম্মদ মোশাররফ হোসেন, সুলতান মারুফ তালহা, তৌসিফ মাহমুদ সোহান, ফারহানা শারমিন সূচি, সাজ্জাদ সাব্বির, পুষ্টিবিদ মোহাম্মদ রায়হানুল ইসলাম, আব্দুল আজিজ ভূঁইয়া, আহমেদ করিম চৌধুরী, দিলারা খানম, কাজী সালমান, শোয়েব হাসান রায়হান, মোহাম্মদ সোয়েব হাসান, মুরাদ হোসেন, প্রকৌশলী আবু সাঈদ মোহাম্মদ নোমান, ফাহাদ শাহেদ, প্রকৌশলী মোহাম্মদ ইমাম উদ্দিন রিয়াদ, মোস্তফা কামাল মাহতিব, আরাফাত ই রাব্বি প্রিন্স, কাজী আহমেদ তামিম, মোহাম্মদ শামীম, বদরুল আলম শাহীন, মোহাম্মদ নাজমুল হক, মাসুমা বিল্লাহ সাবিহা, ফারজানা আক্তার, তাওহীদুল ইসলাম (জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়), রকিবুল ইসলাম (জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়), সাদাম মুত্তাসিন প্রান্তিক (নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়), মহিউদ্দিন হাসান, মোহাম্মদ নুরুল হাসান, আল মাহবুব প্রমুখ।

এ বিষয়ে জাতীয় নাগরিক পার্টির আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম বলেছেন, ‘জুলাইয়ে আমরা ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে এক হয়েছিলাম। সেই আকাঙ্ক্ষা থেকেই এখন আবার তরুণদের শক্তি একত্রিত হয়েছি। সাম্প্রতিক নির্বাচনে গণভোট ও জনগণের রায় উপেক্ষা করা হয়েছে। দেশে চাঁদাবাজি, দুর্নীতি ও সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ছে। দেশে এখন একটি বিকল্প রাজনৈতিক শক্তির উত্থান প্রয়োজন। গণঅভ্যুত্থানের সময় শুরু হওয়া বৈষম্যহীন, গণতান্ত্রিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশের আন্দোলনকে শেষ পর্যন্ত এগিয়ে নিতে হবে।’

বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ বলেন, ‘কে ছাত্রদল, কে ছাত্রশিবির, ছাত্র অধিকার পরিষদ এমনকি ছাত্রলীগ থেকে এনসিপিতে এলো, সেটি আমাদের জন্য মূল বিষয় নয়। তারা এনসিপির আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে সংগঠক ও কর্মী হিসেবে কাজ করবে।’

দলীয় সূত্র মতে, জাতীয় নাগরিক পার্টি ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে অংশ নেওয়া বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থীদের টাগের্ট করেছে। তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন দলের নেতারা। দলের গুরুত্বপূর্ণ পদ অফার করছেন। শুধু বিদ্রোহী নয়, অন্যান্য দল থেকেও বহিস্কৃত বঞ্চিতদের দলে ভেড়াতে চায় এনসিপি। এরই মধ্যে আলোচিত সাবেক বিএনপিনেত্রী রুমিন ফারহানা ও ঢাকা-৭ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী এবং ছাত্রদল ও যুবদল দুই সংগঠনেই সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক ইসহাক সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে দল।

এ প্রসঙ্গে ইসহাক সরকার বলেন, আমাদের মধ্যে আলোচনা চলছে। তারা যোগাযোগ করছে, আমিও যোগাযোগ করছি। ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সভাপতি করার কথা আছে। দক্ষিণের মানুষের সেবার জন্য কাজ করছি। দীর্ঘদিন অবহেলিত, বঞ্চিত, যে দল করেছি সে দলের কাছ থেকে ন্যূন্যতম সহানুভূতি পাচ্ছি না। আমরা তো দীর্ঘদিনের আন্দোলন সংগ্রাম করা লোক। আমাদেরকে যদি এভাবে ফেলে রাখা হয় তাহলে আমরা জনগণের সেবা করব কীভাবে?

তিনি আরও বলেন, বিএনপিতে ছিলাম একসময়। আন্দোলন সংগ্রামে কাজ করেছি। ৩৬৬টি মামলা ছিল। প্রায় ১০ বছরের মতো বিভিন্ন মেয়াদে কারাবরণ করেছি। আমার পরিবারের অন্যদের নামেসহ মোট ৫৫০টি মামলা ছিল। আমার পরিবারের সদস্যরা ওইভাবেই আছে। আমি এককভাবে সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আমি যেহেতু অবহেলিত, আমাকে বিভিন্নভাবে আক্রমণ করছে। আমার অফিস দখল করে নিয়েছে, সবকিছুই দখল করে নিয়েছে। আমি তো ন্যায়বিচার পাইনি, কোথাও ন্যায়বিচার নাই। এখন এনসিপির পক্ষ থেকে যোগাযোগ করছে, আমিও সম্মতি দিয়েছি। আমার তো রাজনীতি করতে হবে। আমার তো জনগণের পাশে থেকে সেবা দিতে হবে, এটা আমার নৈতিক দায়িত্ব। এটার জন্যই তো বছরের পর বছর জেল খেটেছি, হামলা-মামলার শিকার হয়েছি। আন্দোলন-সংগ্রামে গাফিলতি করি নাই। আমি রাজনীতি করতে চাই। আমার রাজনীতির যারা রাস্তা তৈরি করে দেবে, পথ তৈরি করে দেবে, তাদের সঙ্গে যাব। আর জনগণের সেবা যেকোনো জায়গা থেকেই করা যায়।

এদিকে, সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুঞ্জন ওঠে এনসিপিতে যোগ দিচ্ছেন বিএনপির সাবেক নেত্রী সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা। যদিও বিষয়টিকে গুঞ্জন বলে উড়িয়ে দিয়েছেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসন থেকে নির্বাচিত এই স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য।

রুমিন ফারহানা বলেন, এটা একেবারেই গুঞ্জন, একেবারেই গুজব। এটার সঙ্গে ন্যূনতম কোনো সত্যতা নেই। তিনি জানান, এনসিপিতে যোগ দেওয়ার বিষয়ে যে আলোচনা বা প্রচার হচ্ছে, তা ভিত্তিহীন। তার বক্তব্য, বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত হওয়ার পর স্বাভাবিকভাবেই বিভিন্ন রাজনৈতিক দল তার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেছে। এনসিপির পক্ষ থেকেও তাকে দলে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।

তিনি বলেন, বিএনপি ছেড়ে দেওয়া বা বিএনপি থেকে বহিষ্কার হয়ে যাওয়ার পরে অবশ্যই অন্য অনেক দল এপ্রোচ করবে। সেই ধারাবাহিকতায় এনসিপিও করেছে। ওরা বারবারই বলেছে, আপা চলে আসেন আমাদের সাথে; আসেন আমরা একসাথে কাজ করি। তারা বলেছে, আপনি জুলাইয়ে মাঠে ছিলেন, আপনার বাসা ভাঙচুর হয়েছে, আপনি একজন ফ্রন্টলাইনার। সো আপনি আমাদের সঙ্গে যুক্ত হন। আমি তাদের এপ্রোচে হেসেছি। এটা নিয়ে কথা বাড়াইনি।

 

Read more — রাজনীতি
Home