উত্তরা প্রতিদিন
ঢাকা

এবার শিকাগোর বিরুদ্ধে ‘যুদ্ধের হুমকি’ দিলেন ট্রাম্প

উত্তরা প্রতিদিন উত্তরা ডেস্ক ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ০৬:০০ অপরাহ্ণ
এবার শিকাগোর বিরুদ্ধে ‘যুদ্ধের হুমকি’ দিলেন ট্রাম্প

যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন ডিসি এবং শিকাগোতে ন্যাশনাল গার্ড সেনা ও ইমিগ্রেশন এজেন্ট মোতায়েনের প্রতিবাদে বিক্ষোভ করছেন হাজার হাজার মার্কিনি। এর মধ্যেই মার্কিন প্রতিরক্ষা বিভাগ পেন্টাগনের নাম পরিবর্তন করে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নাম দিয়েছেন ‘ডিপার্টমেন্ট অব ওয়ার’ বা ‘যুদ্ধ বিভাগ’। ন্যাশনাল গার্ড মোতায়েনের বিরুদ্ধে বিক্ষোভের প্রতিক্রিয়ায় ট্রাম্প নিজের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ট্রুথ স্যোশালে লিখেছেন, ‘সকালে নির্বাসনের গন্ধ ভালোবাসি।’ তিনি আরও লেখেন, ‘‘শিকাগো এবার বুঝবে কেন এর নাম ‘ডিপার্টমেন্ট অব ওয়ার’ রাখা হয়েছে।’’

শনিবার (৬ সেপ্টেম্বর) ট্রুথ সোশ্যাল প্ল্যাটফর্মে ট্রাম্পের এই হুমকিতে একটি প্যারোডি ছবি প্রকাশ করা হয়। এতে ‘অ্যাপোক্যালিপস নাও’ সিনেমার দৃশ্য নকল করে ‘সিপোক্যালিপস নাও’ দৃশ্য পোস্ট করেছেন যার মানে শিকাগোর পতন। ওই ছবিতে শিকাগোর আকাশসীমায় হেলিকপ্টার উড়তে দেখা যায়, যার নিচে ছিল দাউ দাউ করে জ্বলতে থাকা আগুনের গোলা।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ‘‘সিপোক্যালিপ্স নাও’’ (Chipocalypse Now) ছাড়া আর কোনো বিস্তারিত তথ্য দেননি। এটি ছিল ফ্রান্সিস ফোর্ড কপ্পোলার ১৯৭৯ সালের ভিয়েতনাম যুদ্ধভিত্তিক সিনেমা অ্যাপোক্যালিপস নাও-এর নামের ওপর ভিত্তি করে একটি কৌতুক, যেখানে একটি চরিত্রের সংলাপ ছিল, ‘সকালে নেপামের গন্ধ ভালোবাসি।’

এই পোস্টটি ট্রাম্পের বারবার দেওয়া হুমকির ধারাবাহিকতা, যেখানে তিনি ফেডারেল প্রয়োগকারী সংস্থার কর্মকাণ্ড বাড়ানোর জন্য শিকাগোকে অন্যান্য ডেমোক্র্যাট-শাসিত শহরের তালিকায় যোগ করার কথা বলেছেন। লস অ্যাঞ্জেলেসের মতো শিকাগোতেও তার প্রশাসন ইমিগ্রেশন কার্যক্রম জোরদার করতে এবং ন্যাশনাল গার্ড সেনা মোতায়েন করতে চলেছে।

শিকাগোর অন্তর্ভুক্ত ইলিনয় রাজ্যের ডেমোক্র্যাট গভর্নর জেবি প্রিটজকার ট্রাম্পের পোস্টে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘একজন স্বৈরশাসক হতে চাওয়া মানুষের হুমকিতে রাজ্য ভীত হবে না। তিনি এক্সে লেখেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট একটি আমেরিকান শহরের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার হুমকি দিচ্ছেন। এটা কোনো রসিকতা নয়। এটা স্বাভাবিক নয়।’

শিকাগোর মেয়র ব্র্যান্ডন জনসনও ট্রাম্পের এই হুমকির নিন্দা জানিয়েছেন। জনসন এক্সে লিখেছেন, বাস্তবতা হলো, তিনি আমাদের শহর দখল করতে এবং আমাদের সংবিধান ভেঙে দিতে চান। আমরা একে অপরের সুরক্ষা দিয়ে এবং ডোনাল্ড ট্রাম্প থেকে শিকাগোকে রক্ষা করে এই স্বৈরাচার থেকে আমাদের গণতন্ত্রকে রক্ষা করব।

গত জুন মাসে লস অ্যাঞ্জেলেসে সেনা পাঠানোর পাশাপাশি, গত মাস থেকে ট্রাম্প দেশের রাজধানী ওয়াশিংটন ডিসিতে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার অভূতপূর্ব ক্ষমতা দিয়ে সেনা মোতায়েন করেছেন। তিনি আরও ইঙ্গিত দিয়েছেন যে বাল্টিমোর এবং নিউ অরলিন্সও একই ধরনের পরিস্থিতির শিকার হতে পারে। শুক্রবার তিনি এমনকি পোর্টল্যান্ড, ওরেগনে ফেডারেল কর্তৃপক্ষ পাঠানোর কথাও উল্লেখ করেন যাতে বিক্ষোভকারীদের নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া যায়।

এই সেনা ও ফেডারেল এজেন্ট মোতায়েনের ফলে আইনি চ্যালেঞ্জ ও বিক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। সমালোচকরা এটিকে কর্তৃত্ববাদী শক্তির প্রদর্শন বলে আখ্যায়িত করেছেন।

শনিবার শিকাগোর ডাউনটাউনের রাস্তায় হাজারেরও বেশি বিক্ষোভকারী মিছিল করেন। তাদের প্ল্যাকার্ডে লেখা ছিল, ‘আইসিই ইলিনয় থেকে বের হও, আইসিই সব জায়গা থেকে বের হও।’ এখানে ‘আইসিই’ বলতে ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট সংস্থাকে বোঝানো হয়েছে।

বক্তারা আইসিই এজেন্টদের মুখোমুখি হলে কী করতে হবে, সে বিষয়ে নির্দেশনা দেন। তারা শিকাগোতে আইসিই-এর পরিকল্পিত দমনমূলক কার্যক্রমকে গাজায় ইসরায়েলের উপস্থিতির সঙ্গে তুলনা করেন।

ইউএস প্যালেস্টিনিয়ান কমিউনিটি নেটওয়ার্কের কো-চেয়ার নাজেক সানকারি ভিড়ের উদ্দেশ্যে বলেন, ‘আমরা গাজায় ফিলিস্তিনিদের অবিচলতা দেখে অনুপ্রাণিত, আর এ কারণেই আমরা ট্রাম্প এবং তার হুমকির কাছে নতি স্বীকার করতে অস্বীকার করছি।’ এ সময় অনেকে ফিলিস্তিনি পতাকা নাড়ান এবং কেফিয়াহ (আরবীয়দের স্কার্ফ) পরেছিলেন।

কমিউনিটি সংস্থা Palenque LSNA-এর নেতা ভিভিয়ানা বারাহাস প্রতিশ্রুতি দেন যে, যদি ট্রাম্প তাদের শহরে ন্যাশনাল গার্ড মোতায়েন করেন, তবে লস অ্যাঞ্জেলেসের মতোই শিকাগোর জনগণ ‘জেগে উঠবে’।

বারাহাস বলেন, ‘যদি তিনি মনে করেন যে আমাদের সার্বভৌমত্বকে দুর্বল করার জন্য এই অর্থহীন নাটক আমাদের জনগণকে রক্ষা করার জন্য আমাদের আবেগ বন্ধ করে দেবে, তবে তিনি ভুল করছেন। কারণ এটা শিকাগো। আমরা লস অ্যাঞ্জেলেস এবং ডিসিকে পর্যবেক্ষণ করেছি, এবং তারা তাদের শহরের জন্য রুখে দাঁড়িয়েছে।’

যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানীতে ‘উই আর অল ডিসি’ (We Are All DC) শীর্ষক মিছিলে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের সমর্থকদেরও অন্তর্ভুক্ত করা হয়। তারা একটি উজ্জ্বল লাল ব্যানারের পেছনে মিছিল করেন, যেখানে ইংরেজি ও স্প্যানিশ ভাষায় লেখা ছিল, ‘ডিসি দখল বন্ধ করো।’ তারা ট্রাম্পের বিরুদ্ধে স্লোগান দেন এবং বিভিন্ন পোস্টার বহন করেন, যার মধ্যে কিছু পোস্টারে লেখা ছিল, ‘ট্রাম্পকে এখনই যেতে হবে, ডিসি মুক্ত করো, এবং স্বৈরাচার প্রতিরোধ করো।’

ওয়াশিংটন ডিসি থেকে আল জাজিরার প্রতিবেদক হেইদি ঝো-কাস্ট্রো জানিয়েছেন যে, বিক্ষোভকারীরা ট্রাম্পের আদেশের কারণে "ক্ষুব্ধ" এবং তাকে "একজন ফ্যাসিবাদী ও স্বৈরাচারী" বলে অভিহিত করছেন। তিনি উল্লেখ করেন যে, ট্রাম্প গত মাসে সহিংস অপরাধের উত্থান মোকাবিলার জন্য ২,০০০ সেনা মোতায়েন করেছিলেন, অথচ গত বছর এই শহরে এমন অপরাধ ‘৩০ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন’ পর্যায়ে ছিল।

মার্ক ফিটজপ্যাট্রিক, একজন প্রাক্তন মার্কিন কূটনীতিক যিনি প্রায় এক দশক ধরে ডিসির বাসিন্দা, শনিবার অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস সংবাদ সংস্থাকে বলেন যে, প্রশাসন যে ‘কর্তৃত্ববাদী উপায়ে’ ডিসির সঙ্গে আচরণ করছে, তা তাকে চিন্তিত করছে। তিনি বলেন, ‘ফেডারেল এজেন্ট, ন্যাশনাল গার্ড আমাদের রাস্তায় টহল দিচ্ছে, যা আমাদের শহরের গণতন্ত্রের জন্য একটি অপমান।’ তিনি আরও যোগ করেন যে, ডিসির বাসিন্দাদের জন্য এটি আরও খারাপ কারণ তাদের কোনো ফেডারেল প্রতিনিধিত্ব নেই। ‘আমাদের নিজস্ব সিনেটর বা হাউস অফ রিপ্রেজেন্টেটিভস-এর সদস্য নেই, তাই আমরা এমন একজন স্বৈরশাসকের দয়ার ওপর নির্ভরশীল, যে একজন স্বৈরশাসক হতে চায়।’

শনিবারের বিক্ষোভকারীদের মধ্যে একজন ছিলেন জুন লি, যিনি কাঠখোদাইয়ের একটি ব্লক দিয়ে তৈরি একটি ‘ডিসি মুক্ত করো’ সাইনবোর্ড নিয়ে এসেছিলেন। তিনি বলেন, ‘ফেডারেল হস্তক্ষেপ তার শহরকে যে প্রভাব ফেলছে, তাতে তিনি ‘দুঃখিত এবং হৃদয়বিদারক’ হয়ে এই বিক্ষোভে এসেছেন।

তিনি বলেন, ‘এটা আমার বাড়ি, এবং আমি কখনো ভাবিনি যে ইতিহাসের ডকুমেন্টারিতে দেখা এসব ঘটনা আমি বাস্তবে দেখতে পাব। এ কারণেই এটা সবার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এটা আমাদের বাড়ি; আমাদের লড়াই করতে হবে, আমাদের প্রতিরোধ করতে হবে।’

ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছেন যে ন্যাশনাল গার্ড মোতায়েনের ক্ষেত্রে তার প্রায় সীমাহীন ক্ষমতা রয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে তিনি নিজেকে স্বৈরশাসক হিসাবে দাবি করার প্রশ্নেরও জবাব দিয়েছেন। গত মাসে ট্রাম্প বলেন, ‘বেশিরভাগ মানুষ বলছে, 'যদি আপনি তাকে একজন স্বৈরশাসক বলেন, যদি সে অপরাধ বন্ধ করে, তবে সে যা ইচ্ছা তাই হতে পারে।' আমি একজন স্বৈরশাসক নই, যাই হোক।’

তিনি আরও বলেন, ‘এমনটা নয় যে আমার অধিকার নেই - আমি যা খুশি তা করার অধিকার রাখি।" ট্রাম্প বলেন, "আমি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট। যদি আমি মনে করি আমাদের দেশ বিপদে আছে - এবং এই শহরগুলো বিপদে আছে - তাহলে আমি তা করতে পারি।’

 

Read more — আন্তর্জাতিক
Home