
অভিনেতা আশরাফুল হক ডনকে পাঁচ দিন হেফাজতে রেখে জিজ্ঞাসাবাদ করলেও চিত্রনায়ক সালমান শাহর মৃত্যুরহস্যের বিষয়ে বড় কোনো তথ্য আদায় করতে পারেনি পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)।
কিন্তু সালমান শাহর সহ অভিনেতা ও বন্ধু হিসেবে এ বিষয়ে অনেক কিছু ডনের জানার কথা বলে মনে করছেন আলোচিত এই মামলার তদন্ত কর্মকর্তা, সিআইডির পরিদর্শক মো. মুজিবুর রহমান।
তাই তার দাবি, ডন অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্যই গোপন করেছেন। তাই তাকে আবার জিজ্ঞাসাবাদের প্রয়োজন হতে পারে। সে কারণে তাকে কারাগারে রাখার আরজি তিনি জানান আদালতে।
তদন্ত কর্মকর্তার এই আবেদনে সায় দিয়ে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জুয়েল রানা আজ বুধবার আসামি ডনকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দিয়েছেন।
৩০ বছর আগে সালমান শাহ মারা যাওয়ার আগে খলনায়ক হিসেবে ডন তার সঙ্গে বেশ কয়েকটি সিনেমায় অভিনয় করেছিলেন। পাশাপাশি দুজনের বন্ধুত্বও ছিল আলোচিত।
সালমান শাহর মৃত্যুর পর তা আত্মহত্যা বলে ধরে নেওয়া হয়েছিল, মামলা হয়েছিল অপমৃত্যুর। থানা পুলিশ, পিবিআই, সিআইডির পাশাপাশি বিচার বিভাগীয় তদন্তেও তা আত্মহত্যা বলেই উঠে আসে।
কিন্তু তার মা নীলা চৌধুরীর দাবি ছিল ভিন্ন। দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া পেরিয়ে ২৯ বছর পর ২০২৫ সালের ২০ অক্টোবর আদালত অপমৃত্যুর মামলাটি হত্যা মামলা হিসেবে গ্রহণের নির্দেশ দেন।
সেই নির্দেশের পর নীলা চৌধুরীর পক্ষে তার ভাই আলমগীর কুমকুম বাদী হয়ে হত্যা মামলা করেন। সেই মামলায় সালমান শাহর স্ত্রী সামিরা হক ও খলনায়ক ডনসহ ১১ জনকে আসামি করা হয়।
এরপর গত ৯ আগস্ট ঢাকার শাহজালাল বিমানবন্দর থেকে ডনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তাকে পাঠানো হয় কারাগারে। এরপর গত ২০ আগস্ট ডনকে সাতদিনের জন্য হেফাজতে চেয়ে আবেদন করেন তদন্ত কর্মকর্তা মুজিবুর রহমান। সেই আবেদনের শুনানি নিয়ে গত ২৭ আগস্ট আদা্লত পাঁচ দিন রিমান্ডের আদেশ দেন।
রিমান্ড শেষে আজ বুধবার ডনকে আদালতে হাজির করেন তদন্ত কর্মকর্তা। সেই সঙ্গে তাকে কারাগারে রাখার আবেদন করা হয়। সেই আবেদনেই দাবি করা হয়, ডন অনেক কিছুই লুকাচ্ছেন।
তদন্ত কর্মকর্তার আবেদনে বলা হয়, পলাতক আসামিদের বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করলে ডন তাদেরকে চেনেন বলে স্বীকার করলেও
অনেক তথ্য গোপন করছেন। অথচ সালমান শাহর ঘনিষ্ঠ বন্ধু হিসেবে একত্রে চলাফেরা করার কারণে তার সব তথ্য জানার কথা।
এই মামলায় সামিরা ও ডনের পাশাপাশি আসামি রয়েছেন সামিরার মা লতিফা হক লুসি, ব্যবসায়ী আজিজ মোহাম্মদ ভাই, ডেবিড, জাভেদ, ফারুক, রুবী, আ. ছাত্তার, সাজু, রেজভি আহমেদ ওরফে ফরহাদ।
তদন্ত কর্মকর্তা আদালতকে বলেছেন, সালমান শাহর মৃত্যুর বিষয় ও মামলার ঘটনা সংক্রান্তে ডনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে তিনি অত্যন্ত কৌশলে কথা বলেন। আসামি অত্যন্ত চতুর ও দুর্দান্ত প্রকৃতির লোক হওয়ায় অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য গোপন করেছেন।
তবে মামলার ঘটনার পূর্বে, পরে ও ঘটনার সময় আসামির আচার-আচরণে, চালচলনে মামলার ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার বিষয়ে অনেক তথ্য পাওয়া যাচ্ছে বলে দাবি করেন সিআইডি পরিদর্শক মুজিবুর।
ডনকে আটক রাখার পক্ষে যুক্তি দেখিয়ে তিনি আবেদনে লিখেছেন, মামলা সংক্রান্তে পাওয়া সব তথ্য যাচাই করা হচ্ছে। তদন্তের স্বার্থে প্রয়োজনে আসামিকে পুনরায় আদালতের অনুমতি সাপেক্ষে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। তাই তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাকে আটক রাখা প্রয়োজন।
ঢাকাই সিনেমার শীর্ষ তারকা থাকা অবস্থায় ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর সালমান শাহর মৃত্যু ব্যাপক চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছিল। তখন বলা হয়েছিল, সাংসারিক জটিলতার কারণে আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছিলেন তিনি। সহঅভিনেত্রী শাবনুরকে নিয়ে স্ত্রী সামিরার সঙ্গে সালমান শাহর দ্বন্দ্বও এসেছিল আলোচনায়।
ঢাকার ইস্কাটনে নিজের বাড়িতে গলায় ফাঁস দেওয়া অবস্থায় সালমান শাহর লাশ উদ্ধারের পর অপমৃত্যুর মামলা করেছিলেন তার বাবা কমরউদ্দিন আহমদ চৌধুরী। পরে ১৯৯৭ সালের ২৪ জুলাই অভিযোগটি হত্যা মামলায় রূপান্তরের আবেদন করা হয়।
এ বিষয়ে তদন্ত করতে সিআইডিকে নির্দেশ দিয়েছিলেন আদালত। তদন্ত শেষে ১৯৯৭ সালের ৩ নভেম্বর আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেয় সিআইডি। তাতে এ ঘটনাকে আত্মহত্যা বলা হয়।
পরে ওই বছরের ২৫ নভেম্বর ঢাকার সিএমএম আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন গৃহীত হয়। তবে প্রতিবেদনটি প্রত্যাখ্যান করে রিভিশন মামলা করেন কমরউদ্দিন চৌধুরী। পরে ২০০৩ সালের ১৯ মে মামলাটি বিচার বিভাগীয় তদন্তে পাঠান আদালত।
দীর্ঘ ১১ বছর পর ২০১৪ সালের ৩ আগস্ট আদালতে বিচার বিভাগীয় তদন্তের প্রতিবেদন দাখিল করেন তৎকালীন মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট ইমদাদুল হক। ওই প্রতিবেদনেও একে আত্মহত্যা বলা হয়েছিল।
এদিকে কমরউদ্দিন চৌধুরীর মৃত্যুর পর মামলার বাদী হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হন নীলা চৌধুরী। ২০১৫ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি তিনি ঢাকা মহানগর হাকিম আদালতে বিচার বিভাগীয় তদন্ত প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে নারাজি আবেদন করেন।
এরপর পিবিআই আসে এই মামলার তদন্তে। তারাও উপসংহারে পৌঁছায় যে ঘটনাটি আত্মহত্যা। ২০২১ সালের ৩১ অক্টোবর আদালত ওই প্রতিবেদন গ্রহণ করে মামলাটি নিষ্পত্তি করেন।
কিন্তু ২০২২ সালের ১২ জুন সেই আদেশের বিরুদ্ধে ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতে রিভিশন মামলা দায়ের করেন নীলা চৌধুরী। এরপর গত বছরের ২০ অক্টোবর অপমৃত্যুর মামলাটি হত্যা মামলা হিসেবে গ্রহণের নির্দেশ দেন আদালত। সালমান শাহর মামা আলমগীর কুমকুম হত্যা মামলা করার পর তদন্তভার দেওয়া হয় সিআইডিকে।

