উত্তরা প্রতিদিন
ঢাকা

রাজশাহীতে প্রতি ১০ জনে চার শিশুর জন্ম সিজারে

সরকারি হাসপাতালে বাড়ছে সিজারিয়ান প্রসব
উত্তরা প্রতিদিন উত্তরা প্রতিবেদক ২০ নভেম্বর ২০২৫, ০৫:২৭ অপরাহ্ণ
রাজশাহীতে প্রতি ১০ জনে চার শিশুর জন্ম সিজারে

রাজশাহী বিভাগের সরকারি হাসপাতালগুলোতে অস্ত্রোপচারের (সিজারিয়ান) মাধ্যমে সন্তান প্রসবের হার উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। জরুরি পরিস্থিতিতে মা ও নবজাতকের জীবন বাঁচাতে ব্যবহৃত এই চিকিৎসাপদ্ধতি এখন হয়ে উঠছে নিত্যদিনের ঘটনা। সাম্প্রতিক এক গবেষণা বলছে, সরকারি হাসপাতালগুলোতেও এখন প্রতি ১০টি জন্মের চারটিই হচ্ছে সিজারিয়ানে—যা আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের প্রায় তিনগুণ।

আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সাময়িকি ন্যাচার-এ সম্প্রতি প্রকাশিত গবেষণায় বলা হয়, রাজশাহী বিভাগে সরকারি হাসপাতালগুলোতে সিজারের হার ৪১ শতাংশে পৌঁছেছে। অথচ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিওএইচও) বলছে, প্রয়োজনভিত্তিক সিজারিয়ান প্রসবের হার ১০ থেকে ১৫ শতাংশের বেশি হওয়া উচিত নয়। প্রয়োজনের অতিরিক্ত সিজার মায়ের শরীরে বাড়তি ঝুঁকি তৈরি করে, নবজাতকের ওপর দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যপ্রভাব ফেলতে পারে এবং আর্থিক ও মানসিক চাপ বাড়ায়।

গবেষণাটি পরিচালনা করেছেন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও ইসলামী ব্যাংক মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের একটি গবেষক দল। রাজশাহী, নাটোর, নওগাঁ ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার ৩৯৩ জন প্রসূতির ওপর করা জরিপের ফলাফলের ভিত্তিতে তারা এ সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন।

গবেষণা থেকে জানা যায়, সরকারি হাসপাতালে সিজারের সর্বোচ্চ হার পাওয়া গেছে নওগাঁ জেলায়—৪৫ শতাংশ। অর্থাৎ প্রতি ১০০টি জন্মের প্রায় অর্ধেকই ঘটছে অস্ত্রোপচার করে। রাজশাহী বিভাগজুড়ে গড়ে এই হার ৪১ শতাংশ। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সরকারি হাসপাতালে সিজারের হার এতটাই বেড়েছে যে বেসরকারি হাসপাতালের সঙ্গে ব্যবধান দ্রুত কমছে। এমনকি কিছু উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে স্বাভাবিক প্রসবের চেয়ে সিজার বেশি হচ্ছে—যাকে গবেষকরা উদ্বেগজনক ও অস্বাভাবিক প্রবণতা হিসেবে দেখছেন।

গবেষক দলের প্রধান ও ইসলামী ব্যাংক মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের স্ত্রীরোগ ও প্রসূতিবিদ্যা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক আবেদা খাতুন বলেন, রাজশাহী বিভাগের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের সরকারি হাসপাতালগুলোর তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, সিজারের হার অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। তিনি বলেন, সরকারি হাসপাতালগুলোতেও যখন বেসরকারি খাতের মতো সিজারের হার বাড়তে শুরু করে, তখন বোঝা যায় চিকিৎসা-সুবিধার চেয়ে প্রতিষ্ঠানিক সুবিধা বেশি অগ্রাধিকার পাচ্ছে।

ডাক্তার আবেদা খাতুন জানান, অযৌক্তিক সিজার শুধু প্রসূতির শারীরিক জটিলতা বাড়ায় না, বরং দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করে এবং পরিবারের ওপর আর্থিক চাপ সৃষ্টি করে। তিনি সরকারি হাসপাতালে কঠোর তদারকি, প্রোটোকল মেনে চলা এবং জরুরি প্রয়োজন ছাড়া অস্ত্রোপচার না করার নির্দেশনা কঠোরভাবে বাস্তবায়নের পরামর্শ দেন।

কেন বাড়ছে প্রয়োজনের অতিরিক্ত সিজার:

গবেষণায় সিজার বৃদ্ধির তিনটি প্রধান কারণ তুলে ধরা হয়েছে। সেগুলো হচ্ছে- ১। জনবল সংকট: ২৪ ঘণ্টা প্রসূতি সেবা কার্যকর রাখতে সরকারি হাসপাতালে পর্যাপ্ত জনবল নেই। অনেক হাসপাতালে দক্ষ প্রসবকালীন সেবা প্রদানকারী নার্সের ঘাটতি রয়েছে। ফলে সময়সাপেক্ষ স্বাভাবিক প্রসবের পরিবর্তে দ্রুত বিকল্প হিসেবে চিকিৎসকেরা সিজার বেছে নিচ্ছেন।

২. স্বাস্থ্যজটিলতার আশঙ্কা: চিকিৎসকরা অনেক সময় অল্প ঝুঁকিকেও বড় ঝুঁকির সম্ভাবনা ভেবে নিরাপদ উপায় হিসেবে সিজার করার সিদ্ধান্ত দেন।

৩. প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ চাপ: কিছু সরকারি হাসপাতালে রোগীর চাপ বেশি থাকায় চিকিৎসকরা দ্রুত রোগী ছাড়ানোর জন্য সিজারকে সহজ পদ্ধতি হিসেবে ব্যবহার করছেন। কিন্তু এটা বিশ্ব মানদণ্ডের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

গবেষণায় দেখা গেছে—৩১ বছর বা তার বেশি বয়সী প্রসূতিদের মধ্যে সিজারের হার বেশি। উচ্চশিক্ষিত নারীরা তুলনামূলকভাবে বেশি সিজারের শিকার হলেও গবেষণা বলছে, রাজশাহীতে উল্টো প্রবণতা দেখা গেছে। এখানে নিম্ন আয়ের নারীদের মধ্যেও অপ্রয়োজনীয় সিজার বেশি হচ্ছে। যেসব নারীর স্বামী কৃষি বা সেবা খাতে কর্মরত এবং শিক্ষাগত যোগ্যতা কম, তাদের ক্ষেত্রেও সিজারের হার বেশি।

গবেষকরা বলছেন, এটি মূলত মাতৃত্বসেবায় আর্থসামাজিক বৈষম্যের প্রতিফলন, যেখান থেকে বোঝা যায় স্বজ্ঞানে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ কম থাকলে প্রসূতিদের বেশি ঝুঁকিতে পড়তে হয়। অনেকেই চিকিৎসকের সিদ্ধান্ত প্রশ্ন না করেই মেনে নেন।

গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ হলো—জাতীয়ভাবে উচ্চশিক্ষিত বা মধ্যবিত্ত নারীদের মধ্যে সিজারের হার বেশি হলেও রাজশাহীতে নিম্নআয়ের নারীরাই অপ্রয়োজনীয় সিজারের বেশি শিকার। এর কারণ হিসেবে গবেষকেরা উল্লেখ করেছেন—স্বাস্থ্যসচেতনতার অভাব; সিদ্ধান্তে প্রভাব বিস্তারের অক্ষমতা; চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যব্যবস্থার প্রতি অতি নির্ভরতা ও কিছু আধা-সরকারি প্রতিষ্ঠানের বাণিজ্যিক প্রবণতা।

রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সম্প্রতি সিজার করা কয়েকজন প্রসূতি জানান, তারা চিকিৎসকের পরামর্শের বাইরে অন্য কোনো বিকল্প বিবেচনাও করেননি। এক প্রসূতি বলেন, “ডাক্তার বলেছেন এখনই সিজার করতে হবে—তাই করেছি। সিজার না করলে ঝুঁকি আছে—এমনটাই বুঝিয়েছেন।”

চিকিৎসকদের একটি অংশ মনে করেন- প্রসবকালীন সামান্য জটিলতাও বড় সমস্যায় রূপ নিতে পারে; সরকারি হাসপাতালে রোগীর চাপ অনেক; স্বাভাবিক প্রসব দীর্ঘসময় ধরে পর্যবেক্ষণ করতে হয়, যা সব সময় সম্ভব হয় না। ফলে অনেকেই অস্ত্রোপচারকে ‘নিরাপদ’ ও দ্রুত পদ্ধতি হিসেবে গ্রহণ করছেন। কিন্তু জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, সিজারকে নিরাপদ মনে করলেও এর ঝুঁকি স্বাভাবিক প্রসবের তুলনায় বহুগুণ বেশি। কেননা, এতে রক্তক্ষরণ, সংক্রমণ,  ভবিষ্যৎ গর্ভধারণে জটিলতা, নবজাতকের শ্বাসকষ্ট, অ্যানেস্থেশিয়ার জটিলতা, মাতৃমৃত্যু ও নবজাতকের ঝুঁকি বাড়ার শঙ্কা রয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, অপ্রয়োজনীয় সিজারের হার বাড়তে থাকলে মাতৃমৃত্যু কমানোর এসডিজি লক্ষ্য অর্জন কঠিন হবে। পাশাপাশি নবজাতকের স্বাস্থ্যঝুঁকি ও স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় বাড়বে।

ডাক্তার আবেদা খাতুন সতর্ক করে বলেন, যথাযথ হস্তক্ষেপ না নিলে ক্রমবর্ধমান সিজার প্রবণতা এসডিজি অনুযায়ী মাতৃ ও নবজাতক মৃত্যুহার কমানোর পথে একটি বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।

গবেষণা প্রতিবেদনে সরকারি ও বেসরকারি উভয় খাতে সিজারের হার কমাতে কয়েকটি সুপারিশ করা হয়েছে। সেগুলো হলো- সরকারি হাসপাতালগুলোতে সিজার সিদ্ধান্তে কঠোর নজরদারি, প্রসববিষয়ক ক্লিনিক্যাল গাইডলাইন যথাযথভাবে অনুসরণ, নার্সদের উন্নত প্রশিক্ষণ, স্বাভাবিক প্রসব-বান্ধব অবকাঠামো গড়ে তোলা, প্রসূতি নারীদের সিদ্ধান্তে সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা, অপ্রয়োজনীয় সিজার সম্পর্কে সচেতনতামূলক প্রচার অন্যতম।

যৌক্তিক নীতি গ্রহণ ও তদারকি জোরদার করা গেলে সরকারি হাসপাতালে অপ্রয়োজনীয় সিজার অনেকটাই কমানো সম্ভব বলে মনে করেন গবেষক দলের প্রধান ও ইসলামী ব্যাংক মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের স্ত্রীরোগ ও প্রসূতিবিদ্যা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক আবেদা খাতুন।

Read more — স্বাস্থ্য
Home