
ইসরায়েলের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে ইউরোপ থেকে মানবিক সহায়তা নিয়ে সমুদ্রপথে একটি কাফেলা রওনা দিয়েছে। গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলা নামের এই অভিযানকে নিরাপত্তা দিতে এবার হস্তক্ষেপ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ইতালি ও স্পেন। গত বুধবার সকালে গাজাগামী এই নৌবহরে হামলা চালানো হলে আতঙ্কিত হয়ে পড়েন মানবাধিকার কর্মীরা। তবে তারপরও এই বহর গন্তব্যের দিকে এগিয়ে যেতে বদ্ধপরিকর। ফ্লোটিলার আয়োজকরা জানিয়েছেন, তাদের যাত্রা গাজা অভিমুখে অব্যাহত থাকবে।
এই নৌযাত্রার পেছনে রয়েছে গাজার মানুষের জন্য বহন করা খাদ্য আর চিকিৎসাসামগ্রী। কিন্তু ফ্লোটিলার সদস্যরা বলছেন, তাদের পথ রীতিমতো আগুনঝরা হয়ে উঠেছে। ড্রোন হামলা, অজানা বিস্ফোরণ, নৌকার ওপর আছড়ে পড়া অজ্ঞাত বস্তু—সবমিলিয়ে এটি আতঙ্কের অভিযানে পরিণত হয়েছে। গ্রিসের কাছে ভেসে থাকার সময়
মাঝরাতে তারা হঠাৎ বিস্ফোরণের শব্দ শুনতে পান, ভিডিওতে ধরা পড়ে আগুন আর ধোঁয়া। তার পরও সকালের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে তারা আবারও যাত্রা শুরু করেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একাধিক ভিডিওতে দেখা গেছে বিস্ফোরণের পর ধোঁয়া উড়ছে, জাহাজে দৌড়ঝাঁপ করছেন মানবাধিকার কর্মীরা। কিন্তু সব প্রতিকূলতা মোকাবিলা করেও তাদের মুখে ছিল দৃঢ়তা, আর কণ্ঠে ছিল প্রতিজ্ঞা, ‘আমরা থামব না।’ মানুষের জন্য মানুষের এই মানবিক সহায়তার যাত্রাটি কীভাবে শেষ হবে, এটি তার গন্তব্যে ঠিকভাবে পৌঁছতে পারে কি না, সেটি এখনো অজানা। কিন্তু সমুদ্রের বুক চিরে যে মানবিক সহায়তার বহর এগিয়ে চলেছে, তা এবার যেন প্রতিরোধের প্রতীক হয়ে উঠেছে।
একাধিক দেশের মানবাধিকার কর্মী ও রাজনীতিবিদরা এরই মধ্যে যোগ দিয়েছেন এই বহরে। পোল্যান্ডের সংসদ সদস্য ফ্রানেক স্টারচেভস্কি জানান, ১০টি জাহাজের ওপর মোট ১৩ বার হামলা চালানো হয়েছে। হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তিনটি জাহাজ, কিন্তু তবুও থেমে যায়নি কাফেলাটি। যেন বারবার আঘাতের পরও উঠে দাঁড়িয়ে পথ চলছে এটি। বিভিন্ন দেশ থেকে রওনা দেওয়া মানবাধিকার কর্মীদের এই উদ্যোগ প্রশংসা কুড়িয়েছে সবার।
বৃহস্পতিবার আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম রয়টার্স জানায়, গাজার উদ্দেশে যাত্রা করা এই বহরে প্রায় ৫০টি বেসামরিক নৌকা রয়েছে। বহরে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে রয়েছেন আইনজীবী, সংসদ সদস্য এবং মানবাধিকার কর্মী। সুইডিশ জলবায়ুকর্মী গ্রেটা থুনবার্গও বহরে রয়েছেন। বুধবার গ্রিসের গাভদোস দ্বীপের ৩০ নটিক্যাল মাইল দূরে বহরটির ওপর ড্রোন হামলা চালানো হয়। এই হামলার পর স্পেন ও ইতালি বহরের নিরাপত্তায় তাদের নৌবাহিনীর জাহাজ মোতায়েন করার ঘোষণা দিয়েছে।
ইতালির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বুধবার একটি ফ্রিগেট পাঠানো হয়েছে, যা অন্য একটি জাহাজ দিয়ে প্রতিস্থাপন করা হবে। ইতালির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বেলজিয়াম, ফ্রান্স এবং অন্যান্য ইউরোপীয় দেশ অনুরোধ করেছে, যাতে বহরে থাকা তাদের নাগরিকদের প্রয়োজনে সুরক্ষা দেওয়া হয়।
ইতালি একটি সমঝোতার প্রস্তাবও দিয়েছে। এর মাধ্যমে ত্রাণসামগ্রী সাইপ্রাসে নামিয়ে ক্যাথলিক চার্চের লাতিন প্যাট্রিয়ার্কেট অব জেরুজালেমের মাধ্যমে গাজায় পৌঁছে দেওয়া হবে। ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি জানিয়েছেন, ইসরায়েল এই প্রস্তাবে সম্মতি দিয়েছে। তবে বৃহস্পতিবার গ্লোবাল ফ্লোটিলার পক্ষ থেকে এই প্রস্তাব সরাসরি প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ইউরোপীয় দেশগুলোর এই পদক্ষেপ ইসরায়েলের সঙ্গে উত্তেজনা আরও বাড়াতে পারে। কারণ, তেল আবিব এরই মধ্যে ফ্লোটিলার বিরুদ্ধে কড়া
অবস্থান নিয়েছে। বহরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার এই পদক্ষেপ মানবিক উদ্যোগকে সমর্থন করছে, তবে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সংঘাত আরও জটিল করে তুলতে পারে।

