
ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে ধরিয়ে দিতে তার ব্যক্তিগত পাইলটকে প্রলুব্ধ করার এক রুদ্ধশ্বাস গুপ্ত অভিযানের খবর ফাঁস হয়েছে। থ্রিলার সিনামার গল্পকেও যেন হার মানাবে যুক্তরাষ্ট্রের সেই গুপ্ত অভিযান। গণমাধ্যম সূত্রের মতে, গল্পটিতে একটি গুপ্তচর থ্রিলারের সমস্ত বৈশিষ্ট্যই রয়েছে।
জানা গেছে, একজন মার্কিন ফেডারেল এজেন্ট নিকোলাস মাদুরোর ব্যক্তিগত পাইলটকে গোপনে তার বিমানটি এমন একটি স্থানে সরিয়ে নেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিলেন যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ টিম তাকে গ্রেপ্তার করতে পারে। এই অভিযান পরিচালনার জন্য পাইলটকে এর জন্য পুরষ্কারের প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেছিলেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বেশ কয়েকজন বর্তমান এবং সাবেক আমেরিকান কর্মকর্তার পাশাপাশি ভেনেজুয়েলার নেতার একজন বিরোধী নেতার বরাত দিয়ে অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস এই প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।
এই অভিযানকে কোনো শীতল যুদ্ধের একটি থ্রিলার গল্পের সঙ্গে তুলনা করেছে যুক্তরাজ্য-ভিত্তিক সংবাদমাধ্যম দ্য ইনডিপেনডেন্ট। অভিযানটির নেতৃত্ব দিয়েছিলেন মার্কিন ফেডারেল এজেন্ট এডউইন লোপেজ। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের হোমল্যান্ড সিকিউরিটি ইনভেস্টিগেশনস (এইচএসআই) এর কর্মকর্তা ছিলেন।
ইউএনএন জানায় ইনডিপেনডেন্টের এই প্রতিবেদনে, এজেন্ট এবং পাইলটের মধ্যে আলাপের বিষয়টিও নিশ্চিত হয়। সেখানে উঠে আসে কীভাবে মার্কিন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন এজেন্ট ডোমিনিকান প্রজাতন্ত্রের একটি বিমানবন্দর হ্যাঙ্গারে একটি গোপন বৈঠকে ভেনেজুয়েলার বিমান বাহিনীর কর্নেল বিটনার ভিলেগাসকে এই প্রস্তাব দেন।
কথোপকথনটি বেশ উত্তেজনাপূর্ণ ছিল, এবং পাইলট উত্তর দিতে এড়িয়ে যান। যদিও তিনি এজেন্ট এডউইন লোপেজকে তার মোবাইল ফোন নম্বর দিয়েছিলেন। ফলে এই এজেন্ট ভেবে বসেন যে, তিনি মার্কিন সরকারকে সাহায্য করতে আগ্রহী হতে পারেন।
এই প্রতিবেদনে আরো ইঙ্গিত দেওয়া হয় যে, পরবর্তী ১৬ মাস ধরে, আমেরিকান এজেন্ট সেই পাইলটের পদত্যাগের পরেও এনক্রিপ্টেড মেসেঞ্জারের মাধ্যমে তার সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রেখেছিলেন।
জানা গেছে, জো বাইডেন প্রসিডেন্ট হিসবে দায়িত্বে থাকার সময় ২০২৪ সালের এপ্রিলে এই অভিযান শুরু হয়। এসময় ,মাদুরোর ব্যবহৃত বিমান সম্পর্কে একজন তথ্যদাতা ডোমিনিকান প্রজাতন্ত্রের মার্কিন দূতাবাসে যোগাযোগ করেন।
২০২৪ সালের এপ্রিল মাসে ডোমিনিকান রিপাবলিকের মার্কিন দূতাবাসে এক তথ্যদাতা দাবি করেন, মাদুরোর ব্যবহৃত দুটি বিলাসবহুল জেট বিমান মেরামতের কাজ চলছে সান্তো ডোমিংগোর লা ইসাবেলা বিমানবন্দরে।
তার বিমান দুটি শনাক্ত করতে সময় লাগেনি। এর একটি ‘দাসো ফ্যালকন ২০০০ ইএক্স’ এবং অন্যটি ‘ফ্যালকন ৯০০ ইএক্স’। পরে জানা যায়, মাদুরো পাঁচজন পাইলটকে পাঠিয়েছেন বিমানগুলো ফেরত নিতে।
সেখানেই লোপেজের মাথায় আসে এক সাহসী চিন্তা। তিনি মাদুরোর প্রধান পাইলটকে রাজি করানোর কথা ভাবেন, যাতে ওই পাইলট প্রেসিডেন্টকে বহন করার সময় কোনো বিমানকে এমন কোনো জায়গায় অবতরণ করান, যেখানে মার্কিন বাহিনী মাদুরোকে গ্রেপ্তার করতে পারে।
এই ভাবনা থেকেই শুরু হয় এক গুপ্তচর নাটক। ডোমিনিকান কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে লোপেজ ও তার দল পাইলটদের সঙ্গে কথা বলা শুরু করেন। তাদের মূল টার্গেটে ছিলেন ভেনেজুয়েলার বিমানবাহিনীর কর্নেল ও মাদুরোর ব্যক্তিগত পাইলট—বিটনার ভিলেগাস। ভিলেগাস ছিলেন প্রেসিডেনশিয়াল অনার গার্ডের সদস্য, শান্ত স্বভাবের কিন্তু মাদুরোর আস্থাভাজন।
লোপেজ প্রস্তাব দেন, গোপনে মাদুরোকে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে যাওয়ার বিনিময়ে, পাইলট তার লক্ষ লক্ষ স্বদেশীর কাছে অত্যন্ত ধনী এবং প্রিয় হয়ে উঠবেন। সেক্ষেত্রে পাইলটকে সাক্ষাতের স্থান হিসেবে ডোমিনিকান প্রজাতন্ত্র, পুয়ের্তো রিকো, অথবা কিউবার গুয়ান্তানামো বেতে অবস্থিত যে কোন একটি মার্কিন সামরিক ঘাঁটি বেছে নিতে পারেন বলে প্রস্তাব দেওয়া হয়।
এরপর লোপেজ তাকে মাদুরোর গ্রেপ্তারের জন্য ৫০ মিলিয়ন ডলার পুরস্কারের বিষয়ে মার্কিন বিচার বিভাগের প্রেস বিজ্ঞপ্তির লিঙ্ক পাঠান।
অবশেষে এত কথার পর, ভিলেগাস সেই এজেন্টকে ব্লক করে দেন। তার আগে তাকে কাপুরুষতার অভিযোগ করে লিখেন: "আমরা ভেনেজুয়েলিয়ানরা ভিন্ন কাপড় দিয়ে তৈরি। আমরা বিশ্বাসঘাতক নই।"
ঘটনা এখানেই শেষ নয়। পরবর্তীকালে, মাদুরোর বিরোধীরা ভিলেগাসের সম্ভাব্য বিশ্বাসঘাতকতার কথা প্রকাশ্যে ইঙ্গিত দিয়ে তাকে ভয় দেখানোর চেষ্টাও করেন। আমেরিকান রাজনীতিবিদ মার্শাল বিলিংসলিয়া সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্স-এ পাইলটকে তার জন্মদিনে অভিনন্দন জানিয়েছেন, লোপেজের সঙ্গে সাক্ষাতের সময় তোলা তার সেই ছবিও প্রকাশ করেন।
এর কয়েক মিনিট পরই, মাদুরো তার প্রেসিডেন্সিয়াল বিমানে করেই কারাকাসে ফিরে আসেন।
সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারীরা প্রথমে অনুমান করেছিলেন যে, পাইলটকে হয়ত আটক করা হয়েছে। তবে, কয়েকদিন পরই ভিলেগাস রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রধান দিওসদাদো ক্যাবেলোর পাশে উপস্থিত হন, যিনি তাকে "অটল দেশপ্রেমিক" বলে অভিহিত করেন।

